বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» মুক্তমত »পাঠ সমালোচনা: পরাবাস্তবতার ছায়াকল্প
পাঠ সমালোচনা: পরাবাস্তবতার ছায়াকল্প

Sunday, 22 February, 2015 02:09  
A-
A+
পাঠ সমালোচনা: পরাবাস্তবতার ছায়াকল্প
বাংলাদেশ টাইমঃ নবীন কবি সিক্‌তা কাজল। একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তার ‘মেঘের পালকি বাতাসের সাঁকো’ কাব্যগ্রন্থটি।

চল্লিশটি কবিতা দিয়ে সাজানো হয়েছে গ্রন্থটি। ‘মেঘের পালকি’ শিরোনামের কবিতা দিয়ে শুরু করা হয়েছে। কাব্যগ্রন্থটির নামেই সুরিয়ালিজম বা পরাবাস্তবতার ধারণা স্পষ্ট। সাদৃশ্যগত উপমার চেয়ে কবি বৈসাদৃশ্যগত উপমায় বেশি জোর দিয়েছেন। জীবনানন্দ যেমন বলেন, ‘তোমার হৃদয় এখন ঘাস’ তেমনি কবি সিক্‌তা কাজল তার প্রথম কবিতায় বলেন, ‘মানবের তরঙ্গ বাতাসের সাঁকো বেয়ে উঠে গেল আকাশে’।

কবির প্রথম দিকের কিছু কবিতার বিষয়বস্তু বা চিত্রকল্প আপাত দৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন মনে হয়েছে। আবার ওই কবিতায় একটি লাইনই কবিতা হয়ে ওঠেছে। যেমন তার ‘রংধনু দগ্ধ মুখ’ কবিতায় ‘কেন এই স্বপ্নবিনির্মাণ-মিথ্যে আলোর পথে হাঁটা?/ কেন সুতোর ফুলে বেদনার ক্যানভাস?’ বা ওই কবিতায় ‘সভ্যতার রঙিন কাঁথায়/ কে আঁকে ফেরারি তৈলচিত্র’।

কবি স্বাভাবতই প্রকৃতি থেকে যত্ন করে কিছু শব্দ তুলে এনে পাঠককে মুগ্ধ করেছেন। তার ‘মাখামাখি সুখ’ কবিতায় দেখি ‘সোনাইতলীর বিলে খলসে মাছের ছটফট করা যন্ত্রণা’। আমাদের নিজস্ব কিছু চিত্রকল্প যা আমার গ্রামের বাড়ির সেই বিলের কথা মনে পড়ে। প্রকৃতির সঙ্গে জীবন যন্ত্রণার উপমা। এ কবিতায় কবিকে ব্ড্ড আশাবাদী মনে হয়। তাই তিনি লেখেন, ‘শস্যের মাঠে এই দুঃসময়েও কবিতার উন্মুক্ত আকাশ।’

প্রেমকে কবি ব্যবচ্ছেদ করেছেন বিভিন্ন আঙ্গিকে। তাকে মানবিক চোখে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন এভাবে-‘দ্বিমুখী প্রেমকে দিই মানবিকতার নূপুর।/ টগবগে বেঁচে থাকায় ফোটে দূষণের ককটেল।’ এখানে সমসাময়িক জীবন যন্ত্রণা ধরা পড়ে তীর্যকভাবে।

পরাবাস্তববাদের কথা বলছিলাম। এখন উপমার ঢংটা অন্যরকম। বাস্তবতার ওপারে গিয়ে কবি দেখতে চান জীবনের নৈসর্গিকতাকে। তার ‘সম্পর্কের সুতো’ উপমায় দেখি ‘আত্মার সাঁকো পেরিয়ে/ প্রজাপতির বেডরুমে ঢুকে পড়ে মাধবীলতা।’

তার কবিতা পড়লে মনে হয় কিছু শব্দ অতি পরিচিত। যেন জীবনানন্দের কাছে সখ্যতা করে চেয়ে নেয়া। যেমন- ‘জলের ঘ্রাণ’ কবিতায় দেখি ‘সোনারঙে বেড়ে ওঠা ধানক্ষেতে যে ফড়িং- সে আমি।/মৃত্যুর কাফন আমি।/ আমি ধূসর পাণ্ডুলিপি।/ বারবার ফিরে আসি করুণা ও দাক্ষিণ্যের করুণ ডগায়।’

কবির কিছু কিছু পঙক্তি ভালোলাগায় বুদ করে-‘পাপ বেওয়ারিশ হবার আগেই/ রক্তাক্ত পঙক্তিগুলো তুলে নেবো মেঘরোদ্দুর।’ বা ‘আকাশেও ঝুলে আছে আজ/ চোখের তারার মতো মায়াবিনী চাঁদ।’ (বৈশাখী সকাল)

কিছু কবিতায় মনে হয়েছে কবিতার গঠনগত বন্ধনকে ভুলে কবি আবেগের খরস্রোতে ভেসে গেছেন। কবিতার উপমা সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্য যাই হোক সেটা অর্থগত দিক দিয়ে সামঞ্জস্যতা হারালে চলবে না। তার ‘ভেজা মেঘ’ কবিতায় এই ত্রুটি লক্ষ্যনীয়। ক’ফোটা কালো তিল-/যেখানে ঠোঁটের স্পর্শে ভেজা মেঘ। অথবা ‘ক্ষমাহীন বোকা রাত’ কবিতায়-‘সাতাশটি ব্যর্থ কালের সময়-অবধি।’

কাব্যগ্রন্থের প্রথম দিকে কবিতা যতটা কাব্যধর্মী মনে হয়েছে ক্রমশ শেষের দিকে তা কিছুটা আলগা মনে হয়েছে। অর্থাৎ প্রথম ও শেষের দিকের কবিতার পার্থক্য চোখে পড়ে। শেষের দিকের কবিতাগুলো আলাদা কাব্যগ্রন্থের বলে ভুল হবার সম্ভাবনা থাকে। তবে সেগুলো সুখপাঠ্য হয়েছে।

সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হচ্ছে কবি প্রচণ্ড আশাবাদী। তাই ‘জন্মান্তর’ কবিতায় চেনা কথা হলেও ভালো লাগে- ‘যে জীবন হারিয়ে গেছে/ আমি তার জন্য কাঁদি না/কিন্তু যে জন্ম এখনো পৃথিবীতে আসেনি/ তার জন্যে আমার অপেক্ষা/ জন্ম-জন্মান্তরের।’ কবিরা এভাবেই আগামী পরিতৃপ্ত জীবনের খোঁজে সুন্দরের অন্বেষণ করেন।

কবি সিক্‌তা কাজলকে ধন্যবাদ এরকম একটি কবিতার বই উপহার দেয়ার জন্য। প্রচ্ছদটা আরো নান্দনিক করার সুযোগ ছিল। বইটি একুশে বইমেলার আগন্তক প্রকাশনীর ৬২নং স্টলে (সোহরাওয়ার্দী ভেতর) পাওয়া যাচ্ছে। মূল্য ১০০ টাকা।

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP