বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» শিল্প-সাহিত্য »মুজিব পরদেশী থেকে জেমস: বাংলা গানের কারাগারনামা
মুজিব পরদেশী থেকে জেমস: বাংলা গানের কারাগারনামা

Wednesday, 21 September, 2016 01:27pm  
A-
A+
মুজিব পরদেশী থেকে জেমস: বাংলা গানের কারাগারনামা
হাসনাত শোয়েব :

‘বেদের মেয়ে জোসনা’ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি ছবি। এই ছবি নিয়ে বিস্তর আলাপ এরই মধ্যে হয়ে গেছে। লেখা হয়েছে ঢাউস ঢাউস সাইজের নাটকীয় রিভিউও। ঘটনাটা বিরাট বলেই নিশ্চয় এই বিশাল আলোচনা। তবে আমরা ওই দিকে না গিয়ে মূল কথায় আসি। ১৯৮৯ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবির একটি গান ‘আমি বন্দি কারাগারে’। গানটি সেদিন যেমন জনপ্রিয় ছিল, আজও তেমন জনপ্রিয়। মুজিব পরদেশীর যেসব গানের জন্য এখনো স্মরিত হন, তার মধ্যে এটি নিশ্চয়ই সবার ওপরে। বলে রাখা ভালো, ‘নির্জন যমুনার কোলে,’ ‘আমার সোনা বন্ধুরে,’ ‘কলমেতে নাই কালি’র মতো সে সময়ে আরো অনেক সুপারহিট গানের স্রষ্টা মুজিব পরদেশী। এখানে একটা বিরতি। তবে এখানে একটা ফুটনোট দিয়েই বিরতিতে যাই, মুজিব পরদেশীর ‘আমি বন্দি কারাগারে’ অ্যালবামের টাইটেল গানটিই মূলত ‘বেদের মেয়ে জোসনায়' ব্যবহার করা হয়। যে অ্যালবাম প্রায় ৫০ লাখের ওপরে বিক্রি হয়েছিল। তবে আমরা আলাপের সুবিধার্থে সেই গানটিকে ছবির গান হিসেবে বিবেচনা করেই আলাপ করব।


তার এক বছর পর। মানে ঘটনার সময় ১৯৯০ সাল। একটা অ্যালবাম বাংলা ব্যান্ডের ইতিহাসে নতুন বিপ্লব নিয়ে আসে। ফারুক মাহফুজ আনাম ওরফে জেমসের গলায় ‘ফিলিংসের’ ‘জেল থেকে আমি বলছি’। এই অ্যালবামের টাইটেল গান নিয়েও আমরা টুকটাক কথা বলব। প্রশ্ন হচ্ছে, আগের বছর জেলখানা থেকে ইলিয়াস কাঞ্চন যে কেঁদে কেঁদে বলল

‘আমি বন্দি কারাগারে

আমি বন্দি কারাগারে

আছি গো মা বিপদে

বাইরের আলো চোখে পড়ে না মা

আমি বন্দি কারাগারে

আমি বন্দি কারাগারে’

এই আলাপ কি যথেষ্ট ছিল না? ইলিয়াস কাঞ্চন কি ঠিকভাবে কাঁদতে পারেননি? তা যদি না হয়, লতিফুল ইসলাম শিবলীকে কেন আবার লিখতে হলো-

‘দিন রাত এখানেই থমকে গেছে

কনডেম সেলের পাথর দেয়ালে

প্রতি নিঃশ্বাসে মৃত্যুর দিন

আমি গুনছি

শোনো জেল

থেকে আমি বলছি ’

এক জায়গায় বলা হচ্ছে ‘আছি গো মা বিপদে’, একই আলাপ পরের গানে আসছে ‘প্রতি নিঃশ্বাসে মৃত্যুর দিন আমি গুনছি’ এই বয়ান আকারে। আগের গান কি সেই আবেদন তৈরি করতে যথেষ্ট ব্যর্থ? এই দুই জেল কি আসলেই একই জেল? না কি আলাদা কোন ইঙ্গিত বহন করছে? তবে ব্যর্থতা সফলতার বাইরে যে বাহাসটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো দুটি গান আলাদা আলাদা অডিয়েন্সকে টার্গেট করে বানানো। একটা পিওর বাংলা ছবির গান। যেখানে একজন জমিদারের হাতে বন্দি শাস্তির জন্য অপেক্ষমাণ রাজকুমারের কান্না। পরবর্তীকালে যার মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হলেও বাংলা ছবির চিরায়ত মহিমায় শেষ পর্যন্ত বন্দি কারাগারের বন্দিদশা থেকে মুক্তি লাভ করেন রাজকুমার আনোয়ার তথা ইলিয়াস কাঞ্চন। যাঁরা ছবি দেখেছেন, তাঁরা জানেন এটা মিশেল ফুকো বর্ণিত আধুনিক কারাগার নয়। এই কারাগার মিথের কারাগার। মূলত ছবিটি মিথনির্ভর। যার প্লট সাজানো হয়েছে জমিদারি প্রথার নিয়মনীতির ওপর ভিত্তি করে। এই কারাগার থেকে জেমসের ‘জেলখানা’ নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করছে। মুজিব পরদেশী বন্দি কারাগারে যেমন জেমসের শ্রোতাদের থাকার সুযোগ নেই, তেমনি জেমসের কারাগারে থাকবে না মুজিব পরদেশীর শ্রোতারা। এই না থাকাটা সাবজেকটিব অ্যাপ্রোচে নয়, এটি একটি গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের ধারণা থেকে আসা।

যখন ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ মুক্তি পায় সারা দেশে। এই ছবি তুমুল সাড়া জাগিয়েছিল। বিশেষ করে গ্রাম, শহুরে নিম্নবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির দর্শকরা ছিল এই ছবির মূল দর্শক। শহুরে দর্শক এই ছবি দেখলেও তারা নিজেদের শ্রেণি সচেতনতার কারণে এই ছবির সঙ্গে নিজেদের কতটা যুক্ত করতে পারবেন সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। মুজিব পরদেশীর অনেক গান সে সময় তাদের মুখে মুখে ঘুরছিল। তবে এই ব্লকবাস্টার ছবির হিট গান হিসেবে এই গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।


এবার আসা যাক জেমসের গানে। এই গানে বর্ণিত জেলের সঙ্গে  মিশেল ফুকো বর্ণিত সংশোধানাগারের মিল আছে। যা শৃঙ্খলা তৈরির কাজে অনেক বেশি ব্যবহৃত হয়। সে সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে এই গানটির প্রাসঙ্গিকতা বোঝা যায়। একদিকে স্বৈরাচারী শাসকের অত্যাচার ও জেল-নির্যাতন, অন্যদিকে স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনও তখন চরমে। আবার  রাষ্ট্রের পোষা সন্ত্রাসীদেরও একধরনের অবস্থান ছিল। সব মিলিয়ে এই গানটি মূলত ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত এক যুবকের প্রেমিকার উদ্দেশে গাওয়া। এই গানের যে চরিত্র তার অপরাধ কী? সে কেন মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অপেক্ষায়? সে কি রাষ্ট্রের দুঃশাসনের শিকার, নাকি রাষ্ট্রের তৈরি  কোনো চরিত্র অথবা সামাজিক বিশৃঙ্খলায় তৈরি হওয়া চরিত্র? এসব কোনো কিছুই এই গানে পরিষ্কার করা হয়নি। এমনকি অপরাধী আসলেই দোষী কি না, তাও গানের কথায় পরিষ্কার না। তবে এই গানের গীতিকার নিজেই স্বৈরাচারী দুঃশাসনের শিকার হয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে তার ভাষ্য থেকে জানা যায়, স্বৈরাচারী শাসনের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার পর নিজের জেলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে এই গানের জন্ম হয়েছিল। এ ছাড়া এই গান নিয়ে নানা নাটকীয় ঘটনা আছে, সেই আলাপ অন্যত্র করা যাবে।

যারা এই গানের শ্রোতা, তারা নিশ্চয় এত কিছু জেনেবুঝে গান শুনতে যাবে না। তার কাজ গান শুনে তার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করা। এই জায়গায় দুই গানই সফল, কারণ তারা টার্গেট অডিয়েন্সকে নিজেদের দিকে টানতে পেরেছিল। তবে কখনো কখনো কোনো কোনো শ্রোতার শ্রেণিচ্যুতিও নিশ্চয় ঘটেছে। তবে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত যখন ‘আমি বন্দি কারাগারে’ শুনতে গেছে, তখন সে স্রেফ কালচারাল এলিটিজম ফলানোর জন্য এই কাজটি করেছে। আর নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকজনের জেমসের এই গান শোনার পেছনে কারণ হতে পারে মধ্যবিত্তে উত্তীর্ণ হওয়ার রোমান্টিসিজম। যদিও এই সংখ্যাটি বিরল।


এবার আসা যাক মিশেল ফুকোতে। ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ ছবির প্রেক্ষিতে যে শাস্তি তা মূলত ফুকো বর্ণিত ‘রাজকীয় শাস্তির’ ধরন থেকে কিছুটা উত্তীর্ণ। এখানে প্রাক এনলাইটমেন্ট পর্যায়ের অনেক ব্যাপারস্যাপার রয়েছে। ১৭৫৭ সালের ফুকো বর্ণিত সেই ব্রুটালিটিও এই ছবিতে নেই। বরং এই ছবিকে এনলাইটমেন্টে আসার আগ মুহূর্তের ডিসিপ্লিন শিক্ষার ড্রেস রিহার্সালও বলা যেতে পারে। যেখানে রাজার ছেলেকেও অপরাধের কারণে শাস্তি পেতে হচ্ছে। কিন্তু সে নায়ক। তাঁকে মারার ক্ষমতা কারো নেই। এই জেল-জুলুম অনেক বেশি রোমান্টিক ধ্যানধারণায় আক্রান্ত। আর জেমসের ‘জেল থেকে বলছি’ ফুকোর আধুনিক কারাগারের বর্ণনার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ এবং অনেক বেশি সমসাময়িক। গায়কের কণ্ঠেই বোঝা যায় এই শাস্তি অফেরতযোগ্য। যা তাঁকে পেতেই হবে এবং সেটা নিয়ন্ত্রণ করছে অন্য কেউ। শেষ পর্যন্ত এই গানের চরিত্র কিংবা জেমস আসলে সেই নায়ক যাঁর নায়ক হয়ে ওঠার ক্ষমতা নেই। জেরেমি বেনথামের প্যানোপটিকন থিওরির চৌকিদারের বরং এখানে নায়ক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা অনেক বেশি।


জেমসের গানটি মূলত সেই সময়ের ভয়াবহ নৈরাজ্যের স্মারক। যার মেজাজ বন্দি কারাগারের মিথের চেয়ে আলাদা। তবে বাংলা ছবি মাত্রই ভালোর জয় এবং দুষ্টের পতন। সেই অর্থে ‘বন্দি কারাগারকেও’ আপনি চাইলে একদিক থেকে  ‘জেল থেকে বলছি’র মতো করে সিম্বোলাইজ করতে পারবেন। কারণ শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতন হয়েছিল এবং রাজকুমার আনোয়ার নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছিলেন। তবে তারপরও একটা বড় প্রশ্ন থেকেই যায়, তা হলো, এতকিছুর পর ‘জেল থেকে বলছি’র সেই চরিত্রের জেল থেকে মুক্তি মিলেছে কি না? আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যক্তির মুক্তি কিংবা শাস্তির মধ্যদিয়ে জেল-জুলুমের সিলসিলা শেষ হয়ে যায় না। সেদিক থেকে হয়তো সে চরিত্র এখনো কারাগারে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষমাণ। অনেক আগে তার মৃত্যু ঘটার পরও।


আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দুই গানের ভাষা এবং উপাদান। জেমসের গান প্রেমিকাকে উদ্দেশ্য করে একেবারে টনটনে প্রমিত ভাষায়। যেখানে প্রেমিকার চুলের মৃদু গন্ধের কথা মনে করছে নায়ক। অন্যদিকে মুজিব পরদেশীর ‘বন্দি কারাগারে’ মূলত মাকে উদ্দেশ্য করে। সেই সঙ্গে এই গানের কথায় এমন সব উপাদান এসেছে, যা আবার ‘জেল থেকে বলছি’র চরিত্র থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। যদিও প্রমিত এবং আঞ্চলিক মিলিয়ে মিশিয়ে এই গানটি তৈরি। তবে এই গানের লিরিকের কিছু অংশ মধ্যবিত্ত রুচি থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। ‘দুইটি রুটি দেয় রুটি খেয়ে পেট ভরে না’ কিংবা ‘প্রাণে যে মানে না মশার কামড়ে ঘুম ধরে না’ এই কথাগুলো শিবলীর কাছ থেকে অপ্রতাশ্যিত।

মূলত নিজের শ্রেণিগত অবস্থানের কারণে শিবলী এ ধরনের লিরিক লিখবেন না বা লিখতে পারবেন না। কারণ তাঁর টার্গেট অডিয়েন্স বা যে শ্রেণির জন্য তিনি গান লিখছেন তাঁরা এ ধরনের লিরিকের জন্য প্রস্তুত থাকেন না। অন্যদিকে ঠিক একই কারণে মুজিব পরদেশী ‘জেল থেকে বলছি’র মতো লিরিকের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারবেন না। এখানে শ্রেণি একটা বিশাল দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজ নিজ শ্রেণির গণ্ডি পেরিয়ে যেতে পেরেছে দুটি গানই। যার ফলে এখনো একইভাবে বাংলা গানের ধারায় নিজেদের অবস্থান জারি রাখতে পারছে।

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP