বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» জাতীয় »দেহি ঘুমের মধ্যেই সব পুইড়া শেষ
দেহি ঘুমের মধ্যেই সব পুইড়া শেষ

Wednesday, 4 February, 2015 09:39  
A-
A+
দেহি ঘুমের মধ্যেই সব পুইড়া শেষ
বাংলাদেশ টাইমঃ  ‘আগুনের তাপ আর চিৎকারে আমার ঘুম ভাঙে। জাইগা দেহি চারদিকে আগুন আর আগুন। দেহি ঘুমের মধ্যেই সব পুইড়া শেষ। জানালা দিয়া বাইরে আইছি। কিন্তু বড় ভাইডারে আর বাঁচাইতে পারলাম না। ভাতিজাটাও মনে হয় বাঁচবো না…।’ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইনস্টিটিউটের বিছানায় শুয়ে কেঁদে বলছিলেন মো. হানিফ (৩৫)।

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে সোমবার রাতে বাসের আগুনে পুড়েছেন তিনি। এ ঘটনায় মারা গেছে হানিফের বড় ভাই মো. ইউসুফ (৪৫)। মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন ভাতিজা রাশিদুল ইসলাম (২০)।

হানিফ কেঁদে জানান, কক্সবাজার জেলার চকরিয়ার বড়াইতলা এলাকায় কাঁচামাল ব্যবসায়ী তিনি। বুধবার তার বড় ভাই ও ভাতিজা রাশিদলের কাতার যাওয়ার কথা ছিল। একই সঙ্গে কাতার যাচ্ছিলেন প্রতিবেশী আবু তাহের (৪৫) ও জমির আলী (৩৮)। তাদের চারজনকে ফ্লাইটে তুলে দিতে সঙ্গে আসছিলেন হানিফ ও প্রতিবেশী মানিক। পথে আগুনে পুড়েছেন সবাই। ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন কাতারের যাত্রী ইউসুফ ও আবু তাহের।

হানিফের চোখে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের আইকন পরিবহনের বাসের আগুনের ঘটনা যেন এক বিভিষীকা। ঘটনার বর্ণনা করে কেঁপে কেঁপে কেঁদে ওঠেন তিন। একইভাবে ঘটনার বর্ণনা করেন আগুনে পুড়েও এখনো বেঁচে থাকা অন্য দগ্ধ রোগীরা।

৩৬ জন ধারণক্ষমতার নৈশ বাসটিতে প্রায় সব যাত্রীই ঘুমে ছিলেন। বাসে দুর্বৃত্তদের ছোঁড়া পেট্রোল বোমার আগুনে জেগে দিশেহারা হয়ে পড়েন তারা। প্রাণপন চেষ্টা করে জানালার কাঁচ ভেঙে লাফিয়ে পড়ে বেঁচেছেন কেউ কেউ। তবে ঘুমে নিমঘ্ন থাকার কারণে বাসে পুড়েই মারা গেছেন সাতজন। আর যারা বের হতে পেরেছিলেন তারাও অসহায়ের মতোই পুড়েছেন।

মঙ্গলবার পর্যন্ত এ ঘটনায় দগ্ধ রোগীদের ছয়জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। সেখানকার আবাসিক চিকিৎসক পার্থ শংকর পাল  জানান, দগ্ধদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। দগ্ধ হানিফের ভাতিজা রাশিদুল ইসলামের শরীরের ৮০ শতাংশ পুড়ে গেছে। হানিফের পুড়েছে নয় শতাংশ। অন্যদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের রুপগঞ্জের পপকর্ন বিক্রেতা শফিকুল ইসলামের (১৮) শরীরের ২৮ শতাংশ এবং মানিগঞ্জের জিলকদ আহমেদের (২০) শরীরের ২০ শতাংশ পুড়েছে। এ দুইজনের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। বাকিরা আশঙ্কামুক্ত।

বাসে আগুনের ঘটনা বলতে গিয়ে কেঁদে ওঠেন ফেরিওয়ালা শফিকুল ইসলাম। ‘ভাই আমি ঘুমাইয়া ছিলাম। আমি সামনের দিকের থেকে দুই সিট পেছনে ছিলাম। হঠাৎ কইরা দেহি ধুয়া। আন্ধকার আর অন্ধকার। মনে হয় আমার সাইলেই আগুন ধরছে। বাইর হইতে পারতাইছলাম না। গ্লাস ভাঙার চেষ্টা করেও পারি নাই। মনে হইল এই আমার জীবন শেষ। এক সময় দেহি একটু ফাঁকা। সেইটা দিয়া বাইর হইছি।’

শফিকুল কেঁদে জানান, তারা নয়জন ফেড়িওয়ালা ১০ জানুয়ারি কক্সবাজারে ফেরি করতে যান। বিক্রি করে বাড়ি ফিরছিলেন সবাই। ফেরার পথে প্রায় ১৮ হাজার টাকার চুড়ি, লেইস-ফিতা কিনেন শফিকুল। এসব পণ্য নারায়ণগঞ্জে এনে ফেরি করে বিক্রি করতে চেয়েছিলেন তিনি। শফিকুল খালার জন্য সাড়ে তিন কেজি শুটকি মাছও কিনে আনেন। আগুনে শরীরের সঙ্গে শফিকের সবই পুড়ে গেছে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের কাফাইকান্না এলাকার পপকর্ন বিক্রেতা শফিকুলের বাবা আলাউদ্দিন আটোচালক। দুই মাস আগে তার মা মারা গেছে। পাঁচভাই দুই বোনের মধ্যে শফিকুল তৃতীয়। বাবা প্রায়ই অসুস্থ্য হওয়ার কারণে শফিকুলকেই সংসারের হাল ধরতে হয়।

দগ্ধ মো. ফারুক (২৩) জানান, তাদের বাড়ি মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের কমলনগর এলাকায়। গত ২৫ জানুয়ারি চার বন্ধু মিলে কক্সবাজার বেড়াতে যান। তার সঙ্গে ছিলেন জিলকদ, শরীফুল ইসলাম ও আলী হোসেন। আগুনে জিলকদ বেশি পুড়লেও বাকিরা রক্ষা পেয়েছেন।

ফারুক বলেন, ‘আমি পেছনের দিকে ডি-৩ সিটে ছিলাম। ঘুমাইয়া ছিলাম। চোখ মেলে দেখি আগুন আর আগুন। বাসটা একখানে থামানো। হুরাহুরি করে সবাই নামতাছে। আমি পেছনের জানালা দিয়া নামি।’ বাসে ৩৬ জন যাত্রী ছিল বলে তিনি জানান।

ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অপর দগ্ধ ব্যক্তি হলেন- ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার চর ব্রক্ষণপাড়ার কৃষক মো. আরিফ (৩২)। তার শরীরের ১০ শতাংশ পুড়েছে।

প্রসঙ্গত, গত সোমবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে কক্সবাজার থেকে ঢাকা অভীমুখী আইকন পরিবহনের বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় সাতজন নিহত ও অন্তত ১০ জন দগ্ধ হয়েছেন।

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP