বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» দেশের খবর »খরার কবল থেকে বাঁচতে দিনাজপুরে ব্যাঙের বিয়ে!
খরার কবল থেকে বাঁচতে দিনাজপুরে ব্যাঙের বিয়ে!

Saturday, 20 August, 2016 02:48pm  
A-
A+
খরার কবল থেকে বাঁচতে দিনাজপুরে ব্যাঙের বিয়ে!
ব্যাঙের বিয়ে, সেটাও আবার মহাধুমধামে। হিন্দুরীতি অনুসারে বিয়ের জন্য ছায়ামন্ডপ, পুস্পমাল্য, গায়ে হলুদ, আর্শিবাদের ধান-দুর্বা, খাওয়া সব ধরনের ব্যবস্থাই ছিলো এই বিয়েতে। শুধু তাই নয়, বিয়েতে আমন্ত্রিতরা ব্যাঙ দম্পত্তিকে দিয়েছেন নগদ অর্থসহ বিভিন্ন ধরনের উপহার সামগ্রী। অভিনব এই ব্যাঙের বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে দিনাজপুরের বিরল উপজেলার ৬নং ভান্ডারা ইউনিয়নের ভারাডাঙ্গী বেতুরা পশ্চিমপাড়া এলাকায়। 

শনিবার দুপুর প্রায় সাড়ে ১২ টার দিকে এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের নারী-পুরুষ মিলে সকলেই একত্রে হয়ে দু’টি ব্যাঙকে বিয়ের জন্য গায়ে হলুদের আয়োজন পালন করছেন। আর তার পার্শ্বে চলছে খাওয়া-দাওয়ার জন্য রান্নার কাজ। বিয়ের অনুষ্ঠানের কিছুদুরে পশ্চিম দিকে চলছে বাজনা আর তার সাথে সাথে নৃত্য করছেন অনেকেই। বিয়ের অনুষ্ঠানে ছিল গ্রাম্য বিয়ের নাচ-গীতি, জমি চাষের জন্য লাঙ্গল-জোয়াল ও ধানের চারা। 
গ্রামবাসীদের মধ্যেই ভাগাভাগি হয়ে কিছু লোক কনেপক্ষের আবার কিছু লোক বরপক্ষের। এই বিয়েতে বর ব্যাঙের নাম হৃদয় আর কনের নাম তপ্না। বর হৃদয়ের মা হয়েছিলেন শেফালী রানী আর কনে তপ্নার মা হয়েছিলেন ডালু বালা।

এলাকাবাসী জানিয়েছে, প্রচন্ড খরায় কবলিত হয়ে বৃষ্টির আশায় তাদের এই আয়োজন। যখনই অনাবৃষ্টির কবলে পড়েন সেই বছরই তারা বৃষ্টির জন্য ব্যাঙের এই ধরনের বিয়ে দিয়ে থাকে। আর এই রীতি তারা পালন করছেন শতবর্ষ পূর্ব থেকেই। 

তাদের মতে, হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ রামায়নে বর্ণিত বৃষ্টির দেবতাকে খুশি করার জন্য সেই সময়ে ব্যাঙের বিয়ের প্রচলন ছিল। ত্রেতা যুগের সেই ধারা অনুসারে ব্যাঙের বিয়ের আয়োজন করে থাকে ওই এলাকার বাসিন্দারা। তাদের বিশ্বাস ব্যাঙের বিয়ে দিলে বৃষ্টির দেবতা খুশি হয়ে বৃষ্টি দেন। শুধু হিন্দুদেরই নয়, সকল সম্প্রদায়ের লোকজন এই বিশ্বাস নিয়ে এই বিয়েতে অংশগ্রহন করেছেন। 
 
বিয়ের গীতির সাথে গায়ে হলুদের কার্যক্রম শেষ হলে শুরু হয় বিয়ের কার্যক্রম। ব্যাঙ দুটিকে তেল-সিদুর মাখিয়ে গোসল করানোর পর বসানো হয় বিয়ের পিড়িতে। মালাবদলসহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় পালন করা হয় বিয়ে। বিয়ে শেষে বরকনেকে বসানো হয় আরেকটি স্থানে। সেখানে বরপক্ষ ও কনেপক্ষ উভয়েই ধান-দূর্বা দিয়ে আর্শিবাদ করে নবদম্পত্তিকে। এরপর গ্রামবাসী ও আমন্ত্রিত অতিথিরা অনেকেই তাদেরকে নগদ অর্থসহ বিভিন্ন উপহার সামগ্রী প্রদান করে।  

এলাকার লোকজন জানান, যে বছর অনাবৃষ্টি হয়, প্রচন্ড খরার ফলে ক্ষেত ও প্রাণীকুলে হাহাকার উঠে সেই বছরই তারা এই ধরনের বিয়ের আয়োজন করে থাকেন। স্থানীয়ভাবে এটিকে ব্যাঙ্গা-ব্যাঙ্গির বিয়ে বলে থাকেন তারা। তবে কত বছর ধরে এই ধরনের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা চলে আসছে সে বিষয়ে জানাতে পারেনি কেউ। তবে তাদের মতে, একশ’ বছরের আগে থেকেই ওই এলাকার মানুষ এই ধরনের বিয়ের কার্যক্রম চলে আসছে বলে জানেন। 

এলাকার ৮৩ বছর বয়সী তেনিয়া বর্ম্মণ জানান, তিনি ছোট থেকেই এই ধরনের অনুষ্ঠানের সাথে পরিচিত। যখনই খরার কবল দেখা দিত তখনই এই ধরনের আয়োজন হতো। তিনি জানান, আগে বিভিন্ন এলাকায় এই ব্যাঙের বিয়ে দেখা গেলেও এখন খুব একটা চোখে পড়ে না। তিনি বলেন, আগে ব্যাঙের বিয়ে দেয়ার সাথে সাথেই বৃষ্টি হতো, এই বৃষ্টির আশাতেই তাদের এই আয়োজন।
 
একই এলাকার শামসুল হক জানান, এই বিয়ে হিন্দু, মুসলিম সকল সম্প্রদায়ের লোকজনের সহযোগিতায় তারা করে থাকেন। সকলের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাদা উঠিয়ে তারা এই বিয়ের আয়োজন করছেন। উদ্দেশ্য একটাই, আল্লাহ বা ভগবানকে তুষ্ট করা যাতে করে তিনি খরার কবল থেকে সকলকে রক্ষা করেন। 

একদিকে যখন বিয়ের অনুষ্ঠান তখন অন্যদিকে চলছে বাড়ির উঠোনে মানুষ দিয়ে হাল চাষ ও তারপর সেখানে চারা রোপনের কাজ। যারা এই কাজ করছিলেন তাদের মধ্যে একজন মহেশ চন্দ্র রায়। তিনি জানান, এটি এক ধরনের প্রতিবাদ। বৃষ্টি না হওয়ার ফলে বাড়ির উঠোনে ধানের চারা রোপন করে এই ধরনের প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে।


এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP