বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» শিল্প-সাহিত্য »‘শক্তিমান বর্তমান’-এর পাণ্ডুলিপির নির্বাচিত অংশ
‘শক্তিমান বর্তমান’-এর পাণ্ডুলিপির নির্বাচিত অংশ

Friday, 6 February, 2015 12:57  
A-
A+
‘শক্তিমান বর্তমান’-এর পাণ্ডুলিপির নির্বাচিত অংশ
বাংলাদেশ টাইমঃ লেখক : একার্ট টোলেই

অনুবাদ : সাফাত হোসেন

সম্পাদনা : ফরহাদ হোসেন মাসুম

যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি বর্তমানে প্রবেশ করতে সক্ষম হচ্ছো না, ততক্ষণ প্রতিটা আবেগীয় দুঃখ তোমার মাঝে একটা ছাপ রেখে যাবে। অতীতের যে কষ্ট আগে থেকেই ছিলো, তার সাথে মিলিত হয়ে এটা তোমার দেহ আর মনে গেঁথে থাকবে। আর এর মাঝে অবশ্যই তোমার শৈশবের কষ্টগুলোও অন্তর্ভুক্ত, যা তোমাকে এই অচেতন পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করার কারণে সইতে হয়েছিল।

এই জড়ো হয়ে থাকা দুঃখগুলো, প্রকৃতপক্ষে তোমার শরীর আর মনে এক ঋণাত্মক শক্তির বলয়। তুমি যদি এটাকে অদৃশ্য একটা আলাদা স্বাধীন সত্তা হিসেবে ভেবে থাকো, তুমি অনেকটা ঠিকই ধরেছো। এটাই হলো আবেগীয় কষ্টসত্তা (Pain Body); এটা দু’ অবস্থায় থাকতে পারে : সুপ্তভাবে অথবা সক্রিয়ভাবে। কষ্টসত্তা হয়তো শতকরা ৯০ ভাগ সময়েই সুপ্ত থাকে। তবে গভীরভাবে অসুখী কোনো মানুষের ক্ষেত্রে এটা হয়তো শতকরা শতভাগ ক্ষেত্রেই সক্রিয় থাকতে পারে। কিছু মানুষ পুরোপুরিভাবে তাদের কষ্টসত্তার মাধ্যমেই বেঁচে থাকে। অন্যরা হয়তো কিছু বিশেষ মুহূর্তে এটাকে অনুভব করে, হয়তো একটা অন্তরঙ্গ সম্পর্কে, অথবা অতীতের দুঃখের স্মৃতির সাথে সম্পর্কিত কোনো পরিস্থিতিতে, অথবা শারীরিক বা আবেগীয় কষ্টের সময়ে। যে কোনো কিছুই এটাকে সক্রিয় করে দিতে পারে, বিশেষত যদি তা তোমার কোনো অতীত দুঃখের সাথে সম্পর্কিত হয়। যখন এটা সুপ্ত অবস্থা থেকে জেগে উঠতে প্রস্তুত, সাধারণ চিন্তা বা আপন কারো কাছ থেকে আসা একটা নিরীহ মন্তব্যও এটাকে জাগিয়ে তুলতে পারে।

কিছু কষ্টসত্তা জঘন্য হলেও তুলনামূলকভাবে নিরীহ, যেমন একটা শিশুর অবিরত কান্না। কিছু আবার ভয়ংকর, ধ্বংসাত্মক দানব, সাক্ষাৎ শয়তান। কিছু শারীরিকভাবে হিংস্র। অনেক কষ্টসত্তা আছে যারা আবেগীয়ভাবে হিংস্র। এদের কেউ তোমার চারপাশের বা কাছের মানুষদের আক্রমণ করবে, আর কেউ হয়তো তাদের আশ্রয়দাতা হিসেবে তোমাকেই আক্রমণ করবে। তোমার জীবনকে নিয়ে তোমার চিন্তা এবং আবেগ তখন অশুভ রূপ ধারণ করবে। প্রায়শই এভাবে অসুস্থতা আর দুর্ঘটনা সৃষ্টি হয়। কোনো কোনো কষ্টসত্তা তাদের আশ্রয়দাতাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করে।

তুমি হয়তো ভেবেছিলে, একজন মানুষকে ভালভাবে চেনো। তারপর যখন হঠাৎ একদিন তার ভেতর থেকে একটি অচেনা কুৎসিত প্রাণীকে বের হয়ে আসতে দেখলে, সেটা তোমাকে হতবাক করে দিয়েছিলো। তবে, এটা অন্য কারো ভেতরে দেখার চেয়ে আগে তোমার নিজের ভেতরে দেখা উচিৎ। যতটা সূক্ষ্মভাবেই থাকুক না কেন, তোমার ভেতরের অসুখী ভাবকে ঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করো। এটা হয়তো তোমার কষ্টসত্তাকে জাগিয়ে তুলছে। হতে পারে এটা কোনো বিরক্তি, ধৈর্যহীনতা, বিষণ্ণতা, কাউকে আক্রমণ করার ইচ্ছা, ক্রোধ, হতাশা, তোমাকে ঘিরে নাটক সৃষ্টি করার ইচ্ছা। এটা যখন জেগে উঠতে শুরু করে ঠিক তখনই এটাকে ধরে ফেলো। অন্য সব সত্তার মত কষ্টসত্তাও নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চায়। এটা শুধু তখনই নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারবে, যখন তুমি নিজের অচেতনভাবেই এর সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যাও। তখন এটা জেগে উঠে তোমার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে 'তুমি' হয়ে উঠবে, তোমার মাঝে বেঁচে থাকবে। ওর সুবিধা হয়, এমন যে কোনো অভিজ্ঞতা থেকে, যা তোমার মাঝে আরো বেশি দুঃখ সৃষ্টি করে সেগুলো থেকে সে নিজের শক্তি আহরণ করবে; যেমন- রাগ, ঘৃণা, আফসোস, ধ্বংসপ্রবণতা, আবেগীয় নাটুকেপনা, এমনকি অসুস্থতাও। তাই যে কষ্টসত্তা তোমার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে, সেটা তোমার জীবনে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে, যা তাকে টিকে থাকতে সহায়তা করে। কেবল দুঃখই দুঃখকে বাড়ায়, দুঃখ আনন্দের কাছ থেকে শক্তি নিতে পারে না। এটা আনন্দকে একবারেই হজম করতে পারে না।

একবার যখন কষ্টসত্তা তোমার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে, তুমি আরও বেশী করে দুঃখ চাইবে। তুমি তখন একজন ভুক্তভোগী (victim) অথবা অপরাধীতে পরিণত হও। তুমি কষ্ট দিতে অথবা কষ্ট পেতে চাও, অথবা দুটোই। এই দুইয়ের মাঝে আসলে তেমন ফারাক নেই। আর এটা ঘটে তোমার অজান্তেই। তুমি অনেক আবেগ দিয়ে বলবে যে, তুমি দুঃখ চাও না। কিন্তু ভালোমত খেয়াল করলে বুঝতে পারবে, তোমার চিন্তা আর ব্যবহার এমনভাবে পরিকল্পিত যাতে সেটা কষ্টসত্তাকে জিইয়ে রাখতে সাহায্য করে; শুধু তোমার নিজেরটা নয়, তোমার আশপাশের মানুষদেরটাও। তুমি যদি সত্যিই এটা সম্পর্কে সচেতন হও, তাহলে এই ধারাটা মিলিয়ে যাবে। কারণ আরও বেশি দুঃখ চাওয়া হলো এক ধরনের উন্মাদনা, আর কেউই সচেতন অবস্থায় উন্মাদ হতে পারে না।

কষ্টসত্তা হলো অহং বা ইগোর তৈরি অন্ধকার ছায়া, যা আসলে তোমার চেতনার ভয়ে ভীত। এটা সবসময় ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে তটস্থ থাকে। এর টিকে থাকা নির্ভর করে তোমার নিজের অজান্তে এর সাথে সম্পৃক্ততার উপর, আর তার সাথে তোমার ভেতরের দুঃখের মুখোমুখি হবার অচেতন ভয়ের উপর। কিন্তু যদি তুমি এর মুখোমুখি হয়ে একে সচেতনতার আলোয় নিয়ে না আসো, তুমি পরে কোনো একসময় এই যাতনা আবার সহ্য করতে বাধ্য হবে। কষ্টসত্তাকে তোমার কাছে মনে হতে পারে এক ভয়ংকর দানব, কিন্তু আমি তোমাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে এটা আসলে একটা কাগুজে বাঘ, যা তোমার উপস্থিতি সহ্য করতে পারবে না।

কিছু আধ্যাত্মিক দর্শন বলে যে, সব দুঃখই আসলে সত্যিকার অর্থে একটা ভ্রম এবং কথাটা সত্যি। তবে প্রশ্ন হলো, এটা কি তোমার জন্য সত্যি? শুধু বিশ্বাস করলেই তো আর এটা তোমার জন্য সত্যি হয়ে যাবে না। তুমি কি তোমার বাকি জীবনভর দুঃখভোগ করতে থাকবে আর বলতে থাকবে যে দুঃখ আসলে শুধুই একটা ভ্রম? এভাবে কি কখনো তোমার দুঃখমুক্তি হবে? আমরা চাই তুমি সত্যিটা উপলব্ধি করো- এটাকে তোমার বাস্তব অভিজ্ঞতায় পরিণত করো।

তোমার কষ্টসত্তা চায় না যে তুমি এর আসল চেহারা দেখে ফেলো। যে মুহূর্তে তুমি একে পর্যবেক্ষণ করবে, নিজের ভেতরে এর উপস্থিতিকে অনুভব করে ওর দিকে নিজের মনোযোগকে কেন্দ্রীভূত করবে, সে মুহূর্তেই কষ্টসত্তার সাথে তোমার সম্পৃক্ততা ছিন্ন হবে। তোমার মাঝে চেতনার এক উঁচু মাত্রার আগমন ঘটবে। আমি এটাকে বলি সচেতন উপস্থিতি (Presence)। তুমি এখন তোমার কষ্টসত্তার দর্শক বা পর্যবেক্ষক। এর মানে হলো, এটা আর “তুমি” হবার ভান করে তোমাকে ধোঁকা দিতে পারবে না। তোমাকে ব্যবহার করে নিজেকে পুনরায় শক্তিশালীও করতে পারবে না। তুমি তোমার সবচেয়ে ভেতরের শক্তিকে খুঁজে পেয়েছো। তুমি প্রবেশ করেছো, শক্তিমান বর্তমানে।

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP