বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» বিশ্ব »সিরিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে উৎফুল্ল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প
সিরিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে উৎফুল্ল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প

Wednesday, 24 January, 2018 10:31am  
A-
A+
সিরিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে উৎফুল্ল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প
বাংলাদেশ টাইম : সিরিয়ায় সরকারি বাহিনীর রাসায়নিক হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার দিকে নজর ছিল বিশ্ববাসীর। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন তখনো অপ্রস্তুত। ট্রাম্প সব কিছু ভাবছেন শুধু সামরিক পদক্ষেপ ছাড়া। শেষ পর্যন্ত সিরিয়াকে জবাব দেওয়া হলো টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে। হামলার পর বেশ উৎফুল্ল ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি:ইনসাইড দি ট্রাম্প হোয়াইট হাউস’ বইতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
 
বইয়ের ‘সিচুয়েশন রুম’ অধ্যায়ে লেখক মাইকেল ওলফ লিখেছেন, ৪ এপ্রিল, মঙ্গলবার সকাল ৭টার আগেই খবর এলো সিরিয়ার খান শেইখুন শহরে সরকারি বাহিনী রাসায়নিক হামলা চালিয়েছে। বেশ কিছু শিশু মারা গেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দশ সপ্তাহের প্রশাসনের জন্য এটা বহির্বিশ্বের প্রথম বড় ঘটনা, বড় পরীক্ষাও।
 
হোয়াইট হাউসে সবাই ভাবছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবেন? আবার অনেকের সন্দেহ ছিল আদৌ প্রেসিডেন্ট প্রতিক্রিয়া দেখাবেন কী? রাসায়নিক অস্ত্র হামলার বিষয়টি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, নাকি গুরুত্বহীন? এটা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছিলেন না। কারণ পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে ট্রাম্পের মনোভাব এলোমেলো এবং খামখেয়ালিপূর্ণ। তার উপদেষ্টারাও জানেন না, তিনি কি স্বাতন্ত্রবাদী নাকি সমরবাদী? এমনকি এই দুটি বিষয়ে যে পার্থক্য আছে, তাও তিনি জানেন কী?
 
জেনারেলদের প্রতি ট্রাম্পের মুগ্ধতা রয়েছে।   তিনি চান সেনাবাহিনীর কমান্ড অভিজ্ঞতা আছে এমন লোকরাই পররাষ্ট্র নীতির দায়িত্ব নেবে। পররাষ্ট্র নীতিতে তার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। আবার বিশেষজ্ঞদের প্রতিও বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই। হঠাত্ করে খান শেইখুনে হামলার পর প্রেসিডেন্ট কিভাবে পদক্ষেপ নেবেন সেটা পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ালো।
 
এরই মধ্যে হোয়াইট হাউসে একটি ই-মেইল ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লো। মেইলে লেখা আছে, এটা কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ। একটি নির্বোধকে ঘিরে আছে ‘ক্লাউনরা’। ট্রাম্প কিছুই পড়বে না, এক পৃষ্ঠার মেমোও না। নীতি নির্ধারণীসংক্রান্ত নথিগুলোও না। বিশ্বনেতার সঙ্গে বৈঠকে বসেও বিরক্ত হয়ে তিনি উঠে পড়ছেন। তার কর্মীরাও ভালো না। কুশনার তো স্বীকৃত শিশু, যে কিছুই জানে না। ব্যানন একজন একরোখা, তিনি যতটা না স্মার্ট তার চেয়ে বেশি নিজেকে মনে করেন। ট্রাম্প তো মানুষ কম বরং এক গাদা অদ্ভুত আচরণের সমষ্টি। তার পরিবার ছাড়া প্রথম বছরে কেউই বাঁচবে না। আমি এখানের কাজকে ঘৃণা করি, তবে এখানে থাকা প্রয়োজন। কারণ তিনি এখানে কী কী করছেন তার ক্লু একমাত্র আমার কাছেই রয়েছে। এসব দেখে আমি ভীত-সন্ত্রস্ত।
 
এই ই-মেইলের মাধ্যমে মূলত হোয়াইট হাউসের প্রকৃত অবস্থা উন্মোচনের চেষ্টা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জেনারেলদের পছন্দ করেন। তারা যত বেশি ফল সালাদ পড়বে তত ভালো। তবে তিনি জেনারেলদের কাছ থেকেও শুনতে পছন্দ করেন না। পাওয়ার পয়েন্ট, তথ্য-উপাত্তের উপস্থাপনও অপছন্দ তার। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ম্যাকমাস্টার সবে ছয় সপ্তাহ দায়িত্ব নিয়েছেন। এর মধ্যেই তার জন্য সিরিয়া টেস্ট। যদিও তাকে নিয়োগ করার প্রথম দিকে ট্রাম্প খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলেন না। এমনকি কয়েকজন বন্ধুকে তিনি বলেছিলেন, ম্যাকমাস্টারকে বরখাস্ত করতে যাচ্ছেন। তাকে নিয়োগ করার জন্য জামাতা কুশনারকে দোষারোপ করেন ট্রাম্প। মাইকেল ফ্লিনকে বরখাস্ত করার পর অবকাশ যাপন কেন্দ্র মার-এ-লাগোতে নতুন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা নিয়োগ দিতে দুই দিন ধরে সাক্ষাত্কার নেন ট্রাম্প। ওয়েস্ট পয়েন্ট মিলিটারি একাডেমির সুপারিনটেনডেন্ট রবার্ট ক্যাসলেন সাক্ষাত্কারে বললেন, ইয়েস স্যার, নো স্যার, ঠিক স্যার। এটা ভালো লেগেছিল ট্রাম্পের। তিনি তাকেই নিয়োগ করতে চাইলেন। এরপর কুশনার হাজির করলেন ম্যাকমাস্টারকে। ম্যাকমাস্টার বৈশ্বিক কৗৈশল নিয়ে লম্বা-চওড়া এক বক্তৃতা দেওয়ার পর ক্যাসলেনের প্রতি মনোযোগ হারালেন ট্রাম্প। ম্যাকমাস্টার বিদায় নেওয়ার পরপরই ট্রাম্প, বিরক্তিকর। চাকরি পাওয়ার পরপরই ম্যাকমাস্টার হাজির হলেন মর্নি জো টিভি অনুষ্ঠানে। এটা দেখে বিস্মিত ট্রাম্প ভাবলেন, মিডিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো, তাকে নিয়োগ দেওয়া ভালো হয়েছে।
 
৪ এপ্রিল মধ্য সকালে হোয়াইট হাউসে সিরিয়ায় রাসায়নিক হামলা নিয়ে বিস্তারিত ব্রিফিংয়ের আয়োজন হলো। ইতিমধ্যে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল থেকে স্টিভ ব্যাননকে সরিয়ে দিতে ম্যাকমাস্টারের দাবি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মেনে নিয়েছেন। তবে ঘোষণা একদিন পর আসবে। বিকাল পর্যন্ত সিরিয়ায় হামলার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ট্রাম্পের কোনো প্রতিক্রিয়া চোখে পড়েনি। ব্যানন কোনো সহায়তা করছে না। তিনি তার ‘আমেরিকা সবার আগে’ নীতিতে অটল রয়েছেন। সিরিয়ায় হামলা হয়েছে, এতে যুক্তরাষ্ট্রের কি? তবে কিছু না করার নীতি মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি বিশেষজ্ঞদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। পরদিন ব্যাননকে এনএসসি থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো।
 
দিনা পাওয়ালকে সঙ্গে নিয়ে ইভানকা চেষ্টা করছিলেন বাবাকে স্বাভাবিক আচরণে আনতে। ওই দিনই বিকেলে ইভানকা ও দিনা সিরিয়ার হামলার ভয়াবহতা দেখালেন বড় পর্দায়। দৃশ্যগুলো ছিল ভয়াবহ। শিশুদের মুখ থেকে ফেনা বের হচ্ছিলো। ট্রাম্প বেশ কয়েকবার সেগুলো দেখলেন। সেদিন বিকেলে এক বন্ধুকে ট্রাম্প বলছিলেন, শুধু ফেনা আর ফেনা। আর সবাই ছিল শিশু। এতোক্ষণ পর্যন্ত ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপ ছাড়া অন্যসব বিষয় নিয়ে ভাবছিলেন। কিন্তু এটা দেখার পর তিনি সব ধরনের পদক্ষেপে আগ্রহ দেখালেন।
 
পরদিন ৫ এপ্রিল ট্রাম্পকে ব্রিফ করা হলো। সম্ভাব্য যেসব উপায়ে সিরিয়াকে জবাব দেওয়া যাবে তা জানানো হলো। কিন্তু ম্যাকমাস্টারের বিস্তৃত বর্ণনায় ট্রাম্প নিরাশ হলেন। পরদিন ফ্লোরিডায় চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন ট্রাম্প। শীর্ষ কয়েকজন সহযোগী তার সঙ্গে গেলেন। এয়ার ফোর্স ওয়ান মধ্য আকাশ থাকতেই জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক হলো। সেখানে সিদ্ধান্ত হলো, সিরিয়ার আল শায়রাত বিমানঘাঁটিতে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা চালানো হবে। চূড়ান্ত আলোচনা শেষে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরদিনই হামলা চালাতে আনুষ্ঠানিক নির্দেশ দিলেন।
 
বিকাল ৫টার পর এলেন চীনা প্রেসিডেন্ট সস্ত্রীক নৈশভোজে এলেন। ডিনার টেবিলে থাকাবস্থায় আল শাইরাত ঘাঁটিতে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হলো। রাত ১০টার কিছুক্ষণ আগে ট্রাম্প ঘোষণা দিলেন মিশন সম্পন্ন হয়েছে। সেই মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি করে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আনন্দিত ট্রাম্প এক বন্ধুকে আশ্বস্ত করলেন যে, ক্ষেপণাস্ত্রটি অনেক বড় ছিল। জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা একটু স্বস্তি পেল। ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় না এমন প্রেসিডেন্টকে এখন অনেকটায় চেনা লাগছে। অনিয়ন্ত্রিত প্রেসিডেন্টকে নিয়ন্ত্রণসাধ্য মনে হচ্ছে।

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP