বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» মুক্তমত »প্রোঅ্যাক্টিভ ও হাইপারঅ্যাক্টিভ
প্রোঅ্যাক্টিভ ও হাইপারঅ্যাক্টিভ

Tuesday, 24 February, 2015 10:19  
A-
A+
প্রোঅ্যাক্টিভ ও হাইপারঅ্যাক্টিভ
বাংলাদেশ টাইমঃ ইংরেজীতে দুটো শব্দ আছে: প্রোঅ্যাক্টিভ ও হাইপারঅ্যাক্টিভ।

একটা বয়স পর্যন্ত দুটো শব্দকে প্রায় একই বলে ভাবতাম; দুটোই তো আসলে একটু বেশী সক্রিয়তার কথা বলে, নাকি?

কিন্তু আমার জ্ঞানবুদ্ধি খুব একটা না বাড়লেও এটুকু অন্তত জানতে পেরেছি, প্রোঅ্যাক্টিভিটি ব্যাপারটা বেশ প্রশংসার হলেও হাইপার অ্যাক্টিভিটি আসলে একটা রোগ; ছোটদের রোগ, তবুও রোগ।

আজ এতোদিন পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে, প্রোঅ্যাক্টিভিটি আর হাইপার অ্যাক্টিভিটির মধ্যে পার্থক্যাটা আবার গুলিয়ে ফেলেছি।

আল আমিনকে দেশে ফেরত পাঠানোর এই বুলেট গতির সিদ্ধান্ত নিয়ে বিসিবি কি যেচে সক্রিয়তা দেখালো? নাকি নিজেদের হাইপার অ্যাকটিভ নামের রোগে আক্রান্ত বলে প্রমাণ করলো!

বুঝতে পারছি না।

বুঝতে পারছি না এবং কতোগুলো হিসেব কিছুতেই মিলছে না।

বিসিবি যে আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে, সেখানে তারা দাবি করেছে, আল আমিনকে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অপরাধে। কী সেই অপরাধ?

জাতীয় দলের ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ সুজন অস্ট্রেলিয়া থেকেই বলেছেন, আল আমিনের ‘ভয়ঙ্কর অপরাধ’ হল রাত দশটার পর হোটেলের বাইরে থাকা। তা, আইসিসি যেসব শিবঠাকুরের দেশের নিয়ম কানুন করেছে; তাতে ক্রিকেটারদের হোটেলকে জেলখানা বলতে আর আপত্তি থাকার কথা নয়। নিজেরা তো মশাটাও ধরতে পারে না; এদিকে খেলোয়াড়দের চলা-ফেরা, খাওয়া-দাওয়া; সব এখন ওনাদের অনুমতিস্বাপেক্ষ ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে।

তা বেশ!

আইসিসির টূর্নামেন্ট খেলবে, হোক সে অথর্ব, আইসিসির কথা তো শুনতে হবে। ফলে আইসিসির ধমক অগ্রাহ্য করে রাত দশটার পর বাইরে থাকাটা হত্যাকান্ডের মতো গুরুতর অপরাধ বই কী! সে ক্ষেত্রে আল আমিনকে ফেরত পাঠানোই ঠিক আছে।

কিন্তু নিয়মটা কী শুধু বাংলাদেশের জন্য করলো আইসিসি?

হতেও পারে।

এই তো এক সপ্তাহ আগের কথা।

শহীদ আফ্রিদিসহ পাকিস্তানের আট ক্রিকেটার দেরি করে হোটেলে ফিরে দলের কাছ থেকে সতর্কবার্তা পেলেন। এ ছাড়াও আইসিসির নিয়মের ফাঁক গলে প্রতি দিনই দু-একজন ভিন্ন ভিন্ন দলের খেলোয়াড়ের একটু দেরি করে হোটেলে ফেরার ঘটনা শোনা যাচ্ছে।

তাহলে আল আমিনকে কেন দেশে ফেরত পাঠানোর মতো শাস্তি পেতে হলো!

এখানে আবার আইসিসি ও বিসিবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল কিছু বিরল লোকেরা বলছেন, ‘আরেহ না। আসল ঘটনা আরও তলে। আসল ঘটনা হলো আল আমিন হোটেলে দেরী করে ফেরার চেয়ে বড় অন্যায় করেছে।’

কী সেই অন্যায়?

বলা হচ্ছে, আল আমিন ক্যানবেরায় থাকতে এরকম অপরিচিত, কিন্তু আইসিসির সন্দেহভাজন কিছু লোকের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করেন। সেই মেলামেশাটাই ব্রিসবেনে এসে আরও বেড়ে যায়। এখানে তিনি রাত দশটার পর হোটেল থেকে বেরিয়ে ওই লোকদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন বলেও গুঞ্জন আছে।

আল আমিন বুকিদের সঙ্গে মিশতে পারে না, তা বলছি না। ক্রনিয়ের পতন দেখেছি; আর কাকে বিশ্বাস করি?

আর কার্যত আল আমিন, আশরাফুল, মোহাম্মদ আমিরের মতো সংষ্কৃতির ছেলেরা বুকিদের সহজ শিকারে পরিণত হওয়া সম্ভব। এরা নানা কারণেই নিজেদেরকে পেরিফেরিতে ভাবে, একধরণের দুর্বলতা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে ক্যারিয়ার নিয়ে; সেই সুযোগে বুকিরা ঢুকতে পারে।

আল আমিনকে চেন্নাই থেকে নজরে রাখা হচ্ছে, তিনি ক্যানবেরা থেকে ব্রিসবেনে তার কিছু সন্দেহভাজন সঙ্গীর সঙ্গে মেশাটা অব্যাহত রেখেছেন; এগুলো আমরা বেশ বিশ্বস্ত সূত্র থেকে শুনতে পাচ্ছি। আল আমিন প্রথম ম্যাচের একাদশে ঠাই না পেয়ে ড্রেসিংরুমে অগ্নিশর্মা আচরণ করেছেন; তার সবচেয়ে বড় সমর্থক এবং গুরুজন মাশরাফির সঙ্গে `শাউট‘ করেছেন; এমন খবরও শোনা গেছে।

একাধারে আল আমিনের এই উত্তেজনা প্রকাশ সন্দেহজনক এবং আপত্তিকর।

ফলে ব্যক্তি আল আমিনের প্রতি খুব সহানুভূতিশীল হওয়ার চেষ্টা আমি করছি না। বরং পরিষ্কার করে বলে দিতে চাই, মাশরাফির মতো বুক দিয়ে আলগানো অধিনায়ককে যদি কেউ আক্রমণ করেই থাকে, আমি কখনোই তার পাশে থাকবো না।

সবমিলিয়ে আল আমিনের বিপক্ষে এই অভিযোগ আমি মেনে নিতে রাজী ছিলাম। কিন্তু কার কথায় অভিযোগ মানবো? কিন্তু এই ব্যাপারটা কে জানালো? কে আল আমিনের ওপর নজর রাখলো?

আকসু।

আকসু মানে, আইসিসির দুর্নীতি দমন ও নিরাপত্তা ইউনিট।

হা হা হা হা হা.....।

স্যরি, একটা বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের প্রধাণ ‘গোয়েন্দা সংস্থা’র নাম উচ্চারণের পর এভাবে হাসাটা ঠিক হয়নি। কিন্তু আসলে হাসি বাঁধ মানে না। আকসুর নাম শুনলেই আমার হাসি আসে। আমাদের গ্রামে ছোট বেলায় যে দফাদার কাকুকে বেতের লাঠি নিয়ে ঘুরতে দেখতাম, সেই কাকুরও কিছু ক্ষমতা ছিল; সেই কাকুও একবার চোর ধরেছিল।

দুর্মুখেরা বলে আকসু নাকি জীবনে একটা মাছিও ধরতে পারেনি। এদিকে ভয়ানক সব হুমকি-ধমকি আর তর্জন করায় তাদের আবার জুড়ি মেলা ভার।

আকসুর চোখের সামনে ইংল্যান্ডে স্পট ফিক্সিং করেছে মোহাম্মদ আমের, সালমান বাটরা। আকসু টের পান নাই; ধরতে হয়েছে এসে ‘দ্য নিউজ’ পত্রিকার। আইপিএলে আকসু এবং তার ভাই ভারতীয় দুর্নীতি দমন ইউনিটের চোখের সামনে শ্রীশান্ত, শ্রীনিবাসনের জামাতারা পাতানো খেলার মহোচ্ছব করেছে; ওনারা বোঝেন নাই। ধরেছে দিল্লী পুলিশ।

আকসুর প্রোফাইল ঘাটেন।

এই ‘নাকাম’ সংস্থার জীবনে একমাত্র অর্জন বিপিএলে ফিক্সিং ‘আবিষ্কার’ করা। সেই সূত্রে আশরাফুল থেকে শুরু করে ভিনসেন্ট; এক গাদা লোককে শাস্তির আওতায় আনা। কিন্তু ভেবে দেখুন তো, এখানে আকসু কী আবিষ্কারটা করেছে?

প্রথমে আশরাফুলের স্বতপ্রনোদিত স্বীকারোক্তি, এরপর ভিনসেন্টের; এ ছাড়া কী আছে তাদের হাতে? একটা কোনো শক্ত এঢিন্স নিজেরা দাড় করিয়েছে, নিজেরা কিছু তলিয়ে আবিষ্কার করেছে!

শুনি নাই কখনো।

সোজা কথায় আমি যেটা বুঝি, আকসুর নিজের এমন কোনো ক্রেডিবিলিটি নাই, এমন কোনো অর্জন তাদের নাই; যাতে করে তাদের কথার ওপর ভিত্তি করে একটা ছেলেকে কয়েক ঘন্টার নোটিশে দল থেকে ফেরত পাঠাতে হবে।

ওপরের দুই কারণের যেটাই সত্যি হোক, এই তাওয়া গরম হওয়ার আগেই বিসিবির পিটুনিটা আমার কাছে শেষ পর্যন্ত হাইপার অ্যাক্টিভিটিই মনে হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় কথা হল, এই হাইপার অ্যাক্টিভিটির কারণে দলের খেলোয়াড়রা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। আজ অস্ট্রেলিয়া থেকে যতটুকু খবর পেলাম, তাতে খেলোয়াড়রা এখন নিজেদের কয়েদী বলে ভাবতে শুরু করে দিয়েছে; এটা অত্যন্ত ভয়ানক একটা ব্যাপার।

আমি আল আমিনকে নিয়ে চিন্তিত নই; সেই স্বেচ্ছায় পতিত হতে চাইলে চিন্তা মূল্যহীন। কিন্তু যারা কিছু করলোই না, যারা কিছু জানলোই না, যাদের ওপর আমাদের সবকিছু নির্ভর করছে; সেই জাতীয় দলকে নিয়ে চিন্তিত না হয়ে উপায় নেই।

জাতীয় দলের তারকারা মনে আতঙ্ক, ভয় আর কিংকর্তব্যবিমূঢ় ভাব নিয়ে বিশ্বকাপ খেলবে; এটা কল্পনা করাটাও খুব বাড়াবাড়ি ব্যাপার।

এমনি যতই রসিকতা করি, যতই সমালোচনা করি; একটা কথা সত্যি যে, বিসিবি প্রধাণ হিসেবে নাজমুল হাসান পাপন অত্যন্ত যুক্তিশীল একজন মানুষ, সম্ভবত সবচেয়ে বেশী যুক্তিশীল মানুষ। যুক্তি ভালো হলে তিনি যে কারো কথাই শুনতে রাজী হন।

আমি তার এই সময়কালে সবচেয়ে বেশী যে ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছি, তিনি যুক্তিপূর্ন যে কোনো আর্গুমেন্ট গ্রহণ করেন। তার কাছে ক্রিকেটের জন্য ভালো, সবকিছুই তিনি করার জন্য প্রস্তুত থাকেন।

বিসিবি সভাপতিকে অনুরোধ করবো, আপনি বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল পেশাদার মানুষদের একজন, আপনি নিজের মেধায় আস্থা রাখুন। আকসু বা অন্য কারো কথায় চলবেন না।

আল আমিনের ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেওয়া হয়ে গেছে; সেটা নিয়ে আর কথা নেই। এখন দয়া করে, দয়া করে ক্রিকেটারদের মন থেকে আতঙ্কটা দূর করুন। যে কোনো উপায়ে বিশ্বকাপ উপভোগ করতে দিন ওদের। আপনি ওদের কাছেই আছেন। এই বার্তাটা অন্তত ওদের দিন যে, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই; আপনি ওদের পাশে আছেন।

আপনি তো পক্ষান্তরে আমাদেরও অভিভাবক। এটুকু অনুরোধ আপনার কাছে আমরা করতেই পারি।

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP