বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» বিশ্ব »প্রজ্ঞা মৌসুমীর জলহাওয়ার ব্যাসার্ধ
প্রজ্ঞা মৌসুমীর জলহাওয়ার ব্যাসার্ধ

Sunday, 1 March, 2015 02:49pm  
A-
A+
প্রজ্ঞা মৌসুমীর জলহাওয়ার ব্যাসার্ধ
বাংলাদেশ টাইমঃ খেলার মধ্যবিরতিতে বড়দা’র চায়ের স্টলে একদল যখন মিশরীয় রেফারির মুণ্ডুপাত করছিল আর আরেক দল উপভোগ করছিল কল্পিত ঘোলে দুধের স্বাদ—তখনই হঠাৎ একজন বলে উঠল ‘লাত্থি বড় আচানক জিনিস।’ হঠাৎ মুণ্ডহীন শরীর দেখে যেমন চমকে ওঠে মানুষ, তেমনিভাবে চমকে ওঠে লোকগুলো। ফুটবল দেখতে বসে লাথির প্রসঙ্গ আসাটা অস্বাভাবিক নয়, তবু জামাল হুসেনের কেন যেন অস্বস্তি হয়। মনে পড়ে, সকালে স্ত্রী হুসনে আরাকে বিবিসি বাংলা ধরতে বলেছিলেন তিনি। আয়েশ করে শুয়ে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে বিবিসির খবর শোনার মধ্যে এক ধরনের সাহেবিয়ানা আছে, কিন্তু হুসনে আরা একটু বেশিই সময় নিচ্ছিল। ব্যাস, মেজাজ গেল চড়ে। বিছানা ছেড়ে উঠেই জামাল হুসেন জোরসে এক লাথি বসালেন হুসনে আরার পাছায়—‘এতক্ষন লাগে ক্যান তোর পেটলাগানি।’ 

অপ্রত্যাশিত লাথিতে কাত হয়ে পড়া হুসনে আরা ‘জানোয়ার’ বলে চিৎকার করে ওঠেন।’ বিড়বিড় করে এও বলেন, ‘একটা ফুটবলের মত আমারে লাত্থিটা দিল।’ জামাল হুসেন নিজেও অবশ্য বিবিসি বাংলা ধরতে পারেননি। তবে তিনি রেডিওটাকে লাথি দিতে পারলেন না বা চাইলেন না, হাজার কুড়ি টাকার যৌতুকে পাওয়া সামান্য হুসনে আরা’র চেয়ে কয়েক ইঞ্চির এই রেডিওটা তার কাছে অনেক মূল্যবান।

‘লাত্থি বড় আচানক জিনিস’—কথাটা প্রমাণ করতেই কিংবা ধরুন ব্যাখা করতেই লোকটা হয়ে ওঠে আরব্য রজনীর শাহারজাদ...  আমাদের সখিনা বেগমের সংসারে অভাব ছিল না মুখের, অভাব ছিল অন্নের। সিকান্দার প্রায়ই ত্যাক্ত হয়ে বউকে বলত—‘খালি কোষ বাড়াস, ডেইয়া গেলেও তোর অইয়া যায়।’ সখিনা বেগম অপমানে, কষ্টে কিংবা বাস্তববুদ্ধির বশে উপজেলা সরকারি হাসপাতালে গিয়ে জরায়ু ফেলে আসে। আরেকটু ধৈর্য ধরলে অবশ্য প্রকৃতিই সমাধান দিত, কেননা আগে থেকেই একে একে মারা যেতে থাকে সখিনা বেগমের সন্তান। শেষে ওই একটামাত্র ছেলেই ছিল—আতর আলী, যে আতর আলী বড় উদলা থাকতে ভালোবাসে। কোনও বাড়িতে মেহমান এলে ও যখন ঘুরঘুর করত, ওঁরা বলত ‘ওই পেন্ড পইড়া আয়, তাইলে দিমু।’ সে এক দৌড়ে গিয়ে প্যান্ট পরে আসত, হাতে মুড়ি, বিস্কুট কিংবা পিঠা পেলে আবার দূরে গিয়ে খুলে ফেলত প্যান্ট। কেউ কেউ ভয়ও দেখাত ‘আনতো কাঁচিডা, বগাডা কাইট্টাম।’ ভীষণ ভয় পেত আতর আলী, হাত দিয়ে লজ্জাস্থান ঢাকত, তবু আতর আলী কাপড় পরত না, কেননা কাপড় পরলেই তার শরীর ‘কুডকুডায়’।

এই নাঙ্গা আতর আলী—কাপড় পরলেই যার শরীর কুটকুট করে, যার খৎনার জন্য সখিনা বেগম টাকা জমায় সিঁকেয় তুলে রাখা পাতিলে—একদিন মতি মাস্টারের বাগানে পড়ে থাকা একটি আম ধরে ফেলে। মতি মাস্টার ছুটে এসে অভিনব এক লাথি মারে তাকে। আমটা এক পাশে পড়ে আর উড়ে গিয়ে আরেক পাশে পড়ে আমাদের আতর আলী। মতি মাস্টার আমটা ধরেও কী ভেবে আবার ফেরত দেয় তাকে। খুশিমনে আম নিয়ে বাড়ি ফেরে বোকা আতর। সখিনা বেগম আম দেখে পুলকিত হয় না বরং আলানী বুবুর কাছে কাঁদে—‘বুবু, মুতি মাস্টর এই খাওড়া আমের লাইগ্যা খেড়া লাত্থিডা দিল।’ আলানী বুবু আতর আলীকে ধমকায়, আতর আলী কেবল বোকার মত হাসে আর হাতে ধরে রাখে পাখি কিংবা বাদুরের আধ খাওয়া টসটসে লাল-হলদে আম। টসটসে পাকা আমে ওর খুব লোভ।

সে রাতেই জ্বর হয় আতর আলীর। সখিনা বেগমের একেকবার মনে হয় লাথির কারণে এই জ্বর, আবার মনে হয় পোলার কপালেই ভোগান্তি ছিল। তারপর একদিন সখিনা বুবুর ধান হয়, পাঠা হয়, মুরগি হয়, শুধু থাকে না আকুল করা কোনও মুখ। তারপর একদিন মতি মাস্টার আরও ধনী হন, ভুলে যান কোনও ন্যাংটা আতর আলীকে লাথি দেওয়ার কথা। তবে হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে যায় মতি মাস্টারের; কখনও রাঁধতে গিয়ে কিংবা পুরনো প্যান্ট দেখে কিংবা ধরুন টসটসে পাকা আম খেতে গিয়ে যখন সখিনা বেগমের মনে ঢেউ ওঠে, দিনরাত্রি টুকরো টুকরো করেন বিলাপে—তখন হঠাৎ অস্পষ্ট মনে পড়ে যায় মতি মাস্টারের এক লাত্থির কথা।

আতর আলীর কথা ভাবতে ভাবতে হয়ত একটু ভিজে যায় লোকটার চোখ। হয়ত চায়ের স্টলেও বয়ে যায় খানিকটা দুঃখবোধ। ধরেন, এই সখিনা বেগমের বাড়ি ধরে সোজা পশ্চিমে গেলে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ, আরেকটু সামনে হেঁটে ডান দিকে মোড় নিলেই পাবেন ইদ্রিস মিয়ার বাড়ি। এই ইদ্রিস মিয়ার বড় মেয়ে সায়েরা। কী যে মিঠা মেয়ে—বড় বড় চোখ, বড় মিঠা হাসি। মেয়েটার হয়ত স্কুলে যেতে মন চাইত খুব আর তাই পাশের বাড়ির দিলরুবা বুবুর পড়ার আওয়াজ পেলেই জানালার কাছে  গিয়ে দাঁড়াত। কিংবা হয়ত ও ভালোবেসেছিল দিলরুবা বুবুকেই, তাই সুযোগ পেলেই ছুটে যেত বুবুর কাছে। যে কোনও দরকারে, যে কোনও সময়ে দিলরুবা বুবু ডাকলেই সায়েরা বানু চলে যেত—এমনই মিঠা মেয়ে।

সবাই কিংবা আপনিও যখন লাথি খুঁজছেন গল্পে, বিনয় বাবু তখন ভাবতে থাকে নিজের মেয়েদের কথা। ছোট মেয়েটা লেখাপড়ায়, রূপে, গুণে সবদিক থেকে বিনয় বাবুর অহঙ্কার; অথচ বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বড়মেয়েটা বিনয় বাবুর লজ্জা। বয়স যত বাড়ছে, মেয়ে যেন ততই জেদি হয়ে উঠছে। কে জানে মেয়েটা হয়তবা ক্লান্তই হয়ে পড়েছে।  সুযোগ পেলেই কিংবা দরজা খোলা পেলেই চলে যাবে অন্য বাসায়। তারপর খোঁজো বাসার পর বাসা। ‘আপনাদের বাসায় ঊর্মি আসছে?’—প্রশ্ন করতেও কী যে অপমান আর লজ্জা হয়! মেয়েকে টেনে হিঁচড়ে বাড়ি আনার সময় কিংবা মেয়ের দুর্বল হাতে মার খাওয়ার সময় বিনয় বাবুর কখনও কখনও মনে হয়, যদি একটিমাত্র মেয়েই থাকত! মাঝে মাঝে তিনি ঊর্মিকে সহ্য করতে পারেন না; রাগে, লজ্জায়, অপমানে না পেরে।

বিনয় বাবুর ভাবনায় ছুরি কাটে লোকটা—তো এইরকম এক সন্ধ্যায় দিলরুবা বুবুর একা ঘরে ভীষণ ভয় করে, সায়েরা তাই পাশে বসে থাকে। ইদ্রিস মিয়া ঘর থেকে রাগ না করেই ডাক দেয়, ‘সায়েরা।’ দৌড়ে হাসিমুখে বাবার কাছে আসে সায়েরা, ‘কী? কী!’ ওমনি ইদ্রিস আলী বসিয়ে দেয় এক লাথি—‘ওই বাড়িত কি মধু নিহি হারামজাদি?’ ঘটনাটা বলতে বলতে সায়েরার মা কত কেঁদেছে আলানী বুবুর কাছে—‘কত সুন্দর হাসি দিয়া আইলো আর শয়তানডা কি খেড়া লাত্থিডাই না দিল।’ হয়ত ঘৃণা থেকে কিংবা দুঃখ থেকে আমাদের সায়েরা সে রাতে আর কিছু মুখে দিল না। তারপর জ্বর হয় সায়েরার, তারপর হারিয়ে যায় আমাদের মিঠা মেয়ে।

বড়দা’র চায়ের স্টলে কারও কারও হয়ত তখন ইচ্ছে করে সায়েরার বাপেরেই একটা লাত্থি দিয়ে আসে। আরও কিছু ভাবার আগেই লোকটা এগুতে থাকে। ধরেন, সায়েরা বানুর বাড়ির আরও তিন কি চারটা  বাড়ি পরে বাম দিকে ঘুরে সোজা হাঁটলে একটা বকুল গাছ, তারপর পশ্চিম দিকে... চায়ের স্টলের লোকদের এসব দিক-নির্দেশনায় ক্লান্তি লাগে, ওরা হয়ত কেবল আরও একটি লাথির অপেক্ষায় আছে। নির্দেশনা শেষ হলে ওরা শোনে—সেই বাড়িটা মহসিন মিয়ার, পরপর সাত মেয়ের পর একটামাত্র ছেলে সন্তান যার। অভাবের সংসার; রাতে প্রথমে জাউ খায়, তারপর একটু করে ভাত। শেষ কাঁঠাল মানে ছেলেটা জাউ খেতে পারে না, ভাত চায়, একটু ভাত দিলে আর একটু ভাত চায়। এভাবে চাইতে থাকে।

মা রুশন বেগম বোঝায়, ‘আগে শেষ কর, তারপর দেমু।’ ছোট ছেলে বুঝতে চায় না, ও চায় একসাথে থালাভর্তি ভাত। মা যদি ভাত তুলে দেয় সাত নাম্বার মেয়ে জুলেখা রাগ করে—‘হে নিজের পুতেরে খালি ভাত দেয়।’ অন্য বোনেরা জুলেখাকে বোঝায়, ‘ছোড ভাই না! ভাই ভাত খাক।’ জুলেখা বোঝে না ভাই বলে সে কেন ভাত খাবে। ও বোঝে ওর পাতে জাউ আর ভাইয়ের পাতে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত। অবুঝ ভাই আরও ভাত চায়, ঘ্যান ঘ্যান করে, মা ওকে বোঝায়, জুলেখা রাগ করে, ঘ্যান ঘ্যান করে, অন্য বোনেরা জুলেখাকে বোঝায়, ঘ্যান ঘ্যান করে। এই ভর সন্ধ্যায় ভাত নিয়ে এত ঘ্যান ঘ্যান শুনে মহসিন মিয়ার মাথা ঠিক থাকে না। ‘এরম শুরু করছে ক্যা’—মহসিন মিয়া তার শেষ কাঁঠাল ছেলেকে জোরেই লাথি মারে, ছেলে কাত হয়ে পড়ে। তারপর গরম ভাত থেকে ধোঁয়া উঠে উঠে একসময় হারিয়ে যায়।

লোকে বলে বাবা-মা’র দেওয়া লাথি আল্লাহ সহ্য করে না। হয়ত ঠিক, হয়ত সবই ভুল কথা। বড়দা’র চায়ের স্টলে অপেক্ষারত লোকগুলোর কিংবা আপনারও হয়ত কষ্ট হচ্ছে। আহারে, একটা মাত্র ছেলে, না হয় একটু ভাত বেশি চাইত, থালাভর্তি গরম ভাত, আহারে। এদের মধ্যে ফেরদৌস জামানের মনে পড়ে চাচাত ভাই ও এতিম বোরহানের রান্না ভালো না হওয়ায় থালা আর তরকারিসুদ্ধ পাতিল বাসার পেছনে ফেলে দিয়ে এবং আরও একটি কাজ করে বাসা থেকে বের হয়ে এসেছে ও। ফেরদৌসের ধারণা বোরহান ইচ্ছে করেই এসব অখাদ্য রান্না করে, আজকাল বড্ড বেয়াড়া হয়েছে। আবার তখন মানিব্যাগটাও খুঁজে পাচ্ছিল না, পরে অবশ্য আকবর দালাল জানিয়েছিল—গেল রাতে মাতাল ফেরদৌসই নুসরাতের ঘরে ফেলে এসেছে মানিব্যাগটা। সেটা তো জেনেছে পরে, এর আগে তো সন্দেহ হবেই, রাগ হবেই! হঠাৎই অগুনিত ক্ষুধার্ত পিঁপড়ার সারি এগিয়ে আসছে রোদমাখা একথালা ভাতের দিকে কিংবা অনেক মাছি মাটিতে পড়ে থাকা এতিম বোরহানের শরীরে শরীর এলিয়ে বসে আছে—দৃশ্য দুটো কেবলই ঘুরপাক খেতে থাকে ফেরদৌস জামানের মনে।

বড়দা’র চায়ের স্টলে অপেক্ষারত লোকগুলোর অকস্মাৎ মনে হতে থাকে এক ধারাভাষ্যকার, না, যেন এক ত্রিনয়ন ওদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে অচেনা এক জলহাওয়ার দিকে। লোকগুলোর মনে হতে থাকে এই অপরিচিত কিংবা চেনা চেনা লোকটা এক অশুভ উদ্দেশ্য নিয়েই উচ্চারণ করেছে—‘লাত্থি বড় আচানক জিনিস!’ ওঁদের এও মনে হয় লোকটার কথামত দিক ধরে গেলে দেখা যাবে আলাদা কোনও বাড়ি নয়, সে কেবল একটিমাত্র বাড়িই, বাড়ি নয় আসলে একটি চায়ের স্টল যাকে কেন্দ্র করে লোকটা এঁকে যাচ্ছে নিজের বৃত্ত আর অসংখ্য ব্যাসার্ধ।

ওঁরা এখন এই ব্যাসার্ধ ভাঙতে চায়। হয়ত তাই তোরাব আলী বলে ‘তা ভাই, আপনিই কি এই তিন শয়তানের একজন?’ লোকটি স্থির চোখে তাকায়, ‘ভাই, আপনি কোন জন?’ এই আশ্চর্য দৃষ্টি কিংবা আচানক প্রশ্ন শুনেই হয়ত চমকে ওঠে তোরাব আলী কিংবা চায়ের স্টলে অপেক্ষারত ওঁরা সবাই, হয়ত আপনি নিজেও। ইতোমধ্যে টিভিতে শুরু হয়ে গেছে বিশ্বকাপ ফুটবলের সেমিফাইনাল স্পেন বনাম দক্ষিণ কোরিয়া।

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP