বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» শিল্প-সাহিত্য »ঘর পালানো প্রিয় কবি
ঘর পালানো প্রিয় কবি

Friday, 27 April, 2018 03:07pm  
A-
A+
ঘর পালানো প্রিয় কবি
 ফারুক আলমগীর : বলা হয়, তিনি ছিলেন আজন্ম বোহেমিয়ান, যে ধারণার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত নই, যদিও আমরা জেনেছি বেলাল চৌধুরী নামের একজন উড়নচণ্ডী লোক কলকাতায় পালিয়ে গেছেন, যিনি নাকি জাহাজের খালাসির কাজ থেকে কুমিরের চামড়া বিক্রির ব্যবসা পর্যন্ত করেছেন। একজন কবি ও সাংবাদিকরূপে কলকাতায় খুব নামডাক হয়েছে এবং কলকাতার খ্যাতিমান কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের খুব কাছাকাছি একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। 

কবি বেলাল চৌধুরী সম্পর্কে নানা বিস্ময়কর গালগল্পে মধ্য ষাট থেকে মধুর ক্যান্টিনের আড্ডায় আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। বিশেষ করে তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা গিয়াস কামাল চৌধুরী যিনি আমাদের দু'বছরের সিনিয়র ছাত্র ছিলেন এবং একজন বামপন্থি ছাত্র সংগঠনের নেতারূপে তখন যশস্বী ছিলেন, তিনিই আমাদের কাছে বড় ভাই-এর নানা ধরনের এসব গল্প বলে কবি হওয়ার বাসনায় পাওয়া আমাদের স্বপ্নচারী মনকে দোলায়িত করেছিলেন।



২. আসলে বেলাল চৌধুরী ছিলেন একজন ঘর পালানো মানুষ। কৈশোরে দু'বার পালিয়েছিলেন, যৌবনে দু'বার। তবে যৌবনে পালিয়ে যাওয়াটা ছিল অনেকটা রাজনৈতিক, যা তিনি নিজেই বলেছেন, 'এক সময় পাকিস্তানিদের যথেচ্ছাচারের প্রতিবাদে দেশ ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতে হলো।' সর্বশেষ কলকাতায় পালানো বেলাল চৌধুরী ছিলেন আপাদমস্তক একজন যৌবন মদে মত্ত পুরুষ। ক্লেশ-কষ্ট তখন তাকে স্পর্শ করছে না, তিনি মানিয়ে নিতে পারছেন সবকিছুর সঙ্গে। বস্তির বাঁশ-বেতের চালাঘরে একজন কমিউনিস্ট কর্মীর সঙ্গে মাটিতে শুয়ে রাত কাটিয়েছেন, তেমনি প্রগতিশীল নাট্যজন উৎপল দত্তের মতো মানুষের কাছ থেকে পেয়েছেন সহযোগিতার হাত। এমনও সময় গেছে তার নকশালবাড়ির শিহরণ জাগানো মানুষদের সঙ্গেও যোগাযোগ হয়েছিল। আবার কলকাতার কফি-হাউসের আড্ডার তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে তার নিবিড় সখ্য গড়ে উঠেছিল। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়ার কবিতা কেন্দ্র থেকে ফেরেননি। তিনি যখন ফিরলেন কফি-হাউসের তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের উদ্যোগে মহাজাতি সদনের পেছনে সার্কাস-স্কোয়ারে বসেছিল 'বঙ্গসংস্কৃতির আসর।' একটা বিশাল মেলা, যার মধ্যে ছিল লিটল-ম্যাগ থেকে বইপত্রের স্টল আর গান-বাজনা নৃত্যসহ বিচিত্রানুষ্ঠানের আয়োজন। এই অনুষ্ঠানে লেখালেখি থেকে শুরু করে, প্রুফ দেখা, মেকআপ সেরে মেলায় প্রতিদিন ছাপার কাজের দায়িত্ব পেয়ে বেলাল চৌধুরী সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। একটি আট পাতার কবিতা-দৈনিক বের করা ছিল তার কাজ। আর এই সময়ে মার্কিনফেরত কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ছোটবেলার দারিদ্র্য আর জীবনসংগ্রামের এক মর্মস্পর্শী বক্তৃতা শুনে তার চোখে জল এসে গিয়েছিল। অগ্রজ-কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে তার সখ্য এখান থেকেই, যা পরবর্তীকালে ডালপালা ছড়িয়ে এতটাই পল্লবিত হয়ে গিয়েছিল যে, কবি বেলাল চৌধুরীকে 'কৃত্তিবাস'-এর সম্পাদনায়ও নিয়োজিত করেছিলেন।

১৯৭৪ সালে বেলাল চৌধুরী যখন ঢাকা ফিরে আসেন, তাদের সখ্যতা যেন আরও দৃঢ়তর হয়। ঢাকায় এলে কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অনুজ বেলাল চৌধুরী খোঁজ করতেন প্রথমেই কিংবা বেলাল চৌধুরীই ঢাকায় তাকে স্বাগত জানাতেন প্রথমেই।

৩.

কবি বেলাল চৌধুরীর প্রথম সাক্ষাৎ আমি কবে কখন পেয়েছিলাম মনে নেই। তবে এই অগ্রজপ্রতিম মানুষটি আমার বহুকাল নিশ্চুপ থাকার পরে আশির দশকের প্রথমার্ধে একটি কবিতাগ্রন্থ প্রকাশ পেলে ভূমিকা লেখা থেকে শুরু করে প্রকাশনা অনুষ্ঠান পর্যন্ত সাহায্য করেন। আমাকে তার কবিতা সংগঠন 'পদাবলী'র সদস্য করে নেন এবং আমিও 'পদাবলী'র একাধিক কবিতা-পাঠ আয়োজনে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। পদাবলীর সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে আশির দশকে আমার সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে নানা-বিপত্তি সৃষ্টি হলেও আমি পদাবলী তথা কবি বেলাল চৌধুরী সঙ্গ ছাড়িনি।

মধ্য আশিতে 'সচিত্র সন্ধানী', তারপর 'ভারত বিচিত্রা' যেখানেই বেলাল চৌধুরী গেছেন সেখানে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। যতদিন দাঁড়িয়ে ছিলেন, প্রাণশক্তি পেয়েছে কবি বেলাল চৌধুরীর কাছ থেকে প্রতি বছর নিয়ত জাতীয় কবিতা-উৎসব।

'জাগরণ ও কালঘুম, এর মাঝেই যা কিছু লেখালেখি। কোনো কোনো দিন এমনও হয় জেগে উঠে দেখি : বাঃ কি সুন্দর সব কিছু, আশপাশ- সব মানুষ চেনা-অচেনা, কাছের দূরের, সব পশু-পাখি, পোকা-মাকড়, গাছ-গাছালি, শস্যক্ষেত, খাল-বিল, নদী-নালা, ধর্ম-অধর্ম, পাপ-তাপ, শত্রুমিত্র, বন্ধু-বান্ধব, স্বজন-পরিজন, পৃথিবীর তাবৎ নারীরা অর্থাৎ গোট ভূমণ্ডলের সবকিছুই। আবার কখনও 'অদ্ভুত আঁধার এক।' আসলে 'অদ্ভুত আঁধার এক' নেমে এসেছে আপনার নির্গমনের সঙ্গে। অনেক অগ্রজ চলে গেলেন, চলে গেল আমার অনেক কবিতা সহযাত্রী, সমসাময়িক সুহৃদ-স্বজন। একে একে নিভেছে দেউটি। আপনিই ছিলেন আমাদের শেষ বাতিঘর! কী করে ভুলি আপনার উজ্জ্বল উপস্থিতি- কবি বেলাল চৌধুরী!

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP