বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» শিল্প-সাহিত্য »কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো || বুর্জোয়া চিন্তাধারায় আগুন
কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো || বুর্জোয়া চিন্তাধারায় আগুন

Friday, 23 March, 2018 09:34pm  
A-
A+
কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো || বুর্জোয়া চিন্তাধারায় আগুন
জাহেদ সরওয়ার : ম্যাকিয়াভেলির প্রিন্স যদি হয় শাসক শ্রেণির শাসন করার তরিকা। সান জু’র আর্ট অব ওয়ার যদি হয় কিভাবে যুদ্ধ করতে হয় আর সামরিক শক্তি বাড়ানোর তরিকা। তবে কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো হচ্ছে যাদেরকে শাসন করা হবে বা যাদের বশে রাখতে যুদ্ধবিদ্যার এত আয়োজন সেই সর্বহারা বা প্রলেতারিয়েতদের নিজেদের শাসক হয়ে ওঠার মনস্তাত্তিক ও ঐতিহাসিক প্রশিক্ষণ পুস্তিকা। দুনিয়ার বুকে এমন কোনো ভাষা আছে কিনা সন্দেহ, যে ভাষায় কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিখ অ্যাঙ্গেলস রচিত এই ছোট্ট পুস্তিকাটি অনূদিত হয় নাই।

এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ফেব্রুয়ারি ২১, ১৮৪৮ সালে। জার্মান ভাষায় রচিত এই বইটির নাম ছিল মানিফেস্ট ডেয়ার কোমুনিস্টেন। বইটির বয়স প্রায় ১৭০ বছর হতে চলল। বইটির কাব্যিক ভাষায় ব্যাখ্যা, সহজবোধ্যতা ও সর্বোপরি বস্তুবাদী ধারায় ঐতিহাসিক শ্রেণি বিকাশ ও উৎপাদন সম্পর্কের কারণে একমুখী হয়ে যাওয়া পেশাগুলো ও বুর্জোয়া আর প্রলেতারিয়েতের দ্বন্দ্ব ও সম্পর্ক ইত্যাদির ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বইটির মোট ৪টি অধ্যায়। ১. বুর্জোয়াশ্রেণি ও সর্বহারাশ্রেণি ২. সর্বহারাশ্রেণি ও কমিউনিস্টরা ৩. সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিস্ট সাহিত্য ৪. বর্তমান বিভিন্ন বিরোধী দল সম্পর্কে কমিউনিস্টদের অবস্থান। মজার বিষয় হচ্ছে এটি যখন লেখা হয় তখনও কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম হয়নি।

বইটির শুরুই হয় এমন একটি লাইন দিয়ে যেটি বহুল প্রচলিত বহুল প্রচারিত ‘আজ পর্যন্ত বিদ্যমান সকল সমাজের ইতিহাস হচ্ছে শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস’। এই লাইন দিয়ে লেখকদ্বয় উৎপাদন সম্পর্কের কারণে শ্রেণি থেকে যে শ্রেণির উদ্ভব হচ্ছে সেটারই ইঙ্গিত দিয়েছেন। আদিম সমাজ থেকে সামন্ত সমাজ ও সামন্ত সমাজ থেকে বুর্জোয়া সমাজ আর এ থেকে সামনের দিকে আগানো। প্রথম পর্বে লেখা আছে ‘দুনিয়ায় বুর্জোয়ারা যেখানেই সংখ্যায় বেড়েছে সেখানেই সামন্ততান্ত্রিক পিতৃতান্ত্রিক নির্দোষ সরল সব সম্পর্ক খতম করে দিয়েছে। যেসব বিচিত্র সামন্ততান্ত্রিক বন্ধনে মানুষ বাঁধা ছিল তার স্বাভাবিক উর্ধ্বতনের কাছে, তা এরা ছিঁড়ে ফেলেছে নির্মমভাবে। নগ্ন স্বার্থ ছাড়া, নির্মম নগদ লেনদেন ছাড়া এরা মানুষের সঙ্গে মানুষের আর কোনো বন্ধন বাকি রাখেনি। আত্মসর্বস্ব হিসাব নিকাশের বরফ-জলে এরা ডুবিয়ে মেরেছে ধর্ম-উন্মাদনার প্রশান্তদিব্য ভাবোচ্ছ্বাস, শৌর্যমণ্ডিত উৎসাহ ও কুপমণ্ডুক ভাবালুতা’ ...এ যাবত সন্মানিত এবং সশ্রদ্ধ বিষ্ময়ে দেখা প্রতিটি বৃত্তির অলৌকিক মহিমা বুর্জোয়াশ্রেণি টেনে খুলে ফেলেছে। চিকিৎসাবিদ, আইনবিশারদ, পুরোহিত, কবি, বিজ্ঞানী- সকলকে পরিণত করেছে তার পারিশ্রমিক-প্রাপ্ত মজুরি-শ্রমিকে।’

একেকটা যুগ যখন শেষ হয় তখন সম্পর্কগুলো বদলে যেতে থাকে এ নিয়েই তো অনেক অনেক সাহিত্য হয়েছে গোটা দুনিয়ায়। উৎপাদন আর বিনিময় প্রথা বদলে যাবার সাথে সাথে মানুষের সম্পর্কগুলো ক্রমাগত বদলে যেতে থাকে। সেটাই ইঙ্গিত করা হয়েছে এখানে। বুর্জোরা মূলত সামন্তদের আমলে ব্যবসা বাণিজ্য করতে পারছিল না। কারণ সামন্তদের শাসন ব্যবস্থায় বা অর্থনীতিতে বা প্রজাপালনে কোনো শৃংখলা ছিল না।  নিয়মিত পণ্যের যে জোগান সেটা দিত বুর্জোয়াদের ক্ষুদে প্রতিনিধিরা। এই প্রতিনিধিরা আজকের বিক্রয় প্রতিনিধিদের মতো একদেশ থেকে পণ্য নিয়ে এসে অন্যদেশে বিক্রি করতো। পণ্যের যত চাহিদা বেড়েছে সামন্ত রাজারা ততই ট্যাক্স বসিয়েছে। এভাবে বুর্জোয়ারা একতাবদ্ধ হয়েছে। তারা ভেবেছে তারাই যদি ঠুনকো সামন্ত রাজাদের বিদেয় করে নিজেরা ক্ষমতা নিতে পারে তাহলে কাঁচামাল সংগ্রহে তাদের সমস্যা ও খরচ অনেকখানি কমে যাবে। মুনাফা বেড়ে যাবে ব্যাপকভাবে।

‘নিজের প্রস্তুত মালের জন্য অবিরত বর্ধমান এক বাজারের প্রয়োজন বুর্জোয়াশ্রেণিকে সারা পৃথিবীময় দৌড় করিয়ে বেড়ায়। সর্বত্র একে বসতি নির্মাণ করতে হয়, সর্বত্র একে উপনিবেশ স্থাপন করতে হয়, যোগসূত্র স্থাপন করতে হয় সর্বত্র।’

ভারতবর্ষে ইংরেজরাও এসেছিল ব্যবসা করতে। কিন্তু ব্যবসা করতে এসে তারা বিভিন্নভাবে হেনস্থা হয়েছিল তৎকালীন সামন্তরাজা মোগলদের হাতে। আর তাই তারা অবাধে বাণিজ্য করার জন্য বিভিন্ন কৌশলে ভারতবর্ষের ক্ষমতা দখল করে। তেমনি তারা করেছে আফ্রিকায় মধ্যপ্রাচ্যে দূরপ্রাচ্যে। তারা সারা পৃথিবী থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করেছে তাদের পণ্য উৎপাদনের জন্য। সারা পৃথিবীতেই গড়ে তুলেছে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা। এরপর বলতে গেলে ক্ষমতার সঙ্গে পুঁজি যুক্ত হয়ে গেছে। ক্ষমতা আর পুঁজি অভিন্ন সত্তায় পরিণত হয়েছে। ক্ষমতার কেন্দ্র রাষ্ট্র পরিণত হয়েছে বুর্জোয়াদের সামাজিক সংস্থায়।

বুর্জোয়াদের কাছে তাদের পণ্যের ক্রেতারা ছাড়া অন্যকোনো মানুষ প্রাণি মাত্র। যাদের ক্রয় বিক্রয়ের ক্ষমতা নাই পুঁজিবাদে তার কোনো স্থান নাই। সব কিছুই মাপা হচ্ছে লেনদেনের নিমিত্তে। আর গণপ্রাণি মানে তাদের পণ্যের গণউৎপাদক, শ্রমিকশ্রেণি, মেনিফেস্টোর ভাষায় প্রলেতারিয়েত। এই প্রলেতারিয়েতদের শ্রমে বুর্জোয়াদের পুঁজি বাড়ে। তাদের কিছু হয় না তারা যেন বেঁচে থাকে আগামি কালকে আবারও শ্রম দেয়র জন্য। কার্ল মার্কস এখানে বলছেন, পুঁজিবাদীরা প্রচুর মানুষকে শ্রমিক বানিয়ে তাদের শোষণ যেমন করছে তেমনি এই শ্রমিকদের ভেতরই লুকিয়ে আছে তাদের ভবিষ্যত হত্যাকারীরা। এদের হাতেই লুপ্ত হবে বুর্জোয়াদের সঞ্চিত পুঁজি। এমনই ধারণা কমিউনিস্টদের। শ্রমিকদের হাতে বুর্জোয়াদের পতন হলে কী রকম শাসন ব্যবস্থা হবে? এইরকম প্রশ্নের উত্তরে এখানে বলা হচ্ছে। ‘পুঁজি ব্যক্তিগত নয় একটা সামাজিক শক্তি। কাজেই পুঁজিকে সাধারণ সম্পত্তিতে অর্থাৎ সমাজের সকল লোকের সম্পত্তিতে পরিণত করলে, তার দ্বারা ব্যক্তিগত সম্পত্তি সামাজিক সম্পত্তিতে রূপান্তরিত হয় না। সম্পত্তির সামাজিক চরিত্রটাই কেবল বদলে যায়। তার শ্রেণিগত প্রকৃতিটা লোপ পায়।’

বুর্জোয়া শ্রেণির সবধরণের চরিত্রকেই বিশ্লেষণ করা হয়েছে এই মেনিফেস্টোতে। এমনকি তাদের ব্যক্তিগত নৈতিকতাহীনতার একাধিক স্তর নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বুর্জোয়া সমাজে নারীদের অবস্থান সর্ম্পকে বলতে গিয়ে বলা হচ্ছে ‘সামান্য বেশ্যার কথা না হয় ছেড়ে দেওয়াই হল, মজুরদের স্ত্রী কন্যা হাতে পেয়েও আমাদের বুর্জোয়ারা সন্তুষ্ট নয়, পরস্পরের স্ত্রীকে ফুসলে আনতেই তাদের পরম আনন্দ। বুর্জোয়া বিবাহ হল আসলে সাধারণভাবে বহু স্ত্রী রাখার ব্যবস্থা। 

মোট কথা কমিউনিস্টরা বুর্জোয়াদের পতনের পর কী কী ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থা, পারিবারিক ব্যবস্থা, উৎপাদন ব্যবস্থা, সাহিত্য ইত্যাদি করতে চায় প্রতিটি তর্কের সাথে সেই সমাধানের রূপরেখাও আঁকা হয়েছে। অতীত থেকে বর্তমান আর বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের যেই প্রগতির ধারা তারা রূপরেখাই আসলে এই কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো। কমিউনিজম সম্ভব কিনা সেই প্রশ্নতো আছেই কারণ মানুষের সেলফিশ জিন। মানুষ অন্য মানুষের জন্য কতটুকু ত্যাগ করতে পারে। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে এখন পৃথিবীতে এত মহামানবের আনাগোনা। কিন্তু কতটুকু আগালো মানুষ। বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো করে কেন আমাদের এখনও বলতে হচ্ছে হ্যাজ ম্যান আ ফিউচার? তবে এই অতিলোভ বা ব্যক্তিগত লোভ নিয়েও আলোচনা হয়েছে এখানে। বইটি প্রতিবার পাঠে প্রতিবারই নতুন নতুন প্রশ্ন সামনে নিয়ে আশার মতো বই। কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোর পর মেনিফেস্টো শব্দটাই প্রচুর জনপ্রিয়তা পায়। ছোট ছোট সামাজিক সংগঠন বা লিটারারি গ্রুপও তাদের নিজস্ব মেনিফেস্টো লিখে প্রচার করে।

লেখক : কবি ও ভাবুক। 

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP