বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» মুক্তমত »শ্রদ্ধার পাত্র, করুণার নয়
শ্রদ্ধার পাত্র, করুণার নয়

Monday, 23 February, 2015 11:58  
A-
A+
শ্রদ্ধার পাত্র, করুণার নয়
বাংলাদেশ টাইমঃ গত তিন চার দিন ধরে ফেসবুকে একটা খবর ঘুরে বেড়াতে দেখছি।

খবরটা এরকম যে, মাশরাফির ছেলেটা খুব অসুস্থ। পাঁচ মাস বয়সী এই ছেলেটার চিকিৎসা চলছে। ছেলের এই অসুস্থতার খবর পেয়ে মাশরাফি দেশে চলে আসতে চেয়েছিলেন; কিন্তু বোর্ড তাকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে অস্ট্রেলিয়া রেখে দিয়েছে।

খবরটা ঠিক যাকে বলে সর্বৈব মিথ্যা, তা নয়। আসলেই মাশরাফির ছেলেটা অসুস্থ। কিন্তু সেটা হঠাৎ করে নয় যে, মাশরাফি খবর শুনে চলে আসতে চাইবে। ওর ছেলেটা জন্মের পর থেকে কিছু ছোটখাটো অসুস্থতায় ভুগছে; আর দশটা ছেলে-মেয়ে এই বয়সে যেমনটা ভোগে আর কী। এ দফা টাইফয়েড নিয়ে হাসপাতালে ভর্তির ব্যাপারটা জেনেই মাশরাফি অস্ট্রেলিয়া গেছে। ফলে এই খবর শুনে সে দেশে ফিরে আসতে চাইছে; এই অংশটা সত্যি নয়।

আমার লেখার বিষয় ঠিক এই খবরের ‘সত্যি-মিথ্যে’ নিয়ে নয়। আমি এই খবরটার ‘জনপ্রিয়’ হয়ে ওঠার পেছনে অন্য একটা মানসিকতা দেখতে পাচ্ছি; মনে হচ্ছে, আমরা যেন মাশরাফিকে করুনা করতে চাচ্ছি।

এমনিতেই মাশরাফি দুই হাটুতে এক গাদা ইনজুরি নিয়ে ক্রিকেট খেলে বলে; আমরা এই ছেলেটিকে নিয়ে আলোচনার সময় ক্রিকেট বাদ দিয়ে এসব করুনার আলোচনা বেশী করি। আমি নিজেও বুঝে, না বুঝে এসব কাজ অনেকবার করেছি। মাশরাফিকে নিয়ে লিখতে গিয়ে বারবার তার ইনজুরিকে সামনে নিয়ে আসছি। আমাদের ভাবটা এমন যে, ইনজুরিগ্রস্থ বলে ছেলেটাকে করুনার পাত্র বানিয়ে সবার ভালোসা আদায় করছি।

আমার অন্তত ইদানিং তাই মনে হচ্ছে।

ব্যাপারটা সুকান্তর মতো।

সুকান্ত অল্প বয়স পেয়েছিলেন বলে অনেককে দেখি, তার কবিতার আলোচনার আগে ওই অল্প বয়সের কথাটা বলে নেন; মানে ওটুকু ছাড় দিয়ে দেখবে হবে।

কেন!

সুকান্ত কী কখনো এই ছাড় চেয়েছেন? কক্ষনো না।

মাশরাফিও কক্ষনো নিশ্চয়ই চায় না যে, তার পরিবার, তার ইনজুরিকে বারবার আমরা এরকম আলোচ্য করে তুলে ক্রিকেট নিয়ে আলোচনাটা পেছনে ফেলে দেই।

এসব বলে আমি মাশরাফিভক্তদের ছোট করতে চাইছি না। বাংলাদেশের মাশরাফিভক্তদের নিয়ে আমার ধারণাটা খুব স্বচ্ছ। খুব পরিষ্কার করে জানি যে, এই দেশে কয়েক হাজার মানুষ আছে, যারা এই মাশরাফির জন্য জীবনটা আক্ষরিক অর্থেই দিয়ে দিতে পারেন।

কথাগুলো আগেও বলেছি যে, ফেসবুকে অনেকগুলো আইডির নাম দেখতে পাবেন, যাদের নামের শুরু মাশরাফি দিয়ে বা শেষে মাশরাফি আছে। এগুলোকে ‘ফেক’ আইডি ভেবে বিরাট ভুল করে বসবেন না। এরা মোটেও ফেক নন।

তাহলে এরা কারা?

এরা মাশরাফিভক্ত; মানে, মাশরাফির জন্য জীবন দিয়ে দিতে পারা ভক্ত। আমি এদের দু একজনের সঙ্গে মিশেছি বলেই দায়িত্ব নিয়েই কথাটা বলছি। এরকম মাশরাফিভক্ত বাংলাদেশে কতো জন আছেন?

আমি অনুর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ের এক ফাস্ট বোলারকে জানি, সে শুধু মাশরাফিকে কাছ থেকে দেখা যাবে বলে ক্রিকেটে এসেছে। আরেক জনকে জানি, যার নামের শেষে ‘বিন মুর্তজা’ আছে বলে প্রায়ই বুক চিতিয়ে বলে, ‘আমিও একদিন আমার নায়ক মাশরাফি ভাইয়ের মতো হবো’! একেবারে জেনেশুনেই বলছি, বাংলাদেশে মাশরাফি পরবর্তীযুগে যতো ফাস্ট বোলার এসেছে, ৯৯ শতাংশরও জীবন-ক্রিকেটের আদর্শের নাম মাশরাফি বিন মুর্তজা। তাহলে সংখ্যাটা কতো হবে?

কদিন আগে দন্ত্যন শুভ নামে একটি ‘পাগল’ ছেলে আমাকে ইনবক্স করেছে, “ভাইয়া আমার একটা কাজ করে দিবেন । কাজটা হল একটা মেসেজ পৌঁছিয়ে দিবেন আমার গুরু ম্যাশের কাছে একটা কথা ছিল আপনার সাথে, আমি ব্রেইন টিউমারের রোগী । আপনার আর লিগামেন্ট ছিঁড়ুক চাইনা । কিন্তু যদি কিছু হয়ে যায় আমার থেকে নিয়েন । কারণ জীবিত মানুষেরটা নিলে আপনি আরও খেলতে পারবেন গুরু।”

আমার একটা সাধারণ ধারণা ষোলো কোটি মানুষের এই দেশে কয়েক কোটি মানুষ আছেন, যারা আসলেই এই ছেলেটার জন্য নিজের হাটুটা খুলে দিতে পারেন-ভাইয়া, এটা দিয়ে খেলেন।

এই ভক্তদের জন্যই বলছি, আপনারাই মাশরাফির প্রধাণ সম্পদ। মাশরাফি নিজে ক দিন আগেও বলছিল, জীবনে আর সব অর্জন এক সময় মাটিতে মিশে যাবে। টিকে থাকবে শুধু এই ভালোবাসা। এই ভালোবাসাকে সে আক্ষরিক অর্থেই কতোটা সম্মান করে, সেটা বলে বোঝানো যাবে না।

এখন সেই ভালোবাসার বিপরীতে আপনাদের ভক্তদের আরেকটা দায় থেকে যায়। আপনাদের প্রিয় নায়কটিকে মানুষের করুনার পাত্র করে না তোলা। আবারও বলি, তার জন্য প্রার্থনা করবেন, তার পরিবারের জন্য প্রার্থনা করবেন; কিন্তু মাথায় রাখবেন, মাশরাফির ক্রিকেটের চেয়ে তার ইনজুরি কিছুতেই বড় না।

মাশরাফির ক্রিকেট, মাশরাফির বোলিংকে আমরা সেরা মনে করি বলেই মাশরাফিকে আমরা মাথায় তুলে রাখি। মাশরাফির যদি একটা ইনজুরিও না হতো, তাহলেও মাশরাফিকে আমরা এতোটাই ভালো বাসতাম। আমরা ইনজুরি বা অসুস্থতাকে নয়; মাশরাফিকে ভালোবাসি।

সোজা কথা বলি, মাশরাফি আমাদের করুনা চায় না নিশ্চয়ই, সে চায় ভালোবাসা। মাশরাফি কাঁদতে আসেনি, মাশরাফি কাঁদুনে ছেলে নয়; মাশরাফি সিংহ হৃদয়ের ছেলে; মাশরাফির বুকে বাঘ বাস করে।

আমি মাশরাফিকে নিয়ে লিখতে বসলে কী এলোমেলো হয়ে যায়? হতে পারে।

ইদানিং মাশরাফি আমাকে দেখলেই বলে, 'আজ কী কবিতা লিখবেন?' গদ্যটাই লিখি অক্ষম হাতে; আর কবিতা! আজ তাই বললাম কবিতা লিখি কই! সে একগাল হেসে বলে, 'রোজই তো লেখেন। আকাশ, বাতাস, সাগর, নদী আর খেলা মিলিয়ে। আমি পড়ি, আর অবাক হই। আজ কাকে নিয়ে লিখবেন কবিতা?'

আমি মাশরাফিকে নিয়ে কবিতা লিখতে চাই। কিন্তু পোড়া কপাল আমার। মাঠে মাশরাফি-সাকিব কবিতা লেখে; আমি কাগজে লিখে তা ফুটাতে পারি না। তাই মাশরাফি ঠাট্টা করলেও কবিতা আমার লেখা হয়ে ওঠে না। মাশরাফির চেয়ে ভাল কবিতা কে লিখতে পারে বলেন? আল মাহমুদ কিংবা রবীন্দ্রনাথ; কেউ না।

ক্রিকেট দল-ফল নয়; কোনো জাতির ইতিহাসে এমন মানুষও আসে শতবর্ষের আরাধণায়। আমি বলি, মাশরাফি হল গ্রিক ট্রাজেডি আর ভারতীয় রোমান্টিকতার মিশেলে এক মহাকাব্য। এমন মহাকাব্যকে ধরতে পারতে মহাকবি হোমার বা মহাঋষি বেদব্যাস।

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP