বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» শিল্প-সাহিত্য »বব ডিলানের নোবেলপ্রাপ্তি : সংগীত বনাম সাহিত্য
বব ডিলানের নোবেলপ্রাপ্তি : সংগীত বনাম সাহিত্য

Saturday, 15 October, 2016 10:24am  
A-
A+
বব ডিলানের নোবেলপ্রাপ্তি : সংগীত বনাম সাহিত্য
মোজাফফর হোসেন : সবাইকে বিস্মিত করেই ২০১৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পেলেন জনপ্রিয় মার্কিন সংগীতশিল্পী ও গীতিকার বব ডিলান। তিনি এর আগেও বেশ কয়েকবার নোবেলের জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন। কিন্তু পেয়ে যাবেনই যে— এমনটা হয়তো অনেকে ভাবেননি। ফলে তাঁর এই নোবেলজয়ের পর থেকেই পক্ষে-বিপক্ষে কথা হচ্ছে বিশ্বজুড়েই। প্রশ্ন উঠেছে, গীতিকবিতা কি সাহিত্যের শাখা নয়? ডিলান তো কেবল গীতিকার নন, গীতিকবিও। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে নোবেল পান গীতিকবিতার সংকলন ‘সং অব অফারিংস’-এর জন্য। এরপর কবিতায় বিশেষভাবে গীতিময়তার কারণে নোবেল পান চিলির কবি গাব্রিয়েল মিস্ট্রাল (১৯৪৫ সালে), স্প্যানিশ কবি হুয়ান র‍্যামন হিমেনেজ (১৯৫৬), ইতালির কবি সালভাতর কোয়াসিমোডো (১৯৫৯) ও সুইডিশ কবি নেলি স্যাশ (১৯৬৬)। অর্থাৎ তাঁর এই নোবেল জয়ের পেছনে পক্ষে যুক্তি নিশ্চয় আছে।

বব ডিলানের খুদে ভক্ত আমি। মফস্বলে থাকা সত্ত্বেও তাঁর নামের সঙ্গে পরিচিত হতে পারার কারণ হলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অর্থ সহযোগিতার জন্য আয়োজিত কনসার্ট— কনসার্ট ফর বাংলাদেশ। রবি শংকরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এ কনসার্টে জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে মঞ্চে উঠেছিলেন বব ডিলান। আমেরিকান সরকার মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষ নিলেও বব ডিলান মার্কিন নাগরিক হয়েও আমাদের সঙ্গে একাত্ম হয়েছিলেন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা সেখান থেকেই শুরু। এরপর তাঁর গান যত শুনেছি, তত মুগ্ধ হয়েছি, হয়েছি তত সমৃদ্ধ। বলা বাহুল্য, আমি যখন থেকে তাঁর গান শুনতে শুরু করেছি তার অনেক আগেই তিনি আমেরিকান সংগীতে জীবন্ত কিংবদন্তি রূপে আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁকে আমেরিকার সংগীতে অন্যতম পথদ্রষ্টা হিসেবে দেখা হয়।

ডিলানভক্ত হওয়া সত্ত্বেও আমি ডিলানের নোবেলজয়ে উচ্ছ্বসিত নই। কিছুটা নাখোশই বলা চলে। আমি প্রত্যাশা করেছিলাম সাহিত্যের কেউ এই পুরস্কারটি পাবেন। তবে কি ডিলানের গানের কথাগুলোকে আমি কবিতা মনে করছি না? সরাসরি উত্তর- না। তার ব্যাখ্যা দিতে আমি সাহিত্যবোদ্ধা রিচ স্মিথের কথার খানিকটা কোট করছি। তিনি দ্য স্ট্রেনজারে লিখেছেন : Dylan is a great songwriter, but he's not a poet. Poets don’t get instruments. Poets don’t get a drum, and good poets often avoid one when offered. Poets have to find music in the language itself and arrange that music in meaningful ways on the page. That is very hard to do, and it's a different task entirely from the act of writing a song.

রবীন্দ্রনাথসহ নোবেলজয়ী যে কবিদের কথা আমি উল্লেখ করলাম, তাঁরা প্রধানত কবি। কবি হিসেবেই প্রখ্যাত ও পঠিত। ডিলানের খ্যাতি সংগীতশিল্পী ও গীতিকার হিসেবে। তিনি যতটা না পঠিত তার চেয়ে অনেক বেশি শ্রুত। বব ডিলানকে সাহিত্যে নোবেল দেওয়ার কারণ হিসেবে নোবেল কমিটি পরিষ্কারভাবে বলেছেন : “...having created new poetic expressions within the great American song tradition.” অর্থাৎ ডিলান পরিষ্কারভাবেই সংগীতের মানুষ হিসেবে পুরস্কারটি পেয়েছেন। ডিলানের লেখাগুলোকে সংগীত থেকে আলাদা করার উপায় নেই। সেগুলো লেখা হয়েছেই গানের কথারূপে। ডিলান যতটা না গীতিকবি, তার চেয়ে বেশি গীতিকার। প্রখ্যাত গীতিকার। সেই হিসেবে তিনি সংগীতের জন্য নির্ধারিত গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন ১০ বারেরও বেশি। আরো ২০ বারের বেশি মনোনয়ন পেয়েছেন। পেয়েছেন সংগীতে গোল্ডেন গ্লোব ও অস্কার। বারবার এই পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা তাঁর আছে, এমনই উচ্চমাপের গীতিকার ও সংগীতশিল্পী তিনি। তাঁরপরও তিনি সাহিত্যে নোবেল পেতে পারেন না।

সমালোচক স্টিফেন মেটকাফ একটি আর্টিকেলে লিখেছেন : Bob Dylan is a genius, and for his genius, he’s been rewarded in every way; with fame, money, acclaim. He deserves all of it, but he doesn’t deserve the Nobel. It may be that Dylan’s claim to posterity will be larger than Murakami’s or Roth’s (or Wilbur’s or Didion’s), but that isn’t what is at issue in awarding the highest prize in literature to a pop musician.

একই কথা একটু অন্যভাবে লিখেছেন আনা নর্থ বব ডিলানের দেশের স্বনামধন্য পত্রিকায় এক মতামত কলামে : ‘নিশ্চয় বব ডিলান দুর্দান্ত গীতিকার। নিশ্চয় তাঁর গীতিকবিতা ও আত্মজীবনীর বই বের হয়েছে। নিশ্চয় তার গানের কথাকে কবিতা হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ আছে। তবে ডিলানের লেখা তাঁর সংগীতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি বিখ্যাত কারণ তিনি মহান সংগীতজ্ঞ। এবং যে কারণে নোবেল কমিটি যখন একজন সংগীতজ্ঞকে এই পুরস্কার দেয়, নিশ্চিত করেই তারা সেটা একজন সাহিত্যিক বা কবিকে বঞ্চিত করেই দেয়।... ডিলানের সাহিত্যে নোবেল প্রাইজের প্রয়োজন নেই। কিন্তু সাহিত্যের সাহিত্যে নোবেলের প্রয়োজন আছে। আফসোস, এ বছর সেটা হলো না।’

ডিলানভক্ত হয়েও এই আফসোসটা আমার অন্তরে বাজছে। পৃথিবীজুড়ে সাহিত্যের পাঠক কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে নোবেল কমিটি যেন বিশুদ্ধ সাহিত্যের বাইরে পা ফেলতে চাইছে। তারা এই পুরস্কারের সঙ্গে ‘new cultural currency’ যুক্ত করতে চাইছেন। এর আগের বছর স্বেতলানা আলেক্সিয়েভিচকে নোবেল দেওয়া হলো সাংবাদিকতার জন্য। তাঁর যে লেখা সেগুলোর সামাজিক-রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক মূল্য আছে নিশ্চয়, কিন্তু সাহিত্যমূল্য কতখানি আছে সেটি ভাববার বিষয়। থাকলেও সেটি কি আদোনিসের কবিতা কিংবা কুন্দেরার গদ্যের মতো শক্তিশালী? ফুয়েন্তেসের মতো ফিলিপ রথও কি তবে সাহিত্যের নোবেল না পেয়েই চলে যাবেন? বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী কবি ও কথাসাহিত্যিকের তো আকাল দেখছি না। এই মুহূর্তে সাহিত্যকে আরো প্রসারিত করে ফেলার কি প্রয়োজন আছে? বিশ্বজুড়ে যখন বইয়ের পাঠকের সংখ্যা কমছে, তখন অবশ্যই সাহিত্যিকদের এই পুরস্কার দেওয়া উচিত। তাতে করে সাহিত্যের একটা ব্র্যান্ডিংও হয়, পুরস্কৃত লেখকের বই বিক্রিও বাড়ে। এগুলো নোবেল কমিটির ভাবা উচিত।

এখন প্রশ্ন হলো : গানের কথা, নাটক অথবা চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য—এসবের কি সাহিত্যমূল্য নেই? নিশ্চয় আছে। সাহিত্যের বোধকে আরেকটু বিস্তারিত করলে বলা যায়— চিত্রকলার ও যন্ত্রসংগীতেরও সাহিত্যমূল্য আছে। তাই বব ডিলান গীতিকার হয়ে সাহিত্যে নোবেল পেলে নিশ্চয় চিত্রনাট্যে সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার দাবি রাখবেন চার্লি কাউফমান। এ জন্য চাইলে নোবেল কমিটি ‘শিল্প-সংস্কৃতি’নামে নতুন বিভাগ চালু করতে পারে। যে কারণে একজন কবি কবিতার জন্য, কিংবা কথাসাহিত্যিক উপন্যাসের জন্য (চিত্রনাট্য নয় কিন্তু) অস্কার পান না, গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড পান না, গোল্ডেন গ্লোবের জন্য বিবেচিত হন না, সেই কারণে আমি প্রত্যাশা করি না একজন সংগীতজ্ঞ সাহিত্যে নোবেল পাবেন। আমার এই বক্তব্য প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ বব ডিলানের বিপক্ষে নয়। এই বক্তব্য নোবেল কমিটির সিদ্ধান্তের বিপক্ষে।

বব ডিলান মহান শিল্পী। নোবেল পুরস্কারকে তাঁর একটি অর্জন হিসেবে ভেবে আমি তাঁকে আন্তরিকভাবে অভিনন্দন জানাই। সঙ্গে এও উল্লেখ করি, নোবেল পুরস্কার যখন তিনি পেলেন, তখন তিনি নিজেই এই পুরস্কারের অনেক ঊর্ধ্বে উঠে গেছেন। এই পুরস্কারে কিছু অর্থ ছাড়া নতুন কিছু তাঁকে দিতে পারবে না। পৃথিবী তাঁকে চেনে, সম্মান জানাই— সেটি এতটাই বেশি যে এই নোবেল তা একটু বাড়িয়ে দিতে পারবে না। যে কারণে ফের কোট করছি আনা নর্থকে : ‘ডিলানের সাহিত্যে নোবেল প্রাইজের প্রয়োজন নেই। কিন্তু সাহিত্যের সাহিত্যে নোবেলের প্রয়োজন আছে। আফসোস, এ বছর সেটা হলো না।’

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP