বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» মুক্তমত »এসপি বাবুল আক্তারের বিষয়টি খোলাসা করা হোক
এসপি বাবুল আক্তারের বিষয়টি খোলাসা করা হোক

Wednesday, 7 September, 2016 07:34am  
A-
A+
এসপি বাবুল আক্তারের বিষয়টি খোলাসা করা হোক
হারুন উর রশীদ : এসপি বাবুল আক্তারকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বাবুল আক্তারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এর আগে বাবুল আক্তার এক আবেদনে বলেছিলেন, তিনি পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন, চাকরিতে যোগ দিতে চান। এই বাবুল আক্তার হলেন চট্টগ্রামে নিহত মাহমুদা খানম মিতুর স্বামী।
এখন বাবুল আক্তারকে অব্যাহতির মাধ্যমে তিনটি প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
১. বাবুল আক্তার স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন, না তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে?
২. পদত্যাগে বাধ্য করা হলে তার অপরাধ কী?
৩. যদি তার অপরাধ হত্যা সংক্রান্ত হয়, তাহলে পদত্যাগের মাধ্যমে বাবুল আক্তারকে দায় থেকে রেহাই দেওয়া যায় কিনা?
৫ জুন চট্টগ্রামের ব্যস্ততম এলাকা জিইসি মোড়ে দুর্বৃত্তরা ছুরিকাঘাতের পর গুলি করে হত্যা করে মিতুকে। মিতু তার শিশু সন্তানকে (ছেলে) স্কুলের গাড়িতে তুলে দিতে গেলে মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তাকে হত্যা করে।
তার স্বামী বাবুল আক্তার ঘটনার কিছুদিন আগে পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে ঢাকার পুলিশ সদর দফতরে যোগ দেন। এর আগ পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) হিসেবে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উত্তর-দক্ষিণ জোনের দায়িত্বে ছিলেন। মিতু হত্যার সময় বাবুল ঢাকায়ই ছিলেন। তিনি খবর পেয়ে ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চট্টগ্রাম যান।
মিতু হত্যাকাণ্ড দেশবাসীকে নাড়া দেয়। আর বাবুল আক্তার চট্টগ্রামে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযান পরিচালনা করায় হত্যাকাণ্ডের জন্য সন্দেহ করা হয় জঙ্গিদের।
হত্যাকাণ্ডের দিন চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার মো. ইকবাল বাহার সাংবাদিকদের বলেন, ‘কে বা কারা কী জন্য এ খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে, তার তদন্ত করা হচ্ছে। বাবুল আক্তার জঙ্গিদের গ্রেফতার ও অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন। এ কারণে জঙ্গিরা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে কি না, তা উড়িয়ে দিচ্ছি না। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।’
তারপর ঘটনা নাটকীয় মোড় নেয় জুন মাসের শেষ দিকে। বাবুল আক্তারকে পুলিশ সদর দফতরের কথা বলে ডেকে নিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা টানা ১৬ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেন। আর এই ১৬ ঘণ্টা তিনি তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। তারাও তখন জানতেন না ঠিক কোথায় আছেন তিনি।
পরে জানা যায় ২৪ জুন মধ্যরাতে হঠাৎ বাবুল আক্তারকে মিতু হত্যায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বনশ্রীর শ্বশুরের বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া হয় মিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ে। ১৬ ঘণ্টা পর তাকে ২৫ জুন সন্ধ্যায় আবার শ্বশুরের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। আর তখনই কিছু সংবাদ মাধ্যমে মিতু হত্যায় বাবুল আক্তার জড়িত বলে খবর প্রকাশ হয়। সংবাদ মাধ্যমের খবরে আরও বলা হয়, বাবুল আক্তারকে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার শর্তে রেহাই দেওয়া হয়েছে!
গত মাসে বাবুল আক্তারের পদত্যাগের বিষয়টি অফিসিয়ালি জানা যায়। গত ৯ আগস্ট চাকরি থেকে অব্যাহতির আবেদনপত্র প্রত্যাহার চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর আবেদন করেন বাবুল আক্তার। ওই আবেদনপত্রের তিনি বলেন, ‘বিগত ২৪.০৬.২০১৬ ইং তারিখে পরিস্থিতির শিকার হয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে বাধ্য হয়ে আমাকে চাকরির অব্যাহতিপত্রে স্বাক্ষর করতে হয়। একজন সৎ পুলিশ অফিসার হিসেবে এবং আমার সন্তানদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন এই চাকরি। এমতাবস্থায় উক্ত অব্যাহতিপত্রটি প্রত্যাহারের আবেদন জানাচ্ছি।’
কিন্তু বাবুল আক্তারের সেই আবেদন গ্রহণ না করে ‘বাধ্য হয়ে অব্যাহতির’যে আবেদন করেছিলেন, সেটাই গ্রহণ করা হয়েছে। আর এটাও বাবুল আক্তারের শেষের আবেদনে স্পষ্ট যে, ১৬ ঘণ্টা টানা জিজ্ঞাসাবাদের সময়ই তিনি পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন।
চট্টগ্রাম পুলিশ এরই মধ্যে মিতু হত্যায় কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে, যারা আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়েছে। কিন্তু মূল সন্দেহভাজন মুছা এখনও আটক হয়নি। ফলে এখনও জানা যায়নি মিতু হত্যার নেপথ্যে কারা। আর হত্যার মোটিভ কী? হত্যার মোটিভ জানা না গেলে হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটন করা কঠিন। এই বর্ণনা না বাড়িয়ে এখন মূল তিনটি প্রশ্নে আসি।
১.বাবুল আক্তার স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন, না তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে?
এই প্রশ্নের জবাব বাবুল আক্তার নিজেই দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘পরিস্থিতির শিকার হয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে বাধ্য হয়ে আমাকে চাকরির অব্যাহতি পত্রে স্বাক্ষর করতে হয়।’ এখন কথা হলো কী সেই পরিস্থিতি, যা বাবুল আক্তারকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল? কারা, কেন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে? কী কারণে সৃষ্টি করেছে? এই পরিস্থিতি কি বাবুল আক্তারের কারণেই সৃষ্টি হয়েছে, না কেউ বা কোনও গোষ্ঠী তাদের স্বার্থে সৃষ্টি করেছে? তাদের স্বার্থইবা কী? আবারও বলছি, যে সময়ে পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে, তখন বাবুল আক্তার পুলিশের জিজ্ঞাসাদের জন্য তাদের কাছেই ছিলেন।
২. পদত্যাগে বাধ্য করা হলে তার অপরাধ কী?
বাবুল আক্তারকে কোন অপরাধে বা কোন বিচ্যুতির কারণে পদত্যাগে বাধ্য করা হলো? বাবুল আক্তারের এই পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে বেশ লুকোচুরি খেলা হয়েছে। পুলিশ সদর দফতর থেকে আমরা এখনও কোনও অফিসিয়াল বক্তব্য পাইনি । পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার বিপরীতে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের কোনও কথা স্পষ্ট করে এখনও বলেননি পুলিশের কোনও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। আর বাবুল আক্তার নিজ হাতে কি পদত্যাগপত্র পৌঁছে দিয়েছেন, না কেউ তার হয়ে পদত্যাগপত্র পৌঁছে দিয়েছেন? তবে মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অব্যাহতি প্রদান করা হলো।’
৩. যদি তার অপরাধ হত্যা সংক্রান্ত হয়, তাহলে পদত্যাগের মাধ্যমে বাবুল আক্তারকে দায় থেকে রেহাই দেওয়া যায় কিনা?
যদি বাবুল আক্তার কোনোভাবে হত্যার মতো ঘটনার সঙ্গে জড়িত থেকে থাকেন, তাহলে পদত্যাগের মাধ্যমে তাকে কোনোভাবেই রেহাই দেওয়া যায় না। এটা আইনবিরোধী। যদি রেহাই দেওয়া হয়, তাহলে দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়। আর এটা দেখার কাজ পুলিশের নয়। কে খালাস পাবেন আর কে শাস্তি পাবেন, তা দেখার কাজ আদালতের।
তাহলে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়াই যায় যে, হয় বাবুল আক্তার ষড়যন্ত্রের শিকার অথবা তিনি অপরাধে জড়িয়েছেন। কোনটা সত্য, তা আমরা জানি না। কিন্তু সরকার তথা পুলিশের দায়িত্ব সেটা দেশের মানুষকে জানানো। না হলে চরম আস্থাহীনতা তৈরি হবে।
আমরা মিতু হত্যার বিচার চাই। চাই অপরাধীরা ধরা পড়ুক। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। আমরা কোনও খেলা দেখতে চাই না। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভালো। সম্মতি বলতে আইনে স্বাধীন সম্মতিকেই বোঝায়। কোনও চাপ, ভয় বা প্রভাব খাটিয়ে সম্মতি আদায় আইনের চোখে সম্মতি নয়। বরং এভাবে সম্মতি আদায় করা অপরাধ। আমরা কোনও কানামাছি খেলা দেখতে বসিনি। আমরা স্বচ্ছ তদন্ত ও বিচারের আশায় আছি।
লেখক: সাংবাদিক
ইমেইল:swapansg@yahoo.com

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP