বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» ফিচার »এইহানে ২০ টাহায় পেট পুইরা ভাত খাওন যায়।
এইহানে ২০ টাহায় পেট পুইরা ভাত খাওন যায়।

Friday, 20 February, 2015 11:02  
A-
A+
এইহানে ২০ টাহায় পেট পুইরা ভাত খাওন যায়।
বাংলাদেশ টাইমঃ ‘মোরা গরীব মানুষ, ঢাহা শহরে নামী-দামী হোটেলে ঢুকতে পারি না। ঢুকলেও হোটেল বয়রা মোগোর লগে খারাপ ব্যব্হার করে। হেইখানে খাইতে গেলেও বেশী টাহা লাগে। যা রোজগার করি, তাতে আমাগো পক্ষে হোটেলে খাওন সম্ভব না। তাইতো কম টাহায় রাস্তার পাশেই ভাত খাই। এইহানে ২০ টাহায় পেট পুইরা ভাত খাওন যায়।’
২০ টাকায় ভূরিভোজ করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে তুলতে কথাগুলো বলছিলেন রিকশাচালক ইয়াসীন আলী।
ইয়াসীনের গ্রামের বাড়ি বরিশালের মটবাড়ীয়ায়। পরিবার-পরিজন গ্রামের বাড়িতে থাকলেও তিনি দীর্ঘদিন একাই রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার একটি বস্তিতে বাস করছেন। রিকশা চালানোর তাগিদে রাজধানীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছুটে বেড়ান তিনি। দিনের অন্যান্য সময় যেকোনো জায়গায় খাওয়াটা সারলেও রাতে ছুটে আসেন শাহবাগে। কারণ হিসেবে তিনি জানালেন, শাহবাগে কম টাকায় পেটপুরে ভাত খাওয়া যায়। এবং এখানকার খাবারের মানটাও নাকি অন্য জায়গার তুলনায় অনেক ভাল।
সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত শাহবাগের (জাদুঘরের সামনের) রাস্তার সড়ক দ্বীপে খোলা আকাশের নীচে ভাত বিক্রি হয়। বিভিন্ন পদের তরকারি-ভর্তা সাজিয়ে খদ্দেরের অপেক্ষায় বসে থাকেন বিক্রেতারা।
তাদের খদ্দেরের অধিকাংশই রিকশা-ভ্যান-সিএনজি চালক, দিনমজুর, পথশিশু ও ভিক্ষুকেরা। তবে মাঝে মাঝে ছাত্ররা এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের দু’-একজনও খেতে আসেন বলে বিক্রেতারা জানান। সন্ধ্যা রাতে বেচা-বিক্রি ভাল না হলেও রাত যতই গভীর হয়, খদ্দেরের সংখ্যা ততই বাড়তে থাকে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই খাবারের পাতিল সাজিয়ে বসেন শাহবাগের ভাত বিক্রেতা সালমা খাতুন। তবে কখনো কখনো দুপুর থেকেও তিনি ব্যবসা নিয়ে বসেন। কথা হয় তার সঙ্গে। সালমা জানালেন, শাহবাগে প্রায় ৫ বছর ব্যবসা করছেন। তিনি সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এখানে ভাত বিক্রি করেন।
তিনি আরও জানান, চার ধরনের তরকারি দিয়ে এখানে ভাত খেতে পারবেন। গরু মাংস দিয়ে পেটপুরে ভাতে খেলে খরচ হবে ৪০ টাকা। মাছ দিয়ে খেলে খরচ হবে ৩৫ টাকা, ডিম-ভাত ৩০ টাকা। এ ছাড়া সব্জি-ডাল দিয়ে খরচ হবে ২০ টাকা। বিশ টাকার বিনিময়ে যতক্ষণ ক্রেতার পেট ভরবে না ততক্ষণ খেতে পারবেন। এক কথায় বলা যায়, ‘বিশ টাকায় ভরপেট খাবার’।
তবে একটু হতাশা প্রকাশ করে সালমা বলেন,‘হরতাল-অবরোধের কারণে লোকজনের আনা-গোনা কম। আগের মতো বেচা-বিক্রি নেই।’
সামলার গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের সদরে। ৭ বছর আগেই তার স্বামী মারা গেছেন। ভাত বিক্রি করে তিনি তিন ছেলে-মেয়েকে পড়ালেখা করাচ্ছেন। সন্তানরা বড় হলে তিনি আর কষ্ট করে রাত জেগে ভাত বিক্রি করবেন না বলেও প্রত্যাশায় বুক বেঁধেছেন তিনি।
পাশে বসে ভাত বিক্রি করছিলেন ৫০ বছর বয়সী মোঃ জহুরুল ইসলাম ও স্ত্রী পারভীন আক্তার। কুমিল্লায় মাথা গুঁজার ঠাঁই থাকলেও রোজগারের পথ নেই তাদের। তাই তো স্বামী-স্ত্রী ঢাকা শহরে এসে ভাতের ব্যবসা করছে। পলাশীর মোড় এলাকায় একটি ভাড়া বাসাতে থাকেন তারা।
বেচা-কেনার ব্যাপারে জানতেই চাইলে জহুরুল জানালেন, হরতাল-অবরোধের কারণে বিক্রি কম। তারপরও বাধ্য হয়েই আসতে হয়। তা ছাড়া বসার জায়গাটাও স্থায়ী নয়। আজ আছে তো কাল উঠিয়ে দেওয়া হয়। বিভিন্ন সময় তাদের নানাভাবে হয়রানি করা হয় বলে অভিযোগ এই প্রবীণ ব্যবসায়ীর।
দামের ব্যাপারে জিজ্ঞাস করলে, তিনি সালমার মতো একই তথ্য দিলেন।
কারা খেতে আসেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রিকশাচালকরা বেশী আসে। এ ছাড়া যে সব লোক রাস্তায় থাকে, তারা আমাদের কাছে খেতেআসে। মাঝে মধ্যে ভার্সিটির মামারাও (ছাত্র) আসে। বিশেষ করে ঈদের সময় যখন ভার্সিটির হোটেল বন্ধ থাকে, তখন তারা আমাদের এখানে এসে খেয়ে যায়।’
পাশে বসে ভাত খাচ্ছিল টোকাই কিবরিয়া, তার দেশের বাড়ি কোথায় জানতে চাইলে সে বলে ভোলাতে। বাবা-মা কোথায় থাকে জিজ্ঞেস করতেই, ‘বাবা মরে গেছে। সৎ বাবা আছে। ঢাকায় রিকশা চালায়। আমাকে তাগো বাসায় যেতে দেয় না। বাসায় গেলে মেরে বের কইরা দেয়। তাই সারাদিন টোকাইয়ের কাম করি। তারপর এখানে ভাত খেয়ে রাস্তায় ঘুমায়।’
মাঝে মাঝে বিশ টাকার কমেও মিলবে পেটপুরে ভাত। তবে তা সব সময় নয়, হঠাৎ করেই কেউ কেউ খাবারের পাতিল নিয়ে হাজির হন শাহবাগে। তারা কম টাকায় খাবার বিক্রি করেন।
এমনি একজন হলেন মোঃ রাসেল, তিনি সব সময় শাহবাগে খাবার বিক্রি না করলেও মাঝে মাঝে খাবারের পাতিল নিয়ে তাকে দেখা যায়।
তিনি জানান, ‘পাশের হাসপাতালের খাবার বেড়ে গেলে, সেগুলো কম টাকায় কিনে আনি। পরে শাহবাগ ছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করি। যেহেতু কম টাকা কেনা, তাই মাঝে মাঝে ১৫ টাকায় ফুল পেট বিক্রি করি।

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP