বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» ফিচার »তবু কণ্ঠে তার জীবনের জয়গান
তবু কণ্ঠে তার জীবনের জয়গান

Saturday, 7 February, 2015 08:31am  
A-
A+
তবু কণ্ঠে তার জীবনের জয়গান
বাংলাদেশ টাইমঃ  পৃথিবীর রং-রূপ-সৌন্দর্য হয়নি তার দেখা। হয়নি তার নিজ চোখে নিজেকে দেখাও। তবু হারতে চান না তিনি। চান না, মানুষের দুয়ারে ভিখারীর ন্যায় হাত পাততেও। কারণ আছে তার আত্মবিশ্বাস, আছে জীবনযুদ্ধে এগিয়ে যাওয়ার জন্য কণ্ঠভরা গান।

সারাদিন পায়ে হেঁটে হাট-বাজার, পথে-প্রান্তে ঘুরে গান গেয়ে চলে তার সংসার। বলছিলাম দৃষ্টিহীন বয়াতী শরিফুল ইসলামের সংগ্রামময় জীবনের কথা। তিনি গান গেয়ে যে উপার্জন করেন তা দিয়েই চালান চার সদস্যের সংসার। অবশ্য নিজের কণ্ঠ আর দোতারার সুরের যাদু দিয়ে শ্রোতাদের মন জয় করেই তবে সে উপার্জন।

দৃষ্টিহীন বয়াতী শরিফুল ইসলামের বাড়ি গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ীর মনোহরপুরের চৌরাস্তা ঘোড়াবান্ধা গ্রামে। তার বাবা শাহজাহান মিয়া দিনমজুর। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে শরিফুল ইসলাম সবার ছোট। তার সাথে দেখা মেলে গাইবান্ধা জেলার সাদুল্যাপুর উপজেলা শহরে ডিগ্রি কলেজ রোডে। একটি বেঞ্চে বসে দোতারার তালে তালে গান করছেন। চারপাশে দর্শক গিরে তার গান শুনছে। গান শেষে কথা হয় শরিফুলের সাথে, বললেন, ‘জন্ম থেকে অন্ধত্ব নিয়ে জীবনযাপন করছি। ছোট থেকে গানের প্রতি আমার অন্যরকম এক নেশা। সেই নেশা আজ পেশাতে পরিণত হয়েছে।’

অন্ধত্বের এ প্রতিবন্ধিকতাকে নিয়েই বছর সাতেক আগে গাইবান্ধা শহরের ডেভিট কোম্পানীপাড়ার ইউসুফ আলীর মেয়ে ইসরাত জাহান খাতুনকে বিয়ে করেন তিনি। দাম্পত্য জীবনে সংসার আলো করে আসে মেয়ে সন্তান। নিজের নয়ন দিয়ে পৃথিবীর আলো দেখতে না পাওয়ার বেদনায় শরিফুল তার নাম রেখে আঁখি আক্তার।

আঁখির বয়স এখন ৫ বছর। এরপর তিন বছর পর জন্ম নেয় আরও একটি ছেলে সন্তান। তার নাম রাখেন রিয়াদ মিয়া। শরিফুল জানালেন, স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে চার সদস্যর সংসার তার। পিতার দরিদ্রতার কারণে বিয়ের পর থেকে সংসারের ভার নিজের কাঁধে পড়ে। চার সদস্যর পরিবারের ব্যয় বহনে একমাত্র অবলম্বনেই হল গান। আর গানের জন্য সম্বল হল একটি দোতারা। এভাবেই তিনি স্ত্রী-সন্তানদের মুখে হাঁসি ফোটাতে আর তাদের মুখে দু’বেলা দু’মুঠো খাবার জোগাতে সারাদিন পায়ে হেঁটে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নিজের কণ্ঠে গান করেন। এরপর উপার্জিত অর্থেই চলে তার সদাই-পাতি।

চলাফেরার জন্য অন্যের সাহায্যে নিতে হয় কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার দৃষ্টি না থাকলেও মনের আলোয় চলতে পারি। বাড়ি থেকে আশপাশের যেখানে যেতে ইচ্ছে পথ ধরেই চলি।

তিনি আরও জানান, অনেক দৃষ্টিহীন আছে যারা ভিক্ষে করেন। কিন্তু তিনি তা পছন্দ করেন না। হোক কষ্ট, তবু ভিক্ষা নয়— এ বিষয়ে তার স্পষ্ট অবস্থান।

শরিফুল জানান, তিনি গাইবান্ধা সদর, পলাশবাড়ী ও সাদুল্যাপুরের হাট-বাজারসহ প্রত্যন্ত এলাকার সাধারণত গান করে থাকেন। এ অন্ধ শিল্পীর দাবী তার কণ্ঠ মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে, বেশ সাড়া মিলছে। আঞ্চলিক, দেশের গান, লালন, মাইজভাণ্ডারী, দেহতত্ত্ব ও মারেফতীর মন মাতানো গানের সুরে গান পাগল মানুষেরা তাকে ‘বয়াতী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

অবশ্য শরিফুল ইসলামের আক্ষেপ, ত্রিশ বৎসর অন্ধত্বকে সাথে নিয়ে জীবন অতিবাহিত করলেও কোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা স্থানীয় প্রশাসন তার দিকে ফিরে চাইনি। বাড়ায়নি সহযোগিতার হাত।

তার চিন্তা দিন যত যাচ্ছে চারিদিকে খরচ তত বাড়ছে— সে খরচ তো কেবল একার জন্য নয়, কারণ সংসারের ভার তারই তো ওপর।

শরিফুল হারতে চান না, পারতে চান। হতে চান জীবনযুদ্ধে বিজয়ী।

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP