বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» অপরাধ »বইমেলার কিছু ছিন্ন ভাবনা
বইমেলার কিছু ছিন্ন ভাবনা

Thursday, 26 February, 2015 10:56am  
A-
A+
বইমেলার কিছু ছিন্ন ভাবনা
বাংলাদেশ টাইমঃ খুব অল্প সময়ের মধ্যে একুশের বইমেলা পাল্টে যেতে দেখলাম। যখন ছিলাম বইমেলা থেকে দূরে, মফস্বল শহরে তখন পত্রিকার পাতায় মেলার সংবাদ পড়ে, ছবি দেখে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটাতাম। ঢাকা থেকে একটু দূরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে সেই সাভার থেকে প্রায় রোজই মেলায় আসতাম; নতুন বইয়ের ঘ্রাণ আর প্রাণের উত্তাপ আহরণ করতে। আর অকিঞ্চিৎকর লেখালেখির সুবাদে যখন প্রথম আমার বই প্রকাশিত হলো মেলায় তখন অনুভূতিটা আরেকটু অন্যরকম। মেলাটা তখন আরো বেশি আপন, বেশি প্রাণময়। 

তবে প্রতিবছর মেলা এলেই কিছু বিষাদও ঘনিয়ে আসে। হুমায়ুন আজাদের উপস্থিতি ছাড়া মেলার কথা কি ভাবতে পারতাম কখনো? কিংবা হুমায়ূন আহমেদের? এই যেমন লিটলম্যাগ কর্ণারে প্রায় প্রতিসন্ধ্যায় যার উপস্থিতি বলতে গেলে অনিবার্য ছিল সেই কবি ও সম্পাদক খোন্দকার আশরাফ হোসেন যখন এই মেলায় ছবি হয়ে যান, তাঁর নামে নামকরণ হয় ‘খোন্দকার আশরাফ হোসেন লিটলম্যাগ চত্বর’ তখন বসন্তেও যেন লাগে শোকের ছোঁয়া। না, শুধু শোক নয়; পরক্ষণেই ভাবি- আছেন তো; শামসুর রাহমান, শওকত ওসমান, আহমদ শরীফ, সরদার ফজলুল করিম, রশীদ করীম, মাহমুদুল হক, শহীদুল জহির সবাই-ই তো আছেন বইমেলায় থরে থরে সাজানো বইয়ের সারিতে।  


প্রতিবছর বইমেলা এলেই একটি ভাবনা ফিরে ফিরে আসে। বই আগে না বইমেলা আগে? বাংলাদেশে যখন একুশে গ্রন্থমেলা ছিল না তখন কি বই প্রকাশ পেত না? শুধু ফেব্রুয়ারি মাসই কি বই প্রকাশের মৌসুম? বই তো তখন অবশ্যই বেরুতো এবং এখনকার চেয়ে সেসব বইয়ের মানও ছিল যথাযথ রক্ষিত। এখনকার মতো ডিসেম্বর-জানুয়ারিকেন্দ্রিক বই গোছানোর তৎপরতা যেমন তখন লেখকদের ছিল না, তেমনি ফেব্রুয়ারি এলেই কোনোমতে ছাপাই-বাঁধাই করে ভুলে ভরা ভেজাল বইটা পাঠকের ঝুলিতে গছিয়ে দিতে প্রকাশকরাও সাহস করত না। এখন অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যে দোষটা না লেখকদের দেওয়া যায়, না প্রকাশকদের। প্রকাশনার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় একটা অচলায়তন তৈরি হয়েছে। এই অচলায়তন না ভাঙা গেলে প্রকৃত জ্ঞানভিত্তিক সমাজ সৃজনের আকাঙ্ক্ষা অঙ্কুরেই মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য। 

রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘ভালো বই পড়িবার সময় মনে থাকে না যে বই পড়িতেছি।’ আর প্রমাদপূর্ণ বই পড়তে পড়তে আমাদের বারবার মনে হয় একটা যন্ত্রণাকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। তখন কিন্তু বই পড়ার আগ্রহটাও ফিকে হয়ে আসে। এ জন্য একুশের চেতনা শুধু পৌষ-ফাগুনের পালায় সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছর ধরে যদি বইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত-পরিচর্যা ও প্রকাশ করা যায় তবে বোধহয় ভাষার জন্য জীবনদানের গৌরবগান আমাদের কণ্ঠে শোভা পাবে। পৃথিবীর আর কোথাও কোনো নির্দিষ্ট মাস ধরে বই প্রকাশ হয় বলে আমাদের জানা নেই। অনেকে হয়ত বলবেন, এটাই আমাদের স্বাতন্ত্র। বিনীতভাবে বলতে চাই মানুষ- ঠকানো বিকৃত স্বাতন্ত্রের হাত থেকে নিস্তার চাই। বই বের হোক জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি মার্চ এপ্রিল মে জুন জুলাই আগস্ট সেপ্টেম্বর অক্টোবর নভেম্বর ডিসেম্বর- সকল সময়ে। যে কোনো পণ্যের মান যাচাইয়ের জন্য যেমন বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান থাকে তেমনি বইয়ের মান যাচাইয়ের জন্য একটি পরিকাঠামো গড়ে উঠুক। ভেজাল খাদ্য সরবরাহের জন্য যেমন জেল জরিমানার ব্যবস্থা থাকে, তেমনি মানবর্জিত বইয়ের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা নির্ধারিত থাকুক। গ্রন্থমেলায় স্টলপ্রাপ্তির জন্য যেন-তেন বই দিয়ে ক্যাটালগ দীর্ঘ করার প্রবণতার বিপরীতে অন্তত একটি স্মরণীয় পাঠযোগ্য বই প্রকাশের প্রতিযোগিতা শুরু হোক।


কবিতার বইয়ের বিক্রি বইমেলায় খুবই কম। কিন্তু আমরা যখন দেখি রাজনীতিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত আমলা, বিচারকরা পর্যন্ত যখন তাঁদের মূল্যবান সামাজিক পরিচিতির বাইরে অল্প একটু কবিখ্যাতির জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করেন তখন প্রশ্ন জাগে আমাদের সমাজে ‘কবি’র অবস্থানটা ঠিক কোথায়? কেন কবি হওয়ার জন্য বিপুল মানুষের জোর প্রচেষ্টা আর কেনই বা বিশিষ্ট বহু কবিরও কাব্যগ্রন্থের প্রথম সংস্করণ কয়েক বছরেও শেষ হয় না? এর সোজা-সাপ্টা উত্তর খুঁজে পাওয়া ভার। তবু একটা কারণ হয়তো অনেকেই বলবেন যে, আধুনিক কবিতার দুর্বোধ্যতাই পাঠককে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। এবং ভাবতে অবাক লাগে যে শিল্পসাহিত্যের অন্যান্য মাধ্যমে কাজ করা ব্যক্তিরাও যখন একই কথা বলেন। প্রশ্ন আমাদের-কবি কি সর্বজনবোধ্য পদ্য লিখবেন? নাকি বাংলা ও বিশ্বকবিতা বর্তমানে যে পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে তার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করবেন? যদি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কথা ধরি তাহলে দেখব প্রাথমিক জ্ঞান নিয়েই তো একজন বিজ্ঞানী বা প্রযুক্তিবিদ বসে থাকেন না। তিনি তো ক্রমশ নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে চান- নতুন নতুন উদ্ভাবনায়। তাঁর এই উদ্ভাবনার স্বাদ ও সুফল পেতে হলে ভোক্তা সাধারণকেও কিন্তু শ্রম ও মনোযোগ দিতে হবে। কবির কবিতা উপলব্ধি করতে হলেও পাঠকের শিল্পশিক্ষা থাকা জরুরি। শুধু কবিতা না যে কোনো সাহিত্য ও শিল্পকর্ম অনুধাবনেই এই শিক্ষা শর্তবিশেষ। তাই আধুনিক কবিতার বইয়ের নিদারুণ স্বল্প বিক্রয়ের জন্য একতরফাভাবে কবিকে দায়ী না করে পাঠকের মানের উন্নয়ন-অবনয়নের দিকেও ফিরে তাকানো দরকার। 


অমর একুশে মানে কেবল বইমেলা নয়; এক সময় একুশে এলেই একুশের সংকলন প্রকাশের উৎসবও শুরু হয়ে যেতো, আর প্রভাতফেরির পর বইমেলায় এসব সংকলন বিক্রি, কখনো বা বিনামূল্যে বিলি করা হতো। কাঁচা-পাকা হাতের লেখায় রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের পাড়ামহল্লা থেকে এইসব সংকলন প্রকাশে উদ্যোগী হতো মূলত প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন-সাংস্কৃতিক সংগঠন-ক্লাব-সমিতিসহ আরো অনেকেই। এইসব সংকলনে অন্তর্ভুক্ত সব লেখাই যে শিল্পোত্তীর্ণ ছিল তা নয়, কিন্তু মানুষের সমষ্টিক আবেগ প্রকাশের একটি বিশিষ্ট মাধ্যম ছিল এই সব সংকলন। বেশ অনেকদিন হলো নাগরিক জীবনে ক্রমবিচ্ছিন্নতার প্রাদুর্ভাবে প্রায় সকল শুভ যৌথ উদ্যোগের পাশাপাশি একুশের সংকলন প্রকাশেও যেন নেমে এসেছে দুঃখজনক ভাটা। 

বিশিষ্ট লেখক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এ নিয়ে একটি চমৎকার লেখা লিখেছিলেন ‘সংকলনগুলো গেল কোথায়’ শিরোনোমে। বইমেলায় একুশের সকালে এখনো নিয়মিতভাবে দুটো সংকলন খুঁজে পাওয়া যায়- এক. বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের একুশের স্মারক ‘জয়ধ্বনি’ আর মারুফ রায়হান সম্পাদিত ‘একুশের সংকলন’। আমরা চাই অমর একুশেকে কেন্দ্র করে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ঐতিহাসিক একুশে ফেব্রুয়ারির মতো সংকলন বের হোক; যে সংকলনের পাতা থেকে বেরিয়ে আসবে আমাদের আগামীদিনের অঙ্গীকারঋদ্ধ-শিল্পদীপ্ত কবি-লেখকেরা। 

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP