বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» মুক্তমত »গ্রন্থমেলা অভিব্যক্তি
গ্রন্থমেলা অভিব্যক্তি

Friday, 20 February, 2015 05:34  
A-
A+
গ্রন্থমেলা অভিব্যক্তি
বাংলাদেশ টাইমঃ নিজ গ্রন্থ প্রকাশের আগেও আমি পাঠকের কাতারে ছিলাম, প্রকাশের পরও পাঠকের কাতারেই। লেখকসুলভ আচরণ এখন পর্যন্ত আয়ত্ত করা সম্ভব হয়নি বলেই হয়তো প্রমোশনটা পেয়ে সারিনি। এই তূলনায় অবশ্য সমসাময়িক এবং অনুজ অনেকেই আমার সিনিয়র হয়ে গেছেন। তা তাদের কৃতিত্ব, স্বীকার করে নিতেই হবে। আর এসব কারণেই হয়তো আমার পাঠক প্রায় শূণ্যের কাছাকাছি, নেই প্রকাশকের শুভেচ্ছা বার্তা প্রাপ্তী। এর সবই আমার সীমাবদ্ধতা, আমি জানি। আর জানি বলেই, পাঠকবেশেই পৃথিবীর বিচরণ সমাপ্ত করবো বলে মনস্থির করেছি। তবে তাই বলে যে কলম ছেড়ে দেব, তা বলছি না। পাঠকেরও তো লেখার অধিকার আছে। সেই অধিকার প্রয়োগ আর কি!

যা হোক, নিজ ক্ষুদ্রতার ঘোষণা আরো বাড়িয়ে নিজেকে আরো ক্ষুদ্রি প্রমাণ করার কোনো ইচ্ছে আপাতত আমার নেই। আফটার অল, ‘সেলফ রেসপেক্ট’ বা ‘আত্মসম্মানবোধ’ বলে প্রচলিত একটি কথা আছে। এবং সব বাঙালি না হলেও বেশিরভাগ বাঙালিই এই বিষয়ে যথেষ্ট সতর্ক থাকেন, তা আমি জানি এবং মানি। আমি নিজেও জন্মসূত্রে বাঙালি। ‘জন্মসূত্র’ শব্দটা প্রয়োগ করলাম, কারণ এখনো মনেপ্রানে বাঙালি হয়ে ওঠা হয়নি। ‘বাঙালি’ শব্দটাকে বা গুণটাকে কেউ যদি নিতান্ত নির্বিষ কোনো বিশেষ্য বা বিশেষণ মনে করে থাকেন, তাহলে বলতেই হবে- হয় তিনি বোকার স্বর্গে বাস করছেন, নতুবা তিনি বাঙালিকে চেনেনইনি। জীবনে ধার্মিক হয়ে উঠতে, দার্শনিক হয়ে উঠতে, সর্বোপরী নিজ স্বপ্নে পৌঁছাতে যেমন সাধনা লাগে, বাঙালি হয়ে উঠতেও তেমনই সাধনার প্রয়োজন। জন্মালাম আর বাঙালি হয়ে গেলাম, তা বোধ হয় সম্ভব না। যদি তাই হতো, বাঙলায় জন্ম নিয়েও বিশ্বাসঘাতক হওয়ার মনোবাসনা কেউ বুকে লালন করতো না। যদি তাই হতো, এই দেশের আলো-বাতাস-জল-খাবারে বেঁচে বড় হয়ে কেউ এই দেশেরই সংস্কৃতির বুকে ছুরি চালাতে পারতো না। যদি তাই হতো, তাহলে নিজ জাতি ভাইয়ের গায়ে কেউ বোমা ছুড়ে মারতো না বা ধারালো অস্ত্র প্রয়োগ করে রক্তাক্ত করতে পারতো না। আসলে আমরা এখানে যতো না মুসলিম-হিন্দু, আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াত, ততোটা আসলে বাঙালি না। আমরা বাংলাদেশের চেয়ে এই বিষয়গুলোকেই বেশি ভালোবাসি। এখন নিশ্চয়ই ধর্মের কাণ্ডারিরা তেড়ে আসবেন আমাকে নাস্তিক আখ্যা দিয়ে। তাদের জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখছি, দেশপ্রেমও ইমানের একটা অংশ। কীভাবে? ছোট্ট একটা ঘটনার বর্ণনা দেই। মহানবী হযরত মুহম্মদ (সাঃ) যখন হিযরতের নির্দেশ পেয়ে মক্কা থেকে মদিনার পথে পা বাড়িয়েছেন, তখন বারবার পেছন ফিরে নিজ মাতৃভূমির দিকে তাকাচ্ছিলেন করুণ চোখে আর বলছিলেন, হে আমার মাতুভূমি, আমার জাত ভাইরা বাধ্য না করলে আমি তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।*

*ঠিক এই বাক্যটিই তিনি বলেছিলেন কি না, তা আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি না। তবে তিনি এধরণের বাক্যই উচ্চারণ করেছিলেন সে সময়। কারোর মাঝে দ্বিধা থাকলে অষ্টম, নবম বা দশম শ্রেণির ইসলাম শিক্ষা পাঠ্যবইয়ে দেশপ্রেম অংশ পড়ে নিতে পারেন।

যা্ই হোক, এসব বাকবিতণ্ডা এবার থাক। আসলে এই লেখা যে কারণে, সেই কারণে আসা যাক। গতকাল বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) গ্রন্থমেলায় গিয়েছিলাম। এবার এই প্রথম। সেখানে যাওয়ার সময়, যাওয়ার পর এবং ফেরার পথে আমার মাঝে কয়েকটা বিষয় কাজ করেছে, যা আমি প্রকাশ করতে চাইছি। আসলে বিষয়গুলো একে অপরের সাথে খুব কমই হয়তো সংশ্লিষ্ট, তাই পয়েন্ট আকারে আলাদা আলাদাভাবে দিচ্ছি:

১.
এবারের গ্রন্থমেলায় কালই প্রথম যাওয়া হল। এবং কাজের চাপ অব্যাহত থাকলে কালই শেষ। তাও আবার চড়ুই পাখির গোসল করার মতো এক ঝলকের সময় নিয়ে। আর তাতেই দেখা হয়ে গেল অনেকগুলো প্রিয় মুখের সাথে। সত্যি, মাঝে মাঝে প্রিয় মুখই যেন জীবনের সর্বোচ্চ মূল্যবান সম্পদ! কাজ, বেঁচে থাকার মূল্য মুখগুলোর কাছে যেন কিছুই না!

২. গ্রন্থমেলা থেকে ফিরছি তখন। অফিস-বাসা একদম কাছাকাছি হওয়ায় অনেকদিন ধরেই পাবলিক বাসে চড়া হয় না। কাল চড়েছি। বাসে উঠতেই অনেকগুলো মানুষ। আমার সাথে হুড়মুড় করে উঠে পড়লো আরো কিছু মানুষ। ভাবা যায়, এরা সবাই একেকটা জীবন! আমার কাছে আমার জীবন যতোটা গুরুত্বপূর্ণ, আমার সামনে তার চেয়েও হয়তো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো জীবন! বাসে ওঠার আগে যে রিক্সাওয়ালাটা ইচ্ছে করেই আমাকে খোঁচা দিয়ে গেছে আর আমি ধমকে উঠেছি, সেও একটা জীবন। বাসের যে ড্রাইভারের আচমকা ব্রেকে আমি প্রায় পড়ে গিয়েও পড়িনি, আর আমি রেগে গিয়ে প্রায় গালি দিয়ে বসেছিলাম, সেও একটা জীবন। বাস ড্রাইভারের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে যে কন্ডাক্টর ব্রেকের ব্যাখ্যা করলো ভাড়া কাটতে কাটতে, সেও একটা জীবন। গ্রন্থমেলায় যাওয়ার সময় একটা জায়গায় দেখলাম, এক রিক্সাওয়ালা আরেক রিক্সাওয়ালার কলার ধরে ঝাঁকাচ্ছে আর ঝাঁকি খাওয়া মানুষটা প্রাণখুলে হাসছে কোনো এক দুষ্টুমিতে সফল হয়েছে বলে- তারাও জীবন। একজন লোক কী ভর্তি যেন এক পলিব্যাগ হাতে এদিক-সেদিক বিভ্রান্ত তাকাচ্ছিলো আর সামনে বাড়ছিলো- সেও জীবন। এই ছোট্ট ভূখণ্ডে আমরা ষোল কোটি জীবন। প্রতিটা মূল্যবান জীবন। আমার কাছে কাল এই জীবনগুলো একেকটা গ্রন্থ বলে মনে হচ্ছিলো। যেন খুলে পড়তে শুরু করলেই ওই জীবনগুলোতে ডুব দেওয়া যাবে। হায়, যুগে যুগে দেশের রাজনৈতিক সহিংসতায় এই জীবনগুলোই সবার আগে উৎসর্গিত হয়! কত কত এমন নির্মল হাসির, জীবন চিন্তায় মগ্ন জীবন পুড়ে কয়লা হলো, ধারাল অস্ত্রে রক্তাক্ত হলো- সে হিসাব কি কোনো রাজনৈতিক দল কখনো রেখেছে? যাদের নিয়ে রাজনীতি, তাদেরকেই সবার আগে বলি! হায়, আমার দেশ!

৩. যুগে যুগে যখন কলম হয়েছে অন্যায়-অনিয়ম রুখে দেওয়ার হাতিয়ার, ঠিক সেই মুহূর্তে আমরা দেখতে পেলাম ভীত-সন্ত্রস্ত এক ‘বাংলা একাডেমি’!

যারা রোদেলা প্রকাশনির স্টল বন্ধের বিষয়টি জানেন, তারা আমার এই কথার অর্থ ধরতে পারবেন বলেই আমার বিশ্বাস।

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP