বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» ফিচার »দেশে দেশে ”ভ্যালেন্টাইন ডে”
দেশে দেশে ”ভ্যালেন্টাইন ডে”

Friday, 13 February, 2015 10:42  
A-
A+
দেশে দেশে ”ভ্যালেন্টাইন ডে”
পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই পারস্পরিক ভালোবাসা এবং সৌহার্দ বিনিময়ের জন্য ১৪ ফেব্রুয়ারি দিনটি সবার জন্য উন্মুক্ত। এদিনেই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশিবার বলা হয়, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’। এমনকি শত্রুর প্রতিও ঘৃণার বদলে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার দিন। দিনটি বছরের অন্য দিনের চেয়ে আলাদা। ‘ভালোবাসি’ অনুভূতিটুকু আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের মধ্যেই দিবসটি পালনের সার্থকতা নিহিত থাকে।

বিশ্ব ভালোবাসা দিবস বা ভ্যালেন্টাইস ডে- উদযাপনের ইতিহাস অনেক পুরোনো। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এটিকে বিভিন্নভাবে গ্রহণ করেছে। ইউরোপ, আমেরিকার মতো পশ্চিমা সংস্কৃতির দেশগুলোতে ভালেন্টাইন ডে উপলক্ষ্যে ছুটি ঘোষণা করা হয়। জমকালোভাবে পালন করা বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। অন্যদিকে আবার এর ঠিক বিপরীত চিত্র আরব বিশ্বের দেশগুলোতে। পশ্চিমা সংষ্কৃতি এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিপন্থী এই অজুহাতে সৌদিতে ভ্যালেন্টাইন পালনের অভিযোগে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে বিভিন্ন সময়ে।

আমেরিকা: ১৯ শতাব্দীতে ব্রিটিশ অধিবাসী প্রথম উত্তর আমেরিকায় ভ্যালেন্টাইন ডের ধারণা নিয়ে আসে। ১৮৪৭ সালের দিকে ভ্যালেন্টাইন ডে ছড়িয়ে যায় পুরো আমেরিকায়। ১৯৮০ সালের দিকে ডায়মন্ড কোম্পানিগুলো 'ভ্যালেন্টাইন্স ডে' পালন শুরু করে। সেই থেকে জুয়েলারি চলে আসে প্রচলিত গিফটের তালিকায়। বিশ্বের সবচেয়ে আদিম এই অনুভূতিকেও বাণিজ্যিকীকরণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

ব্রিটেন: ব্রিটেনে চতুর্দশ এবং পঞ্চদশ শতাব্দীতে ভালোবাসা দিবস উদযাপনের প্রচলন শুরু হয়। বলা হয়ে থাকে, ভ্যালেন্টাইন ডেতে ব্রিটেন এবং ইতালির অবিবাহিত মেয়েরা সূর্যোদয়ের আগে ঘুম থেকে উঠত। তারা বিশ্বাস করত, সূর্যোদয়ের পর প্রথম যে পুরুষকে তারা দেখবে, সে অথবা তার মতোই কোনো পুরুষ এক বছরের মধ্যে তাদের জীবনসঙ্গী হবে। এ ছাড়া অবিবাহিত মেয়েরা কাগজে পছন্দের ছেলের নাম লিখত। সেই কাগজ মাটির বলে পেঁচিয়ে পানিতে ফেলত। যে নামের কাগজ সবার আগে ভেসে উঠত, ধারণা করা হতো তার সঙ্গেই বিয়ে হবে মেয়েটির।

অন্যান্য দেশের মতো ব্রিটেনেও কার্ড, ই-মেইল ও উপহার সামগ্রীর মাধ্যমে প্রিয়জনকে ভালোবাসার কথা প্রকাশ করলেও ব্রিটিশদের মধ্যে ফুল আদান প্রদানের আগ্রহ একটু বেশি দেখা যায়। 'ভ্যালেন্টাইন্স ডে'কে ঘিরে পদ্য লেখাটাও ব্রিটেনের ঐতিহ্যের অংশ।

ইতালি : ইতালিতে 'ভ্যালেন্টাইন্স ডে' বসন্ত উৎসব হিসেবে পালিত হয়। এক সময় খোলা আকাশের নিচে যুবক-যুবতীরা গান, আবৃত্তি করতো। এরপর ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে বাগানে ঘুরে বেড়াত। কিন্তু কয়েক শতাব্দী ধরে এই ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে ইতালিতে। এখন ইতালিতেও আমেরিকার মতো ছুটির দিন থাকে। উপহারের তালিকায় থাকে চকোলেট, পারফিউম, গোলাপ আর ডায়মন্ড।

ফ্রান্স: ইতিহাস সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে, বিশ্বে সর্বপ্রথম ১৫ শতাব্দীর শুরুর দিকে ফ্রান্সে শুরু হয়েছিল ভালোবাসা দিবসের প্রচলন। যুদ্ধের সময় আটককৃত এক যুবক তার স্ত্রীকে খুব মিস করছিল। সে চিঠির মাধ্যমে ভালোবাসা ও মনের কথা স্ত্রীর কাছে জানালেন। এর প্রায় ২০০ বছর পর গোলাপ ভালোবাসা দিবসের প্রতীক হিসেবে প্রচলিত হয়ে ওঠে। ফ্রান্সের রাজবংশের চতুর্থ হেনরির মেয়ের আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে সব পুরুষ-মহিলাকে গোলাপ দিতে শুরু করে। এভাবেই ভালোবাসা দিবসের ধারণা ধীরে ধীরে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

যেহেতু ভ্যালেন্টাইন ডের জন্মকথার সঙ্গে ফ্রান্স ওতপ্রোতভাবে জড়িত, এজন্যে এই দিনটিকে ঘিরে এদের উৎসাহ একটু বেশি। ফ্রান্স থেকেই শুরু হয় ভালোবাসা দিবসে কার্ড উপহারের প্রথা। চার্লস নামের এক ব্যক্তি প্রথম ভ্যালেন্টাইন কার্ড লেখেন। অভিজাত কার্ডে উপহার রীতি প্রচলিত রয়েছে দেশটিতে।

কানাডা : কানাডায় ভালোবাসার বিশেষ দিনটি বেশ উৎসাহের সঙ্গে পালিত হয়। সারা দেশে বল ড্যান্স এবং পার্টির আয়োজন করা হয়। উপহার হিসেবে গোলাপের প্রাধান্য বেশি। এরপর চকোলেট, কার্ড, ক্যান্ডি তো আছেই। শিশুরা বন্ধুদের মধ্যে কার্ড বিনিময় করে। নিজের হাতে উপহার বানিয়ে শিক্ষক এবং বাবা-মাকে দেয়। দিনটিকে উদযাপন করতে স্কুলের সিনিয়র সেকশনে থাকে ড্যান্স পার্টি।

অস্ট্রেলিয়া : অস্ট্রেলিয়ায় 'ভ্যালেন্টাইন্স ডে' এখন একটি বিশাল উৎসব। দিন দিন বাড়ছে এর জনপ্রিয়তা। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সের তরুণ-তরুণীর প্রায় ৯০ ভাগেরও বেশি এবং ৫০-এরও বেশি বয়সীদের প্রায় ৪৫ ভাগের ভ্যালেন্টাইন উদযাপনের প্রস্তুতি চোখে পড়ার মতো। অস্ট্রেলিয়ানরা এই দিনকে দেখে থাকে পরিবার, বন্ধুবর্গ, সহকর্মী এবং পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও বেশি মজবুত করার দিন হিসেবে। অস্ট্রেলিয়ায় অনেকটা একই ধাঁচে উপহারের আদান-প্রদান হয়। তবে এখানে এসএমএস, ইমেইল মিডিয়া ব্যাপক ব্যবহৃত হয়ে থাকে। জরিপে দেখা গেছে, অস্ট্রেলিয়ার ছেলেরা ভালোবাসার ক্ষেত্রে মেয়েদের চেয়ে অনেক বেশি উদার। এদিন উপলক্ষেও ছেলেরা মেয়েদের তুলনায় অনেক বেশি উপহার কেনে।

জাপান : পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর মতো নয়, জাপান একটু ভিন্নভাবে ভালোবাসা দিবসটি উদযাপন করে। প্রতি বছর এ দিনটিতে নারীরা কাছের মানুষকে নানা ধরনের চকোলেট উপহার দেন। কে কী ধরনের চকোলেট উপহার দেবেন, সেটা নির্ভর করে পরস্পরের সম্পর্কের ওপর। 'গ্রি-চকো' নামের চকোলেট দেয়া হয় অফিসের কর্তাব্যক্তি ও সহকর্মীদের। অন্যদিকে 'হনমেই চকো' নামের চকোলেট শুধু পুরুষ সঙ্গী বা স্বামীকে দেয়া হয়। জাপানি নারীরা প্রেমিক বা স্বামীকে যে চকোলেট দেন, সেগুলো কষ্ট করে নিজেরা তৈরি করেন। ‘হনমেই চকো’ কিনে দিলে ভালাবাসার আন্তরিকতার প্রকাশ পায় না বলেই তারা কষ্ট করে হাতে তৈরি করে দেন।

তবে ভালোবাসা দিবসে এদেশের পুরুষরা সাধারণত কোনো ধরনের উপহার দেন না। ভালোবাসা দিবসের ঠিক এক মাস পর অর্থাৎ ১৪ মার্চ জাপানি পুরুষদের জন্য আসে 'হোয়াইট ডে'। এ দিনে তারা প্রিয় নারীকে ভালোবাসা দিবসে দেয়া উপহারের প্রতিদান দেন। এদিন সাদা রঙের চকোলেট দেওয়া হয়ে থাকে। দুটো দিবসে সাধারণত ২০ বছরের কম বয়সীদের উৎসাহ থাকে বেশি।

চীন: চীনাদের নিজস্ব সংস্কৃতিতে ভালোবাসার জন্য আলাদা একটি দিন আছে। চীনা পঞ্জিকা মতে, সপ্তম চন্দ্র মাসের সপ্তম দিনে থাকে এই বিশেষ দিনটি। দিনটিকে বলা হয় কি-জি। অথবা ‘দ্য নাইট অব সেভেনস’। গতানুগতিক ভ্যালেন্টাইন ডে থেকে দিনটি আলাদা। নির্দিষ্ট প্রথানানুযায়ী পালন করা হয় দিনটি। এ ছাড়া ফুল, চকোলেট, কার্ড আদান-প্রদানও চলে। জানা যায়, ভালোবাসা দিবসের বহুল প্রচলিত উপহার লাল গোলাপের প্রচলন শুরু হয়েছিল চীনে। ১৮০০ শতাব্দীতে প্রথম চীনে ভালোবাসার মানুষকে লাল গোলাপ উপহারের প্রচলন শুর হয়।

দক্ষিণ আফ্রিকা: ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ তে সাধারণত রোমান্টিক ডেটে যায় প্রেমিক-প্রেমিকা বা স্বামী-স্ত্রীরা। মনের কথা জানায় বিশেষ দিনটিতে। এ ছাড়াও কোনো কোনো জায়গায় পালিত হয় ‘লিউপারক্যালিয়া’ নামে রোমান ফেস্টিভ্যাল। এখানে যার যার পোশাকে তাদের প্রেমিক-প্রেমিকার নাম ছাপানো থাকে। এ ছাড়াও আয়োজন থাকে পাব ও রেস্টুরেন্টে।

সারা বিশ্বে বিপুল উৎসাহ নিয়ে ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ উৎযাপিত হলেও, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর চিত্র কিন্তু একেবারেই বিপরীত। যদিও ইরাক, পাকিস্তান এবং সৌদি আরবের দেশগুলোর যুবক যুবতীদের মধ্যে দিনটিকে ঘিরে রয়েছে প্রবল কৌতুহল। কিন্তুভালোবাসা দিবস উৎযাপন সেখানে দ-নীয় অপরাধ।

সৌদি আরব: কয়েক বছর আগে ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ উদযাপনকে কেন্দ্র করে সৌদি পুলিশের পক্ষে জারি করা এক  বিবৃতিতে বলা হয়, ‘প্রতারক পুরুষদের কবল থেকে সৌদি নারীদের হেফাজত করতে তারা বদ্ধ পরিকর। এই দিনে পুরুষেরা মিথ্যা অনুভূতির আশ্রয় নিয়ে নারীদের সঙ্গে ভালোবাসার ভান করে। এটা নারীদের প্রকৃত সম্মানের জন্য ক্ষতিকর।’

সৌদি আরবের বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন’স ডে বিরোধী ক্যাম্পেইন চালায়। তাদের মতে, যে সকল মুসলিম ভ্যালেন্টাইন’স ডে উদযাপনে অংশ নেয় তাদের ঈমান দুর্বল এবং ধর্মের মহৎ উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত। এমনকি ওই দিনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ফুলের দোকান থেকে সব লাল গোলাপ বাজেয়াপ্ত করে দেশটির পুলিশ।

পাকিস্তান: কট্টরপন্থী পাকিস্তানের লাহোর, ইসলামাবাদ এবং করাচির মত শহরেগুলোতে ভ্যালেন্টাইন’স ডে’র উপহারসামগ্রীর বেচাকেনা ভালোই হয়। তবে পাকিস্তানের ইলেক্ট্রনিক সম্প্রচার মাধ্যমে ভ্যালেন্টাইন’স ডে’র অনুষ্ঠান প্রচারে সরকারি কড়াকড়ি রয়েছে। দেশটির জাতীয় ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ ভ্যালেন্টাইন’স ডে উদযাপন ‘পাকিস্তানের সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে মনে করে। এ ধরণের ইভেন্ট পাকিস্তানের তরুণ সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করে এ সংক্রান্ত অনুষ্ঠান সম্প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ভ্যালেন্টাইন ডে পৃথিবী জুড়ে নোংরামি ছড়িয়ে দিয়েছে বলে দাবি পাকিস্তান জামাতে ইসলামী ছাত্র সংগঠনের।

ইরান: ইরানের যুব সমাজকে পশ্চিমা সংস্কৃতির ‘কু-প্রভাব’ থেকে মুক্ত রাখতে ভ্যালেন্টাইন’স ডে’র উদযাপন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেশটি। ভ্যালেন্টাইন’স ডে সংক্রান্ত যে কোন ধরনের কার্ড, পোস্টার ছাপানো, উপহারসামগ্রী বিপণন, বিতরণ ও প্রদর্শনকে নিষিদ্ধ করা হয়। ২০০৮ সালের পর থেকে ইরানে প্রকাশ্যে ভ্যালেন্টাইন’স ডে পালন করতে দেখা যায়নি।

রয়টার্সের এক তথ্যানুযায়ী, ইরানের প্রায় ৭০ শতাংশ নাগরিক যাদের বয়স ৩০ এর নিচে, ভ্যালেন্টাইন’স ডে’ তে তারা ছুটি পেতে আগ্রহী। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও, তরুণদের মধ্যে দিনটির জনপ্রিয়তা বাড়ছে বলে জানায় রয়টার্স।

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP