বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» মুক্তমত »দগ্ধ হয়ে যারা মারা যাচ্ছেন তারা কি নিহত, মরহুম, নাকি শহীদ? - মতামত হাবিবুর রহমান স্বপন
দগ্ধ হয়ে যারা মারা যাচ্ছেন তারা কি নিহত, মরহুম, নাকি শহীদ? - মতামত হাবিবুর রহমান স্বপন

Monday, 23 February, 2015 02:43  
A-
A+
দগ্ধ হয়ে যারা মারা যাচ্ছেন তারা কি নিহত, মরহুম, নাকি শহীদ? - মতামত হাবিবুর রহমান স্বপন
বাংলাদেশ টাইমঃ নাশকতাকারীদের ছুড়ে দেওয়া পেট্রোল বোমার আগুনে পুড়ে এখন পর্যন্ত  নিহত হয়েছেন ৫২ জন। যারা নিহত হয়েছেন তাদের কি শুধুই ‘নিহত’ বলবো নাকি তারা ‘শহীদ’? এ দেশের একজন রাষ্ট্রপতি নিজ বাড়িতে আততায়ীর গুলিতে সপরিবারে নিহত হন। তার নাম উচ্চারণ করার সময় বলা হয় মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান। অপর রাষ্ট্রপতি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে গুলিতে নিহত হন। উভয়ই নিহত হন সেনা সদস্যের গুলিতে। দ্বিতীয় জনের নাম উচ্চারণ করার সময় বলা হয় শহীদ জিয়াউর রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামের আগে ‘মরহুম’ এবং জিয়াউর রহমানের নামের পূর্বে ‘শহীদ’ ব্যবহার করার প্রসঙ্গটি নিয়েই আমার আজকের এই লেখার অবতারণা।


আমরা বিভিন্ন সময় ধর্মীয় সভা এবং মসজিদে মাওলানা সাহেবদের বক্তব্যে জেনেছি, যারা পানিতে ডুবে বা আগুনে পুড়ে মারা যান তারা শহীদের মর্যাদা লাভ করেন। মাওলানা বা বক্তা যিনি এ বক্তব্য দেন তিনি তো মনগড়া কথা বলেন না। তিনি নিশ্চয়ই হাদিস কিংবা পবিত্র কোরআন থেকেই সেটি বলে থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) স্পষ্ট বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয় বা মৃত্যুবরণ করে সে ব্যক্তি শহীদ, যে ব্যক্তি মহামারীতে মারা যায় সে ব্যক্তি শহীদ, যে ব্যক্তি পেটের পীড়ায় (কলেরা, ডায়রিয়া) মারা যায় সে ব্যক্তি শহীদ, যে ব্যক্তি পানিতে ডুবে মারা যায় সে ব্যক্তি শহীদ’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৩৮১১, ছহীহুল জামে‘ হা/৬৪৪৯)। এখন আমার প্রশ্ন হলো, যেসব নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষ পেট্রোল বোমার আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যাচ্ছেন তারা কি ‘নিহত’, ‘মরহুম’, নাকি ‘শহীদ’? অনেক ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির কাছে প্রশ্নটি করে সদুত্তর পাইনি। তবে এসব নিয়ে নানা মানুষের নানা মত জানতে পেরেছি। নানান লোকের নানান রকম অকাট্য যুক্তি। কলেজ শিক্ষক আজিজুর রহমানের মতে দু’জনই শহীদ অথবা দু’জনই মরহুম। কারণ দু’জনই তো দেশের সেনা সদস্যের হাতে (বিপথগামী) নিহত হয়েছেন। সাধারণ কোনো মানুষ বা সিভিলিয়ান তাদের হত্যা করেনি। নিহত দু’জনই ছিলেন নিরস্ত্র।


অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর মিজানুর রহমানের ব্যাখ্যা অনেক বিশদ। তিনি বলেন, এটাতেও ধর্ম ব্যবসায়ীদের সুক্ষ্ম চাতুরি। বঙ্গবন্ধুর ডাকে এবং তার নেতৃত্বে স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়। একদল লোক যারা স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছিল তাদের দৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু ছিলেন রাষ্ট্রদ্রোহী। তিনি মুসলমানদের তথাকথিত (যে দেশে ইসলামি শরিয়া আইন ছিল না) পবিত্র পাকিস্তানকে ভেঙেছিলেন। তাই তিনি মুসলমানদের শত্রু। আর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের সহচর বা দোসরদের প্রকাশ্যে আসার এবং রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তাই তাদের দৃষ্টিতে জিয়াউর রহমান মুসলমানদের বন্ধু। এ কারণেই শেখ মুজিব নিহত হওয়ার পর তথাকথিত ওইসব ধর্ম ব্যবসায়ী স্বাধীনতাবিরোধীরা বঙ্গবন্ধুকে ‘শহীদ’ হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। তারা কষ্ট পায় জিয়াউর রহমান নিহত হবার পর। তাই তারা তাকে ‘শহীদ’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।


বঙ্গবন্ধু কিংবা জিয়াউর রহমান কেউই এ দেশে ইসলামি শরিয়া আইন চালু করেননি। ধর্মের ভিত্তিতে মুসলমানদের জন্য ভারত ভেঙে যে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে তখনও সে দেশে ইসলামি শাসনব্যবস্থা ছিল না। এখনও সেখানে তা বাস্তবায়িত হয়নি। আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে ধর্ম নিরপেক্ষতার আদর্শে। এর জন্য শহীদ হয়েছেন ৩০ লাখ মানুষ। প্রায় ২ লাখ মা-বোনকে সম্ভ্রম হারাতে হয়েছে। পাকিস্তানি তথাকথিত মুসলমান সৈন্যরা হত্যা, লুটপাট ও ধর্ষণ করেছে। তাদের সহায়তা করেছে এ দেশের কিছু লোক যারা ধর্মের লেবাস ধারণ করে ছিল। তারা ছিল জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামী দলের সক্রিয় সদস্য। সে সময়ের ধর্ম ব্যবসায়ীরা এখনো তৎপর। ওরাই সুকৌশলে একজনের নামের পূর্বে ‘মরহুম’ এবং অপরজনের নামের পূর্বে ‘শহীদ’ শব্দটি ব্যবহার করে।


আমাদের সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ্’ যুক্ত হয়েছে, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম যুক্ত হয়েছে। তাতে এ দেশে কি ইসলাম ধর্মের কোনো উন্নতি হয়েছে? ধর্মের নামে অপকর্ম অব্যাহত আছে। বেনামাজি, মিথ্যাবাদী, অন্যের হক বিনষ্টকারী এমন ভ্রষ্টের মুখে ধর্মের বুলি শুনতে হচ্ছে অহরহ। আমরা এখনো ধর্ম ব্যবসায়ীদের চিনতে পারছি না। সততা, নিষ্ঠা, সুবচন সবই বিদায় নিয়েছে। পেট্রোল বোমার আগুনে ট্রাক ড্রাইভার, বেবি ট্যাক্সি চালক, নারী-শিশু যাত্রী পুড়ে মারা যাচ্ছে। যারা পুড়ে মারা যাচ্ছে তারা কি দেশ ও দশের শত্রু? তাদের হাতে কি অস্ত্র ছিল? ১৯৭১ এ স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় একইভাবে নিরস্ত্র-নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে পাকিস্তানি সৈন্যরা এবং তাদের সহযোগী রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসরা। ওইসব বেঁচে যাওয়া রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসরাই এখনো ধর্মের দোহাই দিয়ে এ দেশের মানুষকে বোকা বানাচ্ছে। তারাই পেট্রোল বোমায় নিহতদের বলছে ‘মৃত’ আর পেট্রোল বোমা নিক্ষেপকারী দুষ্কৃতকারী যখন পুলিশের গুলিতে মারা যাচ্ছে তখন তাকে বলছে ‘শহীদ’। নাশকতাকারীরা শহীদ আর নিরীহরা মৃত! হায়রে ধর্ম ব্যবসায়ী রাজনীতিকদের অপরাজনীতি!


একজন জ্ঞানপাপী নেতা যখন দেখি টেলিভিশনে টকশোতে বলছেন, অমুকের জানাজায় লাখো মানুষের ঢল প্রমাণ করে বিরোধী দলের প্রতি জনসমর্থন নিরঙ্কুশ। তিনি জানেন না, এ দেশে দুবৃত্তের মৃত্যুর পরও জানাজার নামাজে বলা হয় ‘লোকটি ভালো ছিল’। এটাই লোকাচার। আমাদের কর্ম এবং ধর্ম সবকিছুতেই হ-য-ব-র-ল অবস্থা! কিছুদিন আগে এমনি এক আড্ডায় কথা হচ্ছিল ৮-৯জন সমবয়সীর সাথে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন এমন একজন, যিনি এলাকায় ‘ভালো মানুষ’ হিসেবে পরিচিত। আমরা সবাই তাকে ধার্মিক বলেই জানি। তবে তিনি কোন রাজনীতি করেন তা স্পষ্ট না। ওঠা-বসা তার সবার সঙ্গে, এমনকি স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গেও। প্রসঙ্গক্রমে তিনি যখন বললেন, শেখ মুজিব তো যুদ্ধাপরাধীদের মাফ করে দিয়ে গেছেন। তা হলে কেন সরকার তাদের বিচার করছে?
আমাদের আড্ডার মধ্যমণি প্রফেসর আলাউদ্দিন বললেন, বঙ্গবন্ধু যেহেতু তাদের মাফ করে দিয়েছেন, তা হলে যুদ্ধাপরাধীদের কি করণীয় ছিল? তাদের বঙ্গবন্ধুর কবরে দোয়া-কালাম পাঠ করাটাই কি উচিত বা কর্তব্য ছিল না? এটা করলে তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পেতো। কিন্তু তারাই বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে যত কটূক্তি আর বানোয়াট কথা বলে। ওরা অকৃতজ্ঞ তাই ওদের শাস্তি হচ্ছে- এটা বলা যায় যুক্তির খাতিরে।


মুসলমানদের বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয় বাংলাদেশের টঙ্গীতে- বিশ্ব ইজতেমা। সে সময়ও বিএনপি-জামায়াত জোট অবরোধ চালু রাখল। এ কাজ যদি আওয়ামী লীগ করতো? তখন এ দেশের ধর্মের নামে যারা রাজনীতি করে তারা বলতো ওরা তো এ দেশটাকে হিন্দুস্তান বানাতে চায়। আরও বলতো, আওয়ামী লীগ ইসলামের শত্রু। এ দেশের সরলপ্রাণ মুসলমানরা তাদের কথায় কিছুটা হলেও বিশ্বাস করতো। কারণ অতীতের ঘটনাসমূহ তেমনই সাক্ষ্য দেয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় এলে জামায়াত-বিএনপি জোটের নেতারা মিথ্যা প্রচারে নামে- এ দেশে আর মসজিদ থাকবে না, মসজিদে উলুধ্বনি শোনা যাবে, মুসলিম বিবাহিতাদের সিঁথিতে সিদুর লাগাতে  হবে, মাদ্রাসাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে, দাড়ি রাখা যাবে না, টুপি পরা যাবে না ইত্যাদি কত অপপ্রচার! যেহেতু বাহ্যিক দৃষ্টিতে ওরা নামাজী এবং সুন্নতি। তাই এ দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ ওদের কথা বিশ্বাস করে। তবে এখন অনেক কিছু দেখে, ঠকে মানুষ ক্রমশ বুঝতে পারছে সবই ওদের লোক দেখানো। প্রকৃত মুসলমান ওরা না। ওরা ধর্ম ব্যবসায়ী। 


মনে পড়ছে ছোটবেলায় শোনা একটি কথা। একবার মেদিনীপুরের পীর সাহেবের (মাওলানা আহম্মদ উল্লাহ) ওয়াজ শুনেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘এমন এক সময় আসবে যখন একশ্রেণীর মানুষ ধর্মের কথা বলে মানুষকে ধোঁকা দেবে। কোরআন-হাদিসের অপব্যাখ্যা করবে। মিথ্যা কথা বলবে এবং ধর্মের নামে ক্বিরা কাটবে।’ এখনও পীর সাহেবের কথাগুলো কানে বাজে। বিশ্বাস করুন বা না করুন একটু চোখ-কান খোলা রাখলে আপনার চারপাশে এমন মানুষ দেখতে পাবেন। আজ প্রকৃত মানুষ সত্যি দুর্লভ! আমি বিনয়ের সঙ্গে বলছি, দয়া করে গভীর মনোযোগ সহকারে আন্তরিকতার সঙ্গে বিষয়টি লক্ষ্য করে দেখুন। একজন সৎ বা মহৎ ব্যক্তির কথায় এবং কাজে গড়মিল থাকে না। মাদ্রাসা-মসজিদ কমিটি নিয়ে সর্বত্র দ্বন্দ্ব। একইভাবে মন্দির কিংবা প্যাগোডার কথা বলা যায়। স্বার্থপরতা সকল ক্ষেত্রে স্পষ্ট। যেখানে যেটি প্রয়োগ করা দরকার সেটা করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যেখানে টাকায় কাজ হয় সেখানে টাকার খেলা। যেখানে ধর্মের অপব্যাখ্যায় কাজ হয় সেখানে তাই করা হচ্ছে। গরিব মানুষের সন্তানরা পড়ছে মাদ্রাসায়। আর ইসলামি দলের নেতাদের সন্তানেরা দেশে-বিদেশে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে। গরিবের সন্তানের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে জেহাদী উন্মাদনা। তারা ধর্মের সবটুকু না জেনে জেহাদের চেতনায় পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ মারছে। তারা কি জানে না আল্লাহপাক বলেছেন, ‘একজন মানুষকে হত্যা করা মানে পৃথিবীর সকল মানুষকে হত্যা করা।’  


সব ধর্মই ভালো, কারণ সব ধর্মই মানুষের কল্যাণের কথা বলে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, ‘ধর্ম নিয়ে যারা কোন্দল করে ধর্মের মর্ম তারা জানে না।’ ধর্ম কী? মানুষের জন্য যা কল্যাণকর সেটাই ধর্ম। যে ধর্ম পালন করতে গিয়ে মানুষকে অকল্যাণ করতে হয়, তা ধর্মের নামে কুসংস্কার মাত্র। মানুষের জন্য ধর্ম, ধর্মের জন্য মানুষ নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘ভালো মানুষ ধর্ম নয়, তাতে দুষ্ট মানুষকে বাড়িয়ে তোলে।’ কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘সেই রুদ্ধ আসিতেছে, যিনি ধর্ম মাতালদের আড্ডা- মন্দির মসজিদ গির্জা ভাঙ্গিয়া সকল মানুষকে এক আকাশের গুম্বজ-তলে লইয়া আসিবেন।’ দার্শনিক বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বোধকরি এ জন্যেই বলেছেন, ‘ধর্মের মাঝে থেকে মানুষ এতো বদমাইশ হয়েছে, ধর্মের আবরণে যদি মানুষ না থাকতো তা হলে তারা কত দুষ্ট ও বদমাইশ হতো।’

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট হাবিবুর রহমান স্বপন

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP