বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» এনজিও »প্রকৃতির সন্তান ইসমাইল
প্রকৃতির সন্তান ইসমাইল

Tuesday, 6 February, 2018 05:06pm  
A-
A+
প্রকৃতির সন্তান ইসমাইল

ইসমাইল ঠিক যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অতিথি গল্পের তারাপদ। তারাপদ যেমন মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনের মায়ার বন্ধন ছিঁড়ে একদিন বেরিয়ে পড়েছিলেন প্রকৃতির সন্তান হয়ে তার কোলে। তেমনি ইসমাইল হয়তোবা তার মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনের স্নেহ, ভালেবাসা, আদর-সোহাগ ছেড়ে মাত্র / বছর বয়সে হারিয়ে গিয়েছিলো অজানায়। তাই সে হয়ে গেলো ঠিকানাবিহীন অনাথ। কোথায় যাবে, কে তাকে আশ্রয় দেবে, কে খেতে দেবে সে বোধ তার তখনো হয়নি। পৃথিবীর পথে পথে চারণশিশু হয়ে সে ঘুরে বেড়াতে থাকলো। শীত-বর্ষা-গ্রীষ্ম গৌরবর্ণ শিশুটির মাথার উপর দিয়ে চলে যায়, তবু সে নিজ গৃহের সন্ধান পায় না কিন্তু তাকে দেখে মনে হয়নি মা-বাবার জন্য এতটুকু কাতর, সে বাড়ী ফিরে যেতে চায়! সে কারো ভালেবাসার কাঙ্গাল নয়, অত্যন্ত দুরন্তপনাই তার স্বভাব; যেন সামাজিক-পারিবারিক বন্ধনহারা এলোকেশী ঝড়ের নাম।

পথ চলতে চলতে সে কখনযে কার হাতে পড়েছে, কতজনের হাত বদল হয়েছে তা আমাদের জানা নেই। সেও  বলতে পারে না, তা মনে রাখার প্রয়োজনবোধও তার নেই। হয়তো তার প্রয়োজন ছিলো বেঁচে থাকার জন্য একটু খাবার। সে খাবারের লোভ দেখিয়েই হয়তো বা কেউ তাকে পৃথিবীর আদিম ব্যবসায় নামিয়েছিলো। এক ভিক্ষুক দম্পতি প্রতিবন্ধী সাজিয়ে শিশুটিকে ভিক্ষাবৃত্তিতে যুক্ত করেছিলো।

পৃথিবীতে নানা ধরণের চিন্তার মানুষ রয়েছে। ঢাকা হতে ফেরার পথে ফেরীতে এইড ফাউন্ডেশন এর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান নির্বাহী তার সাথীদের নজরে আসে একটি ছেলে। তার একটি হাত পেছনের দিকে ঘুরানো মুখ বন্ধ ছিল। প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতায় তারা নিশ্চিত হন ছেলেটি প্রতিবন্ধী নয়। ছেলেটির সান্নিধ্যে এসে উপলব্ধি করেন তাকে প্রতিবন্ধী সাজিয়ে ভিক্ষা করানো হচ্ছে। বিপদ বুঝতে পেরে ইতোমধ্যে দম্পতি নীরবে সটকে পড়ে, তাদের খুজে পাওয়া গেলে জানা যায় ছেলটিকে তারা কুড়িয়ে পেয়েছে।

অগত্য অভিভাবকহীন ছেলেটিকে সাথে কারে নিয়ে আসেন তারা ইসমাইলের আগমন এইড কমপ্লেক্স- এক নতুন প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। এইড পরিবার তাকে গ্রহণ করে নিজের সন্তানের মতো করে। সকলেই তাকে ভালোবাসে কিন্তু যে ভালোবাসার কাঙাল নয় তাকে ভালোবাসা দিয়ে কি বাঁধা যায়? অনেকেই তার খোঁজ খবর নেয়, আদর সোহাগ এমনকি সহায়তাও করে থাকে। থাকা-খাওয়া, পোষাক-আশাক, লেখা-পড়ার ব্যবস্থা এইড কর্তৃপক্ষ করলেও সে কোনো নিয়মেই আবদ্ধ হয়নি। বছরাধিক কাল অতিক্রান্ত হলেও তার আশানুরূপ পরিবর্তনের কোনো লক্ষণই দেখা যায় না। এরই মধ্যে তার পরিবারেরও কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি, অবশেষে ছেলেটিকে নিয়ে এইড কর্তৃপক্ষ নতুন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। 

একটি অনাথ শিশুকে রাস্তা থেকে কুঁড়িয়ে এনে এইড তার আশ্রয় দিয়েছিলো, তার পিতা-মাতার কাছে ফিরিয়ে দেবার মানসে। ছেলেটির নিরাপত্তার কথা ভেবে এইড কর্তৃপক্ষ নিজস্ব দায়িত্ববোধ থেকে প্রথমেই ঝিনাইদহ সদর থানাতে একটি সাধারণ ডায়েরী করে (জিডি নং- ১১৬১ তারিখ ২৬/১০/১৬) এরপর ছেলেটির ছবিসহ প্রতিবেদন সামাজিক প্রচার মাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশ করে সন্ধান চাওয়া হয়, তারপর জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো ২২ মার্চ ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে ছবিসহ প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে তার পরিবারের খোঁজ করা হয়। কিন্তু সকল চেষ্টার ফলাফলই শূন্য।

সর্বশেষ অভিভাবকহীন এই মানব শিশুটির ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাকে সরকারী শিশু পরিবার (বালক) ঝিকরগাছা, যশোর পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কারণ প্রায় দেড় বছরের অভিজ্ঞতায় এইড কর্তৃপক্ষ বুঝতে পেরেছে যে ইসমাইলের মত শিশুর জন্য তার সমবয়সী একটি বিচরণ ক্ষেত্র প্রয়োজন, যেখানে তার জীবনের শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা অধ্যাবসায়ের জন্য অনুকুল পরিবেশ রয়েছে। রয়েছে শিক্ষকদের অভিভাবকসূলভ সহচার্য, তাই বর্তমান এই সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত বলে আমরা আশাবাদি। তবে এইড তার দায় মুক্ত হচ্ছে না, বরং অভিভাবক হিসেবে সারাজীবন তার দায়িত্ব পালন করে যাবে। পড়ালেখা শেষ হলে প্রয়োজনে তার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করবে এইড ফাউন্ডেশন।

সিদ্ধান্ত মোতাবেক সকল কার্যাদি সম্পন্ন করে আজ ২৬ মাঘ ১৪২৪ বঙ্গাব্দে (০৬ য়েব্রুয়ারী ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ) ইসমাইলকে সরকারী শিশু পরিবার, ঝিকরগাছা, যশোরে স্থানান্তর করা হয়। এইড ফাউন্ডেশন এর পক্ষ থেকে নকশী বাড়ী প্রকল্প প্রধান ইসমাইলের তত্ত্বাবধায়ক জনাব ফারুকুল ইসলাম টুটুলের নেতৃত্বে ০৪ (চার) সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল  সকাল সাড়ে টায় এইড কমপ্লেক্স থেকে রওনা হয়ে দুপুর দেড়টা নাগাদ সেখানে পৌঁছে সহকারী তত্ত্বাবধায়ক জনাব মোঃ আব্দুল গনির নিকট অর্পণ করে। সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায় অফিস ভবনটি জীর্ণ-পুরাতন হলেও মূল ডর্মেটরিটি ছিমছাম প্রয়োজনীয় আসবাপত্রে সজ্জিত আধুনিক বহুতল ভবন। একটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য অত্যন্ত সুন্দর পরিবেশ যার সাথে মানিয়ে নিতে এক মুহূর্ত সময় ব্যয় করেনি ইসমাইল, সে মিশে যায় নতুন বন্ধুদের সাথে খেলার মাঝে। 

 জন্ম হোক যথাতথা, কর্ম হোক ভালো ইসমাইলের জন্ম কোথায় আমরা জানিনা, তবে তার কর্ম হোক ভালো এইড পরিবার এই কামনা করে সবসময়। এইড কমপ্লেক্স- অবস্থানের দিনগুলি তার হাসি-কান্নার মিশ্র অনুভূতির হলেও সে এখানে প্রশ্নাতীতভাবে আদর সোহাগের মধ্যে ছিলো। এইড পরিবার প্রতিবেশীসহ সকলের নয়নের মনি হয়ে উঠেছিলো সে, তাই তার বিদায় বেলায় সকলের ছলছল চোখ বলছে-যেতে নাহি দিবো তোমায়---, কিন্তু বাস্তবতা বলছে, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়। ইসমাইলের মধ্যেও হয়তো অনুরূপ অনুভূতিই গুমরে গুমরে মরছে। শিশু মনের সে আকুল আকুতি অম্লান হয়ে থাকবে জানি। তবুও ইসমাইল যেনো তার শিক্ষা কর্মে সকলকে ছাড়িয়ে যায়, এই প্রার্থনা আমাদের।


এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP