বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» মুক্তমত »সমাজটা যাচ্ছে কোথায় : ( পঞ্চম পর্ব ) জনগণের সেবক হয়েছে প্রভু, চাকর হয়েছে মনিব
সমাজটা যাচ্ছে কোথায় : ( পঞ্চম পর্ব ) জনগণের সেবক হয়েছে প্রভু, চাকর হয়েছে মনিব

Thursday, 2 August, 2018 04:33pm  
A-
A+
সমাজটা যাচ্ছে কোথায় : ( পঞ্চম পর্ব ) জনগণের সেবক হয়েছে প্রভু, চাকর হয়েছে মনিব

তারিকুল ইসলাম পলাশ
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী
এইড ফাউন্ডেশন

সামাজিক জীব হিসেবে সমাজে বসবাস করতে হয়। সমাজকর্মী হিসেবে মানুষ, সমাজ ও পরিবেশ নিয়েই আমাদের কাজ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য নানা কারণে আমাদের হাত পা বাঁধা, সঙ্গত কারণে প্রকৃত উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখা দিন দিন দুরূহ হয়ে পড়ছে। যে কারণে মনের যন্ত্রণা লাঘবের জন্য মাঝে মধ্যে এসব বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখি। নিজের পাণ্ডিত্য জাহির করা বা কাউকে দুঃখ-কষ্ট বা হেয় প্রতিপন্ন করা উদ্দেশ্য নয়।

নব্বই দশকের ছাত্র নেতা থাকা অবস্থায় বক্তৃতা, বিবৃতি, পোস্টারিং, লিফলেটিং ও রাজপথে মিছিলের মাধ্যমে অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যুক্ত ছিলাম। সর্বস্তরের মানুষ সেগুলির গুরুত্ব দিতো, ফলশ্রুতিতে সমাজ ও রাষ্ট্রের অনেক ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখার সুযোগ ছিলো।

তারই ধারাবাহিকতায় সমাজ উন্নয়নে ভূমিকা রাখার জন্যই মূলত উন্নয়ন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা। সমাজকর্ম আনুষ্ঠানিক পেশার তালিকাতে অন্তর্ভুক্ত না হলেও বর্তমানে এটি পেশা হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত। কিন্তু পিছিয়ে পড়া মানুষের ক্ষমতায়ন করতে যেয়ে নিজেদের মান-সম্মান নিয়ে কাজ করা দুরূহ হয়ে পড়ছে। দুই যুগ ধরে নিরলসভাবে উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত থাকার ফলে অভিজ্ঞতা ও কর্মপরিধিও সম্প্রসারিত হয়েছে কিন্তু মজার বিষয় তা কাজে লাগানোর সুযোগ দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।

মূল প্রসঙ্গে আসি। ঝিনাইদহতে কর্মরত আছে অনেক স্বনামধন্য স্থানীয়, আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ের উন্নয়ন সংগঠন। তাই তাদের স্থানীয় অনেক কিছুর সাথে যুক্ত হতে হয়। এখন অধিকাংশ সভা-সেমিনার বা দিবস পালন একটি নিয়ম রক্ষার মত হয়ে গেছে। সেগুলিতে উপস্থিত হওয়া ছাড়া তেমন কোনো কাজ থাকে না তাই অনেকে উৎসাহ হারিয়ে পারতপক্ষে এগুলিতে অংশগ্রহণ করেন না। কারণ আমাদের নিজেদের চলার অর্থ নিজেদেরকেই সংস্থান করতে হয়। কাজের প্রয়োজনে সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরের মানুষের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে হয়। তাই সময় নামক শব্দটি আমাদের কাছে মহামূল্যবান সম্পদ, যার সদ্ব্যবহার করে টিকে থাকাই উন্নয়ন সংগঠন সমূহের মূলমন্ত্র। কয়েক মাস ধরে জেলা জিও-এনজিও সমন্বয় সভা নিয়ে নেতিবাচক নানা কথা কর্ণগোচর হয়েছে, বিষয়গুলি অবাস্তব, অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল বিধায় কান কথা বলে উড়িয়ে দিয়েছিলাম।

স্বভাবসুলভভাবে সকল বিষয় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখি। আমাদের মতামতের মাধ্যমে ভালো কিছু ফলাফল অর্জিত হবে সে মানসে ঝিনাইদহে কর্মরত অধিকাংশ উন্নয়ন সংগঠনের প্রধান নির্বাহী জুলাই’ ১৮ মাসিক সভায় যথাসময়ে উপস্থিত হয়েছিলাম। ইতিবাচক, সভাটি যথাসময়ে শুরু হয়।

একজন সুদর্শন ব্যক্তি যথাসময়ে সভা কক্ষে ঢুকলেন, দেখে শিক্ষিত ও ভদ্রলোক মনে হলো। কিছু সময় পর উপলব্ধি করলাম, কোনো মানুষের আচার ব্যবহার ও কর্মকান্ড যে এমন হতে পারে তা ধারণারও অতীত। আমার মনে হয়েছিল একজন মনিব তার অনেকগুলি চাকরের সাথে কথা বলছেন। স্থানীয় অনেক এনজিও যারা খেয়ে না খেয়ে নিরলসভাবে সমাজ উন্নয়নে ও সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে এক সাথে কাজ করছে, তাদের প্রধানদের চুন থেকে পান খসার ন্যায় কোনো ঘটনা নিয়ে দাড় করিয়ে হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন। কারো কোনো কথায় কর্ণপাত করছেন না, এমনকি এডাব সম্পর্কে জানেন না। মনে মনে ভাবছিলাম এ কোথায় এসে পড়লাম! প্রসঙ্গক্রমে বিনয়ের সাথে জানতে চাইলাম গতকাল অধিকাংশ সংস্থা বিকাল ০৫ টার পর চিঠি পেয়েছে, এক রাতের প্রস্তুতিতে উপস্থিত হওয়া বা চিঠি দিয়ে প্রতিনিধি প্রেরণ কি করে সম্ভব! তিনি ভেংচি কেটে আমার কথাটি রিপিট করলেন, এমন অঙ্গভঙ্গি করলেন যা কোনো কালেও শুনতে বা দেখতে অভ্যস্ত নই।

আমি কিছু সময়ের জন্য ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলাম, আমাদের কষ্টে অর্জিত সৎ উপার্জনের বেতনের একটি সিংহভাগ অংশ ব্যক্তিগত কর দিই, যা হতে তাদের বেতন হয়, আমাদের থেকে বয়সে ছোট হবে এমন একজনের কাছ থেকে এ জাতীয় আচরণ। একজন জেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তার এ ঔদ্ধত্য আচরণের নালিশ দেব কার কাছে! রাস্তার পাশে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থেকেও যখন ঘাতক যানবাহন কেঁড়ে নেয় ফুলের মতো শিক্ষার্থীদের, নিজের সন্তানের কথা মনে করে সাংবাদিকতার পেশাদারিত্বের খোলস ছেড়ে চোখ ছল ছল নয়নে সংশ্লিষ্ট জন প্রতিনিধিকে প্রতিকারের উপায় নিয়ে যখন কথা বলেন, জনগণের সেবক হয়ে স্পর্শকাতর মর্মান্তিক মৃত্যু নিয়ে হাসি মুখে ব্যঙ্গ করে কথা বলেন। তা দেখে জ্ঞান অর্জনের ধ্যান ভেঙ্গে দেশের শ্রেষ্ঠ সব স্কুল, কলেজের মেধাবী শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়ক এর দাবীতে বিক্ষুদ্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পোষাক পরে সুশৃংখলভাবে প্লেকার্ড হাতে আন্দোলনরত, কোথাও ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিবাদ হিসাবে প্রতীকী যানবাহনের শৃংখলা আনয়ন, রাস্তা পরিস্কার, ফিটনেস ও কাগজপত্র যাচাই করতেও ওদের দেখা যায়, তাদের উপর নেমে আসে নির্মম নির্যাতন-নিপীড়ন, যা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে হার মানায়। এসব আদরের ধনের গায়ে হয়তো কোনোদিন ফুলের টোকাও পড়েনি। ক্ষণিকের জন্য মনে হয়েছিল কোমলমতি শিশুদের এ হাল হলে আমরাতো সেখানে নস্যি। এসব সাত-পাঁচ বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানের কথা চিন্তা করে শান্ত ছিলাম কিন্তু আর সম্ভব হলো না, ধৈয্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল। মনের অজান্তেই ক্ষেপে গিয়ে হুংকার দিয়েছিলাম, সাথে সাথে অনেক এনজিও প্রতিনিধি দাঁড়িয়ে টেবিল চাঁপড়ে প্রতিবাদ করায় তিনি মুহূর্তে ভোল পাল্টালেন, হৈ চৈ শুনে ডেপুটি কমিশনার (জেলা প্রশাসক) সভা কক্ষে আসলেন, একটু পরে আসলেন ঝিনাইদহ-১ আসনের সংসদ সদস্য। সভা পরিচালনাকারী মুহূর্তে তার রূপ পরিবর্তন করে বিনয়ের ডালি খুলে দিলেন, আচরণটা এমন ‘ভাঁজা মাছটি উল্টে খেতে জানেন না।’

সভা শেষে এনজিও এর গুরুজনেরা মীমাংসার উদ্যোগ নিলেন, আমাকে সরি বলতে বলেন। ‘আমি বললাম, কি আশ্চর্য! যে অপরাধ করবে, ভুল করবে সে সরি বলবে! আমি কেন সরি বলবো এ আবার কেমন উল্টো নিয়ম?’

এ কয়দিন কিছুতেই শান্তি পাচ্ছি না! সমাজটি যাচ্ছে কোথায়? দিন দিন সভ্যতার উন্নয়ন তো দূরের কথা সাধারণ নাগরিকদের আত্মসম্মান নিয়ে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে! আমার সোনার বাংলা ছেড়ে যাবো কোথায়? জনগণের সেবক হয়েছে প্রভূ, চাকর হয়েছে মনিব, রথ চলেছে উল্টো পথে জনগণের কি করার আছে?


এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP