বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» জাতীয় »কী করে সইব এত শোক
কী করে সইব এত শোক

Tuesday, 20 March, 2018 10:01am  
A-
A+
কী করে সইব এত শোক
বাংলাদেশ টাইম : বেড়াতে গিয়ে প্রিয়জন ফিরেছেন লাশ হয়ে। কাঠমান্ডু দুর্ঘটনায় নিহত প্রকৌশলী রকিবুলের মরদেহ গ্রহণ করতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা। অশ্রু নিবারণের বৃথা চেষ্টা করছিলেন মামাও তখন- মাহবুব হোসেন নবীন

নজরুল ইসলাম ছিলেন বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার। তার স্ত্রী আখতারা বেগম কলেজশিক্ষক। সংসার, চাকরি আর দুই সন্তানকে মানুষ করার তাড়না থেকে কখনও স্ত্রীকে নিয়ে দূরে কোথাও বেড়াতে যাননি নজরুল ইসলাম। সম্প্রতি দু'জন অবসর জীবন শুরু করেন। অবসরের পর নেপালে বেড়াতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তারা। তবে অবসরের জীবন উপভোগের আগে জীবন থেকেই 'অবসর' নিলেন তারা। গতকাল সোমবার আর্মি স্টেডিয়ামে আখতারার লাশ নিতে যান তার দুই মেয়ে নাজনিন আক্তার ও নার্গিস আক্তার কনক। এখনও শনাক্ত না হওয়ায় তাদের বাবার মরদেহ ফেরেনি। 


শোকে পাথর হয়েই মায়ের মরদেহ নিতে এসে তারা বসে ছিলেন কফিনের অপেক্ষায়। যখন লাশবাহী কফিন এক এক করে আর্মি স্টেডিয়ামে আনা হলো তখন হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন দুই বোন। শেষ পর্যন্ত সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে যখন নাজনিন ও নার্গিস মায়ের লাশ বুঝে পেলেন, তখন তারা একে অন্যের গলা জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। কে কাকে সান্ত্বনা দেবেন! 


১৮ মার্চ দেশে ফেরার কথা ছিল নজরুল ও তার স্ত্রী আখতারার। হয়তো জীবনে প্রথমবার বিদেশ ঘুরে তারা দুই কন্যার জন্য নিয়ে আসতেন অনেক 'উপহার'। আখতারা ঠিকই ফিরলেন, তবে কফিনবাহী নিথর দেহ হয়ে। আখতারার দুই মেয়ে মায়ের কফিন নিয়ে যখন আর্মি স্টেডিয়াম থেকে ফিরছিলেন তখন তাদের হাতে পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর উপহার- মায়ের মৃত্যুসনদ ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স! 


চৈত্রের বিকেলে যখন একে একে নেপালে ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় নিহত ২৩ বাংলাদেশি মরদেহ স্বজনদের বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছিল তখন আহাজারি আর কান্নায় আর্মি স্টেডিয়ামে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। আর্মি স্টেডিয়ামজুড়ে শোক আর আর্তনাদের ছবি। নিহত ২৩ পরিবারের কেউ কাউকে না চিনলেও তারা যেন কত আপন! একে অন্যকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। বিমান দুর্ঘটনায় বেঁচে গিয়েছিলেন গাজীপুরের বাসিন্দা মেহেদী হাসান। তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় চিকিৎসকের অনুমতি নিয়ে গতকাল হাজির হন আর্মি স্টেডিয়ামে। সহযাত্রীদের জানাজায় অংশগ্রহণের পরই আবার হাসপাতালে ফিরে যান মেহেদী। 


গত ১২ মার্চ ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় নিহত ২৬ বাংলাদেশির মধ্যে পরিচয় শনাক্ত হওয়া ২৩ জনের মরদেহ সোমবার বিকেল ৪টার দিকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমানবাহিনীর বিশেষ বিমানে আনা হয়। বিমানবন্দর থেকে মরদেহবাহী কফিনগুলো অ্যাম্বুলেন্সে করে আর্মি স্টেডিয়ামে নেওয়া হয়। 


বিকেল ৫টা ৮ মিনিটে মরদেহগুলো আর্মি স্টেডিয়ামে পৌঁছায়। সেনাসদস্যরা কাঁধে করে লাশবাহী গাড়ি থেকে মরদেহ স্টেডিয়ামের ভেতরে স্থাপন করা অস্থায়ী মঞ্চে নিয়ে রাখেন। ৫টা ২৫ মিনিটে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা পরিচালনা করেন ক্যান্টনমেন্ট মসজিদের ইমাম মাহমুদুল হাসান। জানাজায় তিন বাহিনীর প্রধানরা ছাড়াও মন্ত্রী, সচিব, সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, স্বজনসহ সাধারণ মানুষ অংশ নেন।


রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের পক্ষে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল সরোয়ার হোসেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সংসদ সদস্যদের পক্ষে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, তিন বাহিনীর প্রধানরা, বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দ, বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল। জানাজা ও শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে মরদেহ স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ৩০ মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন হয় ওই প্রক্রিয়া। 


কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের নিহত পাইলট আবিদ সুলতানের লাশ গ্রহণ করেন তার বড় ভাই খুরশীদ মাহমুদ। তিনি জানান, পরিবারের সবার সম্মতিতে তার ভাইয়ের মরদেহ বনানী সামরিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। আবিদের স্ত্রী আফসানা খানম স্ট্রোক করার পর এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। 


ইউএস-বাংলার কো-পাইলট পৃথুলা রশীদের মরদেহ নিতে যান তার বাবা আনিছুর রশীদ, মা রাফেজা বেগম, খালা ফিরোজা আক্তারসহ ৭-৮ স্বজন। স্বজনদের মধ্যে সবার আগে আর্মি স্টেডিয়ামে যান পৃথুলার স্বজনরা। কার্পেট পেরিয়ে যখন পৃথুলার মাকে বসার আসনের দিকে নেওয়া হচ্ছিল তখন মনে হচ্ছিল তিনি প্রায় অচেতন। দু'চোখের পাতা গভীর ভেজা। আসনে বসার পর হঠাৎ নীরবতা ভেঙে বিলাপ করে উঠছিলেন তিনি। তাকে হাত বুলিয়ে মনে পাথরচাপা কষ্টে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন পৃথুলার বাবা আনিছুর। কোনো সান্ত্বনা তার প্রবোধ মানছিল না। পৃথুলা রশীদের মার হাতে তখনও তসবিহ। তিনি বলছিলেন, 'মেয়ের জন্য দোয়া করবেন। এভাবে চলে যাওয়া মেনে নেওয়া যায় না। যারা নিহত হয়েছেন সবার জন্য দোয়া করবেন।' 


ইউএস-বাংলার ফ্লাইটের কেবিন ক্রু খাজা হোসাইন মোহাম্মদ শাফির লাশ গ্রহণ করতে যান তার বাবা কেজিএম সাইফুল্লাহ, মা খাজা দারাখশান সাইফুল্লাহ ও স্ত্রী সাদিয়া রহমান। তারা জানান, পুরান ঢাকার নবাবপুরে পারিবারিক কবরস্থানে খাজা হোসাইনের লাশ দাফন করা হবে। শাফির মা বললেন, কোনো কাজই ছোট নয়। এরপরও শাফিকে বলতাম কেন এত লেখাপড়া করে তোমাকে বিমানের ক্রু হতে হবে। তুমি নবাব বংশের ছেলে। এই পেশা ছাড়ার কথা বলছিলাম। তবে সে কখনও রাজি হয়নি। দুর্ঘটনার আগের দিন শাফি তার বাবার জন্মদিন ঘিরে সকলকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে খাইয়েছে। তার পরের দিনই এত বড় দুর্ঘটনা! দুর্ঘটনার খবর শোনার পরপরই আমেরিকায় থাকা শাফির নানা মারা যান। এর আগেও একবার ইউএস-বাংলার ফ্লাইটে দুর্ঘটনা শিকার হতে হতে বেঁচে যায় ছেলে। সেই গল্প বাসায় এসে শোনানোর পর সবাই তাকে চাকরি ছাড়ার চাপ দিলেও সে কথা রাখেনি। 


কেবিন ক্রু নাবিলার মরদেহ নিতে যান তার স্বামী ইমাম হাসান ও অন্য স্বজনরা। স্ত্রীর কফিনের পাশে বসে ছিলেন ইমাম। তখন তার কোলে তাদের আড়াই বছরের একমাত্র মেয়ে ইনারা ইমাম হিয়া। মাতৃ-বিয়োগের ব্যথা বোঝার বয়সও এখনও হয়নি হিয়ার। 


সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার রকিবুল হাসানের মা সেলিনা পারভীন ছেলের লাশ নিতে গিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। তখন তার স্বজনরা তার মাথায় পানি দিচ্ছিলেন। রকিবুলের স্ত্রী রুয়েটের শিক্ষক। তিনি বিমান দুর্ঘটনায় আহত হয়ে এখন সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন। 


মরদেহ নিতে এসেছিলেন নিহত এস এম মাহমুদুর রহমানের স্ত্রী সানজিদা আফরিন। তিনি জানান, তার স্বামীর লাশ ফরিদপুর নিয়ে যাবেন। সাংবাদিক আহমেদ ফয়সালের পক্ষে তার মামা ও বৈশাখী টেলিভিশনের বার্তাপ্রধান অশোক চৌধুরী মরদেহ গ্রহণ করেন।


এর আগে গতকাল সোমবার সকালে নেপালে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাছে ২৩ বাংলাদেশির মরদেহ হস্তান্তর করে নেপাল কর্তৃপক্ষ। এরপর দূতাবাসের আঙিনায় লাশের কফিনগুলো রাখা হয়। সেখানে প্রথম দফায় জানাজা শেষে নিহতদের নাম লেখা কফিনের পাশে স্বজনরা কিছুক্ষণ থাকার সুযোগ পান। 


ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের ঘটনায় যে ২৩ জনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে তারা হলেন-বেগম হুরুন নাহার বিলকিস বানু, এস এম মাহমুদুর রহমান, ফয়সাল আহমেদ, বিলকিস আরা মিতু, নাজিয়া আফরিন চৌধুরী, আখতারা বেগম, মো. রকিবুল হাসান, মো. রফিকুজ্জামান, সানজিদা হক, অনিরুদ্ধ জামান, মো. হাসান ইমাম, তামারা প্রিয়ণ্ময়ী, তাহিরা তানভীন শশী রেজা, ফ্লাইটের পাইলট আবিদ সুলতান, কো-পাইলট পৃথুলা রশীদ ও মিনহাজ বিন নাসির, আঁখি মনি, এফ এইচ প্রিয়ক, শারমীন আক্তার নাবিলা, উম্মে সালমা, মো. মতিউর রহমান, খাজা হোসাইন ও মো. নুরুজ্জামান। নিহত ২৬ বাংলাদেশির মধ্যে ৩ জনের মরদেহ শনাক্ত করা যায়নি। তারা হলেন- আলিফউজ্জামান, পিয়াস রায় ও মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। 


হতাহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গণভবনে সাক্ষাৎ করবেন প্রধানমন্ত্রী :পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ শেষে সোমবার আর্মি স্টেডিয়ামে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, হতাহতদের পরিবারের সঙ্গে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিগগিরই দেখা করবেন। যার যা প্রয়োজন, তাই দিয়ে সহায়তা করা হবে।' সেতুমন্ত্রী আরও বলেন, শিগগিরই বাকি তিনজনের লাশ নিয়ে আসা হবে। তাদের ব্যাপারটা একটু সময়সাপেক্ষ।' 


স্বজনরাও দেশে ফিরেছেন : ইউএস-বাংলার মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম জানান, নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় হতাহতদের স্বজনদের নিয়ে ইউএস-বাংলার একটি বিশেষ ফ্লাইট দুপুর ২টা ৫৫ মিনিটে ঢাকায় এসে পৌঁছে। এই ফ্লাইটে নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে নেপালে আহত চিকিৎসাধীন কবির হোসেন দেশে ফিরেছেন। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। 


গত ১২ মার্চ ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি বিমান কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণের সময় বিধ্বস্ত হয়। এ ঘটনায় ৪৯ আরোহীর মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে চার পাইলট-ক্রুসহ ২৬ জন বাংলাদেশি। এ ঘটনায় আহত ১০ বাংলাদেশির মধ্যে ৬ জন দেশে ফিরেছেন। তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন। তারা হলেন- শাহরিন আহমেদ মুমু, মেহেদী হাসান, সাঈদা কামরুন্নাহার স্বর্ণা, আলমুন নাহার অ্যানি, রাশেদ রুবায়েত ও শাহিন ব্যাপারী। বাকি চারজন সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপ ও ভারতে চিকিৎসাধীন।

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP