বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» শিল্প-সাহিত্য »বুড়োবুড়ির নিজের মতো করে বাঁচা
বুড়োবুড়ির নিজের মতো করে বাঁচা

Friday, 13 April, 2018 04:02pm  
A-
A+
বুড়োবুড়ির নিজের মতো করে বাঁচা
সালেহা চৌধুরীঃ ব্রিটেনে বৃদ্ধাদের নিয়ে কাজ করেন আমার মেয়ে। শনিবার কয়েক ঘণ্টা। ওদের সঙ্গে একটু কথা বলা, ওষুধ খাওয়ানো, দেখে আসা কেমন আছে, কারও একটি জামা পরাতে সাহায্য করা, কারও জন্য বাজার করা, এমনি বিবিধ কাজ। একটি গ্রামার স্কুলের অ্যাকাউন্টের কাজের পরে এ কাজটি ওর পছন্দ। বলে- হৃদয়ের কারণে। সোস্যাল সার্ভিস ওকে বেতন দেয় এসবের জন্য। নানা সব অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে। বলে- ১০৩ বছরের রোজালিনকে দেখলে মায়া লাগে। ছেলে বিরাট বড় অফস্টেট বা সরকারি ইন্সপেক্টর। মাকে রেখে দিয়েছে একা বাড়িতে। সকালবেলা উঠে রোজা লিপস্টিক লাগিয়ে, টেলিভিশন দেখে, টেলিভিশনের সঙ্গে কথা বলে সময় কাটায় ও। চারটি নাতি-নাতনিসহ তার অফস্টেট ইন্সপেক্টর ছেলে বড় এক বাড়িতে বাস করেন। কালেভদ্রে মায়ের সঙ্গে দেখা করে। তার নাতি-নাতনি আরও কালেভদ্রে। আমি রাতে ওর মাথার কাছে এক গ্লাস পানি রেখে, একটু 'টাকইন' করে চলে আসি। আমি যখন আসার আগে আলো বন্ধ করছি, ও বলে- তুমি জানো এই পৃথিবীতে সবচেয়ে কষ্টকর ব্যাপার কী? আমার মেয়ে বলে- কী রোজা?

- ওয়েটিং টু ডাই। মৃত্যুর অপেক্ষা। 

আমার মেয়ে বেশ একটু মন খারাপ করে চলে আসে। বলি- তুমি রোজালিনকে একটু আদর-টাদর করলে না! না বলে আমার মেয়ে। আমার যদিও খুব ইচ্ছা করছিল, খুব বড় করে ওকে একটু হাগ করি; কিন্তু করতে পারিনি। কারণ আমাদের বলা হয়েছে, এসব আদর আতিশয্য কখনও না দেখাতে। আমার চাকরির যেটুকু শর্ত তার বাইরে আর কিছু না করতে। তুমি তো একটা রোবট বা মেশিন না? বলি আমি। আমি জানি। কিন্তু হাগ করতে গিয়ে ওদের যদি একটু আঘাত লাগে, যদি ওদের হার্ট অ্যাটাক হয়, তাহলে? 

রোজালিন একটু ভালো অবস্থায় আছে। ও এখনও হোমে যায়নি। অর্থাৎ স্মৃতিবিজড়িত বাড়িতেই ও বাস করছে। কিন্তু ওর বয়সের বেশিরভাগ যায় হোমে। অর্থাৎ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। যেখানে কেয়ারার বা পরিচর্চার লোক থাকে, ঘড়ি ধরে খাওয়া, ঘড়ি ধরে টেলিভিশন দেখা, কখনও সমবেতভাবে একটু সাগরের কাছে যাওয়া, ঘড়ি ধরে জেগে উঠে সকালের খাওয়া শেষ করা। যেখানে আমার মেয়ের মতোই রোবটের কাজ করে কেয়ারার। হিউম্যান টাচ থাকে না। কেউ ছোঁয় না, ভালোবাসার স্পর্শ রাখে না। এমন প্রতিষ্ঠানকে বলা যায় 'বৃদ্ধ-বৃদ্ধার গোশালা বা জেলখানা'। সংক্ষেপে 'হোম'। এ ছাড়া উপায়ই-বা কী? নিজের হোমে জায়গা নেই। সরকারি-বেসরকারি 'হোম'। একদিন তোমাদের যৌবন ছিল। এখন আমাদের যৌবনকাল। তুমি ভারবোঝা বা সিন্দাবাদের মতো কাঁধে চেপে থাকবে, তা কি হয়? এখানে যারা থাকেন, মোটামুটি নিজেদের ঘরে থাকেন এবং সমবেতভাবে যা করার করেন। এখানে জন্মদিনে মোম জ্বলে, যান্ত্রিকভাবে একটি কেক কাটা হয়, হ্যাপি বার্থডে গান গাওয়া হয়। আর সকলে এক টুকরো কেক পায়। সময় ফুরিয়ে যায়। অবস্থাবিশেষে এসব হোমের চেহারা বদলায়। বৃদ্ধ-বৃদ্ধার সরকারি পেনশন, তার অন্যান্য সঞ্চয় দেখে কর্তৃপক্ষ তাদের জন্য হোম ঠিক করেন। তবে এসবে সরকার সাহায্য করে কখনও কখনও বাড়তি খরচের জন্য। যাকে ইংরেজিতে বলা হয় 'টপআপ'। না হলে অনেকের নিজের খরচে থাকা অসম্ভব। অনেকের নিজের বাড়ি বিক্রি করে টাকা মেটাতে হয়। 

অনেক হোমে বুড়োবুড়িদের নিয়ে ব্যবসা হয়। সাউদার্নক্রসের তত্ত্বাবধানে ব্রিটেনে ১৫০টি হোম আছে। ২০১৪ সালে তারা হোম চালিয়ে দুই পয়েন্ট তিন মিলিয়ন পাউন্ড লাভ করে। এখানে যে ২৬ জন বুড়োবুড়ি ছিলেন, শোনা যায় তারা একটি পরিবারের মতো। একজন আরেকজনের সঙ্গে বেশ একটু সখ্য, ভব্যতায় একটি পরিবারের মতো বাস করছিলেন। কিন্তু কোনো কারণে দেখা গেল, এই ডালমেয়ার হোমে আশানুরূপ লাভ হচ্ছে না। খালি গরু খড়-বিচালি খেয়েই চলেছে, ঠিকমতো দুধ তো আর দেয় না। তারা সরকারের কাছে আবেদন করে, 'টপআপ' বাড়াতে বা আরও একটু পয়সা মাথাপিছু দিতে। সরকার রাজি হয় না। তাদের বড় বড় মহতী কাজ আছে, যেমন- রয়ালদের পালা, কামিলার বাড়তি খরচ, আমাদের বাড়ির সামনে আর একটি বিন রেখে বলা, যেগুলো রিসাইকেল করা যায় সেগুলো এখানে ফেলা, গাছ লাগানো, পার্ক পরিস্কার, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি- এমনি শত শত কাজ। তারা কেন ডালমেয়ার হাউসের ২৬ জন মৃত্যুর অপেক্ষায় বেঁচে থাকা বুড়োবুড়ির পেছনে পয়সা ঢালবে! সাউদার্নক্রস বলল- তারাও একে খোলা রাখতে পারবে না। কারণ এখানে কেবল লোকসান, লাভ নেই। সকলে বলে, ডালমেয়ার হোমে নাকি ব্যতিক্রমের মতো একটি চমৎকার সৌহার্দ্যের হাওয়া বইত। অনেকটা একই বাড়ির সদস্যের মতো একজন আরেকজনকে নিয়ে বেঁচে ছিল। ডালমেয়ার পরিচালক ও সরকারের এসব ভাবার সময় কোথায়? হৃদয় দেখাতে গেলে ব্যবসা হয় না। মাথা খাটিয়ে তারা ঠিক করল, এই হোমটি বন্ধ করে দিলে তারা এই ক্ষতি থেকে বাঁচতে পারে। তাহলে এই ২৬ জন বুড়োবুড়ি যায় কোথায়? ডালমেয়ারকে বন্ধ করে ওদের বিভিন্ন হোমে চালান করা হলো। এক্সিমোদের চেয়ে ভালো। শুনেছি এক্সিমোরা বুড়ো মা-বাবাকে নেকড়ে দিয়ে খাওয়ায়। যাই হোক, এই ২৬ জন বুড়োবুড়ি ২৬টি হোমে চলে গেল। একটি পরিবার ভেঙে গেল। একটি পারিবারিক সৌহার্দ্যের হাওয়া চলে গেল, একটি পরিবার হয়ে উঠবার আনন্দ বাতাসে বিলীন হলো। ফলে হেলেন নামের ৭৪ বছরের বৃদ্ধা সেই যে কথা বন্ধ করলেন, তারপর একেবারে মরে গিয়ে করলেন প্রতিবাদ। নতুন হোমের এক্সট্রা বেডে মুখ ভার করে রইলেন। মরার আগে মাথার কাছে যে সুইচটি ছিল তা টিপেও তিনি শেষ প্রার্থনা জানাননি, কারও কাছে কিছু চাননি। অভিমান? ইংরেজিতে অভিমানের প্রতিশব্দ নেই। তাহলে বোধ হয় নির্বাক অনশন! আমৃত্যু। এরপর মারা গেলেন অন্য হোমে চালান করা আরও চারজন দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে। কারণ ওদের মুখে কথা ছিল না, পেটে ক্ষুধা ছিল না। তারা কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকতেন। সেই ২৬ জনের একসঙ্গে টেলিভিশন দেখা, গল্প করা চলে গেছে। ছেলেমেয়েদের পাঠানো কার্ড-ছবি দেখানো চলে গেল। এখন অনিকেত গবাদিপশুর মতো করুণ দিনকাল। তাদের এই মৃত্যুকে ডাক্তাররা বুকে নল লাগিয়ে বললেন, 'ডাবল নিউমোনিয়া।' অসুখ বের করতে কতক্ষণ? আর বুক ভেঙে যাওয়া বলে কোনো অসুখ এখনও বেরোয়নি। কথা না বলাকে হয়তো নাম দিলেন 'নন ভার্বাল সিনড্রোম'। এদের মধ্যে সবচেয়ে হাসিখুশি ও প্রাণপ্রাচুর্যে পরিপূর্ণ ছিলেন কনি হার্বাট। বয়স ১০২। এমন করে সেজেগুজে, নতুন জামা পরে, গুনগুন করে পায়ে নরম স্যান্ডেল দিয়ে ঘোরেন, ভাবসাব দেখে মনে হয় বয়স আঠারো। তার ঘরটিতে একটি জানালা ছিল, যা দিয়ে কর্নফ্লাওয়ারের মাঠ, দূরের গাছ, পাহাড়ের ধূমল রঙ, ঋতু পরিবর্তন- সবকিছু বড় ভালোভাবে দেখা যেত। যখন এই ঘর থেকে তুলে সাউদার্নক্রস তাকে অন্য আর একটি হোমে বাড়তি বেডে থাকার বন্দোবস্ত করল, তখন তার জীবন থেকে একটি ভালো লাগা ঘরের সঙ্গে চলে গেল একটি ভালো লাগা জানালা। ১০২ বছরের মেয়েটি নতুন বাড়িতে গিয়ে বলেছিলেন- আমাকে কেউ বিরক্ত করবে না। আজ আমি অনেকক্ষণ ঘুমাব। সে ঘুম থেকে ১০২ বছরের কনি আর জীবন ভালোবেসে জেগে ওঠেননি। 

বেঁচে থাক আমাদের দাদি-নানিরা। বেঁচে থাক ভালোবাসায়, যত্নে, সেবায়, মানবিক স্পর্শে, মানবতায়। ভালোবাসার মানুষরা ঘিরে থাক তাদের। তারা এদের মাঝখান থেকে একদিন চলে যাক। আমরা জানি, আমাদের সমাজে অনেক কিছুর পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন প্রয়োজন; কিন্তু যেটুকু ভালো তা হলো, এই আমাদের বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের অবস্থা এত বেশি করুণ নয়। ডালমেয়ার হোমে তিনজন ছিলেন যুদ্ধের সৈনিক। যুদ্ধ যাদের কারণে জিতেছিল সেদিন। এখন তারা হোমের ভারবোঝা। ডালমেয়ার তাদের কোনো সম্মান দেখাননি। বড় বড় কাগজে উঠেছিল 'হ্যান্ডল আওর এলডারস কেয়ারফুলি'। এরপর অনেক কথা। আসলে এসব বুড়োবুড়ি এখন আর মানব নেই, জিনিস হয়ে গেছে। কাজেই জিনিসের তত্ত্ব-তালাশ নিয়ে কে ভাবে। সরকার ট্যাক্স বাড়াক, সাউদার্নক্রস সেই হোম বন্ধ করে আরও কিছু লাভ করুক- এই তো আসল ঘটনা। ভুলে যায় সকলে, একজন অশীতিপর বৃদ্ধ-বৃদ্ধারও নিজের মতো বাঁচার অধিকার আছে।

দেশে বেশ কিছু 'হোম' হয়েছে। আশা করছি, সেখানে যারা দেখাশোনা করেন তারা কেউ রোবট নয়, মানব-মানবী। আর যারা থাকবেন একটি পরিবারে বাস করার আনন্দ যেন তাদের থাকে।

সবখানে বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে নানা সব বিরূপ সমালোচনা শুনি। তবে একবার আমার স্যার মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের স্ত্রী ডলি আপার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। এক পিঠ মেঘের মতো চুলে মিষ্টি ডলি আপা। আমার একজন প্রিয় মানুষ। স্যার মারা যাওয়ার পর তিনি নিজের পছন্দমতো একটি হোমে থাকেন। বললাম- কেন ডলি আপা? ছেলে, মেয়ে, ছেলের বউ কারও সঙ্গে থাকা গেল না?

কেন যাবে না। তবে আমি তোমার স্যারের স্মৃতি নিয়ে একা নিজের মতো থাকতে ভালোবাসি। ওর অনেক কিছু নিয়ে বেঁচে আছি। চারবেলা খাওয়ায়, ডাক্তার, দেখাশোনা। মন্দ কি বলো? সেদিন আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমরা যত বিরূপ সমালোচনা করি না কেন, এসব বৃদ্ধাশ্রমে কেউ কেউ নিজের মতো বাঁচতে ভালোবাসে। নচিকেতা ঘোষের নানা সব মনকাড়া বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে লেখা গানের পরেও মনে হয় বুড়োবুড়িদের এসব হোম কেবল জেলখানা বা অমানবিক গোশালা নয়। নিজের মতো বাঁচার অধিকার সকলের থাকে। তবে আমরা সবসময় তা স্বীকার করি না। ছেলেমেয়ে বা অন্য কারও শাসনে বসবাস সবসময় ভালো লাগবে, তার কোনো মানে নেই। নিজের ইচ্ছায় যে যেতে চায় তার যাওয়ার অধিকার থাক। 

কনির শেষ জীবনে হারিয়ে গিয়েছিল জানালা, কল্পনার অবাধ পাখা মেলার আনন্দটুকু। অনেকের হারায় মানবিকতার নিবিড় স্পর্শ। তারপরও বাঁচে অনেকে। কেউ ঈশ্বরকে সঙ্গী করে। সেটা মন্দ নয়। 

আজ যদি আমার ল্যাপটপ, স্কুল আর সরকারি পেনশন না থাকত? কারও কাছে হাত পাতা? ভাবতে পারি না। 

ব্রিটেন প্রবাসী কথাসাহিত্যিক


এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP