বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» শিল্প-সাহিত্য »ওসমান সেমবেন : আফ্রিকার রাজা
ওসমান সেমবেন : আফ্রিকার রাজা

Sunday, 25 February, 2018 11:50pm  
A-
A+
ওসমান সেমবেন : আফ্রিকার রাজা
মূল : নওয়াচুকু ফ্রাঙ্ক উকাডিক ।। অনুবাদ : অনিন্দ্য আরিফ

২০০৮ সালে থেসালঙ্কি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ওসমান সেমবেনের কাজের ওপর একটি রেট্রোস্পেক্টটিভের আয়োজন করে। উৎসবের সূচিতে তাঁর সম্পর্কে নিন্মোক্ত রচনাটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

পৃথিবীর তাবৎ চলচ্চিত্র সমালোচক ও ইতিহাসবেত্তারা প্রয়াত সেনেগালের চলচ্চিত্রকার ওসমান সেমবেনকে ‘আফ্রিকার সিনেমার পিতা’ উপাধিতে ভূষিত করেছেন। তাদের এই মূল্যায়ন যথার্থই মনে হয় যখন দেখা যায় সাম্প্রতিক আফ্রিকান সিনেমা তৈরিতে সেমবেনের ব্লাক গার্ল, মানদাবি এবং ক্ষালার মতো সিনেমাগুলোর একটি সুদূর প্রসারী প্রভাব রয়েছে। সেমবেন পশ্চিমা ঔপনিবেশিকতাবাদের অন্যায় এবং আফ্রিকান অভিজাতদের মধ্যে সেই ঔপনিবেশিকতা উপজাত মানসিকতা, যা দুর্নীতি এবং শ্রেণি স্তরবিন্যাস দ্বারা পরিপূর্ণ, এই দুটি বিষয়কে সামনে এনেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই দৃষ্টিভঙ্গী আফ্রিকার দেশে দেশে মুক্তিসংগ্রামকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তার এই উত্তরাধিকারকেই সেমবেন পরবর্তী আফ্রিকান প্রজন্ম গ্রহণ করেছিল।

একজন স্পষ্টবাদী রাজনৈতিক চলচ্চিত্রকার হিসেবে সেমবেনের মতাদর্শিক অবস্থান এবং নির্মাণ প্রক্রিয়া কখনোই বন্ধুর ছিল না। তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে ইমিতাই এবং ক্যাম্প ডি থিওরাই ছিল ফ্রেঞ্চ সাম্রাজ্যবাদী ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে স্পষ্ট প্রতিবাদ। আর ক্ষালা এবং মুলাদে ছিল আদিবাসী আফ্রিকার নির্মমতা এবং সঙ্কীর্ণ যৌন জীবনের প্রতি প্রবল কটাক্ষ। সেমবেন ছিলেন একজন নব্য-বাস্তবতাবাদী। তিনি ছিলেন নতুন ধরনের ‘এপিক সিনেমা’র একজন অবতার। যার মধ্যে মিশেল ছিল আইজেনস্টাইনের সামষ্টিক প্রধান চরিত্রের ভাবনা, ব্রেখটীয় ব্যঙ্গ এবং তীব্র সামাজিক বিদ্রূপ।

সেমবেন তাঁর চলচ্চিত্রগুলোতে ঔপনিবেশিকতার ভৌতিক ক্ষতগুলোকে ব্যবহার না করে আফ্রিকান কথ্য রীতির মাধ্যমে সংলাপ এবং সামাজিক পরিবর্তনে নতুন প্রেরণা তৈরি করেছেন। আফ্রিকান প্রয়োজনকে ফুটিয়ে তোলার জন্য তিনি যথার্থই তাঁর প্রথম দিককার চলচ্চিত্রগুলোতে ইউরোপীয় সিনেমা ঐতিহ্যকে পাশ কাটিয়ে গেছেন। তাঁর যুগান্তকারী সৃষ্টি বরোম সারাটে (১৯৬৪) সেমবেন প্রথম জীবনের ডক শ্রমিক এবং ট্রেড ইউনিয়নের বামপন্থার আদর্শকে প্রতিফলনের পাশাপাশি নব্যবাস্তবতাবাদকে বিমূর্ত করেছেন। এই চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র এবং ভিক্তারিও ডি সিকার বাইসাইকেল থিফের মুখ্য চরিত্র আন্তেনিওনির মধ্যে পরিষ্কার সাদৃশ্য বিদ্যমান। সেমবেন সর্বস্বান্ত ঘোড়ার গাড়িচালকের গল্প বলেছেন যে তাঁর জীবিকার একমাত্র অবলম্বন গাড়িটি হারিয়ে ফেলে। তাঁর এই কাহিনি আরো সংগ্রামপ্রবণ এবং মানবিক।

সেমবেনের প্রথম বিস্তৃত কাজ ব্লাক গার্ল (১৯৬৫) ইউরোপিয়ান আর্ট সিনেমার একটি শাখার আমূল রূপান্তর ঘটিয়েছে। এই কাহিনিটি সেমবেনের নিজস্ব ছোট গল্প থেকে গ্রহণ করা হয়েছে— কাহিনিটিতে ফ্রেঞ্চ নব তরঙ্গ এবং ইতালিয়ান নব্য বাস্তবোত্তর বৈশিষ্ট্য রয়েছে— একটি বিচ্ছিন্ন প্রধান চরিত্রের মন্থর মানসিক অধঃপতনের কারণ অন্বেষণ করা হয়েছে। কিন্তু দিওয়ানা নামের একজন তরুণী সেনেগালীয় ভৃত্য যাকে নিয়োগ দিয়েছে আন্তাবিসের এক মধ্যবিত্ত দম্পতি, তাঁর হতাশার চিত্র ফুঁটিয়ে তুলতে সেমবেন তাঁর ইউরোপীয় পূর্বসুরীদের সঙ্গে বৈসাদৃশ্য তৈরি করেছেন এবং এটি স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক। রিভেরার আকর্ষণের  মধ্যে খাবি খেতে থাকা দিওয়ানা নিজেকে রান্না করার কাজে এবং ঘড়ির আশেপাশে পরিষ্কার করার কাজে খুঁজে পায়। রিভেরা একজন অসৎ বন্দী যে দম্পতির ফিটফাট অতিথিদের বর্ণবাদী বিদ্রূপ সহ্য করে। ফ্রাঞ্জ ফানোর ন্যায় বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ঔপনিবেশিকতাবাদ বিরোধী তাত্ত্বিকের মতো সেমবেনও বিশ্বাস করতেন পশ্চিমা বিশ্ব আফ্রিকানদের ওপর সাংস্কৃতিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষত চাপিয়ে দিয়েছে।

ফানো যে বিশ্বাসটি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, ঔপনিবেশিকতা মোচন হলেও অনেক সময় পদচ্যুত ঔপনিবেশিক কর্তাব্যক্তিরা সেই একই আচরণ অনুকরণ করে  থাকেন তারই প্রত্যক্ষ এবং আকর্ষণীয় শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ আমরা সেমবেনের পরবর্তী চলচ্চিত্রগুলোতে দেখি। এই বাস্তবতাবাদের যথাযথ প্রয়োগ আমরা দেখতে পাই ইমিতাই (১৯৭১) এবং সবচেয়ে সফল প্রয়োগ ক্ষালাতে, তাঁর যুগান্তকারী সৃষ্টি। এই জটিল কাহিনি আবর্তিত হয় এল হাজির অপমানজনক পতনকে ঘিরে। তিনি একজন উন্নয়নশীল সেনেগালীয় ব্যবসায়ী যে কিনা এক ভিক্ষুকের অভিশাপে নপুংসকে পরিণত হয়। এই চলচ্চিত্রটি লুপ্ত হওয়া যৌনতার রাজনীতি, ক্ষমতার চাতুরতা এবং তিক্ততার প্রাধান্যের প্রতি সমালোচনামূলক বিরল উপস্থাপন। এল হাজির যৌন ক্ষমতা হারানো তাঁর নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত সেনেগালের গুরত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হওয়ার প্রতি তীব্র কষাঘাত। সেমবেনের অনেক চলচ্চিত্রেই ভাষাগত পার্থক্য রাজনৈতিক শ্রেণিবিভাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। যখন এল হাজি তাঁর কন্যা রামাকে ফ্রেঞ্চের পরিবর্তে স্থানীয় সেনেগালী ভাষা ওলফ বলার জন্য তিরষ্কার করে তখন চলচ্চিত্রটি আত্মতুষ্ট এবং দুর্নীতিগ্রস্থ আফ্রিকান নতুন শ্রেণির প্রতিনিধিদের চিহ্নিত করে।

অন্যান্য হলিউডের সিনেমা কিংবা ইউরোপীয়ান রাজনৈতিক সিনেমার মতো, সেমবেনের সিনেমাগুলো একটি একক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী চরিত্রের প্রতি মূল দৃষ্টি আরোপ করে না। আবার তা সামষ্টিক আকাঙ্খাকেও মহিমান্বিত করে না। এগুলোর মধ্যে আফ্রিকার একটি স্বতন্ত্র ধারা— মহাদেশের সামাজিক তত্ত্বের ঐতিহ্যমণ্ডিত সামষ্টিকতার মধ্যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদীতার একটি স্বকীয় ধারণা প্রতিফলিত হয়। এই ধরনের প্রগতিশীলতার সর্বোচ্চ প্রদর্শন সেমবেনের শেষ চলচ্চিত্র মুলাদে (২০০৪)-এই কাজে তাঁর দুটি অভীষ্ট বিষয় সমণি¦ত হয়েছে : নারীর সংহতির একটি উদ্দীপ্ত প্রচারণা এবং আমলাতন্ত্রের নির্বুদ্ধিতা ও সীমাহীন লোভের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা। নারীদের জনন অঙ্গহানির প্রতি তীব্র নিন্দা পোষণের মধ্য দিয়ে মুলাদে একটি শিক্ষামূলক উপস্থাপনায় পরিণত হয়েছে। এই চলচ্চিত্রের অপরূপ দৃশ্যায়ন হয় বুর্কিনো ফাসোর একটি গ্রামে ( একটি বংশানুক্রমিক উইঢিবি এবং উইঢিবির মতো মসজিদ মিজ-এন-সিনের প্রতীকী উপাদানে পরিণত হয়) এই চলচ্চিত্রটি সামষ্টিকের অথবা ঐকান্তিক প্রধান চরিত্রের নমনীয় উপস্থাপনের জণ্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আইজেনস্টাইনের সামষ্টিক শর্তাবলীর অন্তর্ভুক্ত চরিত্রগুলোর বুদ্ধিজীবীবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গী হতে পৃথক হয়ে মুলাদের গ্রাম মিলিউতে নারীদের সুন্নতের ব্যাপারে যে উদ্দীপক সংলাপ বলা হয় তাতে চরিত্রগুলো ( যারা, রেনোয়ার মতো কায়দায় তাদের নিজস্ব কারণে এই চর্চাকে হয় সমর্থন কিংবা বিরোধিতা করছে) এই উত্তেজক বিষয়ে আফ্রিকার বর্ণাঢ্য জীবনের দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।

আফ্রিকার সিনেমায় সেমবেনকে সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান দিয়ে, তাঁর উত্তরাধিকার ওই মহাদেশের অনেক প্রজন্মের চলচ্চিত্রকারদের প্রভাবিত করেছে এবং তাঁরা তাঁকে অনুসরণ করছে। মেড হোন্ডো বা গাস্ত কুবেরের মতো চলচ্চিত্রকাররা নির্দ্ধিধায় সেমবেনকে সশ্রদ্ধ স্বীকৃতি দিয়েছেন। এমনকী বুর্কিনো ফাসোর চলচ্চিত্র পরিচালক ইদ্রিসা ওয়েদ্রাগো নিজেকে সেমবেনের প্রগতিশীল উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে দাবি করেছেন (চলচ্চিত্র পণ্ডিত এন ফ্রাঙ্ক উকাডিক বলেছেন যে ওয়েদ্রাগোর চলচ্চিত্রগুলো পূর্বসুরীদের যে প্রতিবাদী ধারা তাকে পরিহার করে এবং সম্পূর্ণ বাণিজ্যবিরোধী) । এবং আরেকজন বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার চাঁদের মোহাম্মেত-সালেহ হারুণও সেমবেনের প্রভাবে প্রভাবিত। আজ থেকে ২৫ বছর আগে ইথোপিয়ান বংশোদ্ভূত মার্কিন চলচ্চিত্রকার হাইলে জেরিমা স্বীকার করেছেন “সেমবেন... তাঁর প্রভাব আমার ওপর রয়েছে এবং আমার মতো আরো অনেক আফ্রিকার চলচ্চিত্রকারদের ওপর রয়েছে তাদের অজান্তেই।”

জিবরিল ডিওপ মামবাতি যিনি সেমবেনের পর আফ্রিকার সিনেমায় সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ ও প্রগতিশীল এবং তাঁর পরে সবচেয়ে বেশি দুনিয়াজোড়া পরিচিতি পেয়েছেন তাঁর শৈলী এবং ভঙ্গিমা সেমবেন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হলেও কাজের মধ্যে অগ্রজের অলঙ্কার এবং নান্দনিকতার ছাপ পরিস্ফূটিত হয়েছে। আনেট বুশ এবং ম্যাক্স অ্যানেস তাদের সেমবেনের সাক্ষাৎকার সঙ্কলনের ভূমিকায় লিখেছেন যে সেমবেন যেখানে আফ্রিকান সিনেমায় বাস্তবতার পরশ বুলিয়েছেন সেখানে মামবাতির চলচ্চিত্রগুলো অনেক কম বিশ্লেষণাত্মক কিন্তু চরম মাত্রার কাব্যিক। একজন চলচ্চিত্র সমালোচক ১৯৯৫ সালে মামবাতির অসাধারণ কাজ ‘হায়েনা’(১৯৯২) সম্পর্কে লিখেছেন “এটি প্রথম দিককার আফ্রিকান সামাজিক বাস্তবতাবাদ যা ওসমেন সেমবেনের উপন্যাস এবং চলচ্চিত্র কিংবা সাফি ফায়েসের তথ্যচিত্র ও আত্মজীবনী থেকে উৎসারিত তা থেকে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের।”প্রকৃত অর্থে, মামবাতি এবং সেমবেনের কাজের স্বকীয়তার মধ্যে তফাৎ অনস্বীকার্য। একদিকে সেমবেন যেখানে বাস্তবতাবাদী, সেখানে মামবাতি অনেকটা আধুনিকতাবাদী।

মামবাতি এবং সেমবেনের চলচ্চিত্রের মধ্যে যদিও প্রকৃতিগত এবং শৈলীগত পার্থক্য রয়েছে, তারপরেও তাদের উভয়ের চলচ্চিত্রে বাস্তবতা এবং আধুনিকতার উপাদানের সংমিশ্রণ আছে। তাইতো আমরা ‘ক্ষালা’তে যেমন এল হাজির যৌনগত অসুস্থতা দেখতে পাই যা নিছক বাস্তবতাবাদ থেকে দুরত্ব তৈরি করেছে ঠিক তেমনি ‘হায়েনা’তে আমরা মন্তাজের শৈলী দেখি যা প্রাত্যহিক সেনেগালী গ্রাম্যজীবনের বাস্তবতায় মূর্ত।

সেমবেনের কাজে যেমন আফ্রিকার ওপর পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের শোষণের প্রতি ধিক্কার ব্যক্ত হয়েছে তেমনি মামবাতির কাজেও আমরা একই ধরনের ধিক্কারের প্রতিরূপ দেখতে পাই। সুইস নাট্যকার ফ্রেডরিক ডুরামেটের নাৎসি আগ্রাসনের মুকোশ উন্মোচনকারী ‘ভিজিট’ এর ছায়া অবলম্বনে মামবাতি ‘হায়েনা’ তৈরি করেছিলেন যেখানে তিনি আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। চলচ্চিত্রটি সস্তা নৈতিক বিচারকে পরিহার করে। চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রীয় চরিত্র দ্রামেন ছোট্ট গ্রাম কোলবেনের একজন সাধারণ মুদি দোকানদার। তাঁর জীবনের হতাশা এবং ধ্বংসেরই মর্মান্তিক কাহিনি ফুটে উঠেছে সিনেমার কাহিনিতে। চলচ্চিত্রের শুরুতেই দেখানো হয় দ্রামেন যে মহিলা দ্বারা একসময় বিমোহিত এবং পরিত্যক্ত হয়েছিল সেই লিঙ্গুয়ার রামাতু প্রচুর সম্পদ নিয়ে কোলবেন গ্রামে ফিরে আসে। তাকে বর্ণনা করা হয় বিশ্বব্যাংকের মতো ধনী হিসাবে। এই সিনেমাতে যে নৈতিক এবং রাজনৈতিক দারিদ্র্য দেখা যায় তার প্রতিরূপ আমরা দেখতে পাই সেমবেনের ক্ষালা এবং গুয়েলারে। গুয়েলারে যেমন আমরা বৈদেশিক সাহায্যের ফলে নৈতিক অবক্ষয় দেখতে পাই তেমনি হায়েনাতে আমরা ব্যক্তির অবক্ষয় দেখি।

পশ্চিমা ঔদ্ধত্য ছাড়াও সেমবেনের বৌদ্ধিক উত্তরাধিকারস্বরূপ মামবাতির কাজেও আদিবাসী আফ্রিকার সামাজিক অবিচারের চিত্র ফুটে উঠেছে। সেমবেন একদিকে যেমন পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদকে কটাক্ষ করেছেন আরেকদিকে আফ্রিকান অভিজাতদেরকেও ছেড়ে কথা বলেননি। ১৯৯০ সালে স্মিথ কলেজে এক বক্তৃতায় সেমবেন বলেন “স্বাধীনতার পর প্রায় তিরিশ বছর আগে থেকে আফ্রিকার নতুন বুর্জোয়াশ্রেণি যে পরিমাণ বুদ্ধিজীবী হত্যা করেছে তা ঔপনিবেশিক শক্তি ১০০ বছরেও করেনি। আবার অনেককেই তারা নির্বসানে পাঠিয়েছে। তারা বুদ্ধিবৃত্তিকে ধ্বংস করেছে।”

সেমবেন মতাদর্শিকভাবে চলচ্চিত্রচর্চার সঙ্গে রাজনীতিকে সম্পৃক্ত করতেন। তাঁর এই সেমবেনীয় ধারা আমরা পরবর্তীতে দেখতে পাই আবডেরামান সিসাকোর বামাকোতে (২০০৬)। এই সিনেমাতেও আমরা আফ্রিকান তথাকথিত উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের নাক্কারজনক ভূমিকাকে দেখতে পাই। আফ্রিকায় যে পশ্চিমা প্রভাবিত চলচ্চিত্র নির্মাণের রেওয়াজ ছিল তাতে প্রথম সার্থক আঘাত হানেন ওসমেন সেমবেন। তারা এই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী পরবর্তীতে অনেক আফ্রিকার চলচ্চিত্রকারদের পাথেয় হয়েছে। এমনকী সেমবেন তৃতীয় বিশ্বের অনেক চলচ্চিত্রকারের আদর্শস্বরূপ। তাদের কাজে তাঁর প্রভাব অনস্বীকার্য। যেকোনো ক্ষেত্রেই সমীক্ষণধর্মী সিনেমা নির্মাণ একটি বড় ধরনের সংগ্রাম, সেমবেন এবং তাঁর আফ্রিকান উত্তরসুরীরা এই সংগ্রামে বেশ বড় মাপের বুদ্ধিমত্তা এবং শৈল্পিক উৎকর্ষতা দিয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।

 

আলোকচিত্র : ইন্টারনেট থেকে।

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP