বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» মুক্তমত »আমলাতন্ত্র ও বাকশাল
আমলাতন্ত্র ও বাকশাল

Thursday, 2 August, 2018 02:59pm  
A-
A+
আমলাতন্ত্র ও বাকশাল

আবু বকর সিদ্দিক
ঝিনাইদহ

বর্তমান সময়ে আমলাতন্ত্রের দৌরাত্ব বেড়ে গেছে। কার্যক্ষেত্রে তার প্রমাণ আমরা অগরহই পায়। এই দৌরাত্ব বেড়ে যাওয়ার কারণ সরকারের অতিমাত্রায় প্রশাসনের উপর নির্ভরতা। এখন সরকারী সকল প্রোগ্রাম আমলারাই বাস্তবায়ন করছে। রাজনৈতিক দল ও নেতাদের অংশগ্রহণ তাতে নেই বললেই চলে, যা আছে তাও সরকারী কাঠামোর মধ্যেই। জাতীয় কর্মসূচি পালনেও রাজনৈতিক দলগুলোর উৎসাহে যেনো ভাটা পড়েছে। আসলে বাস্তবতা হচ্ছে আমলাতন্ত্র সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো জনগণের মাথার উপর চেপে বসে আছে। তারা যাদের খাচ্ছে তাদেরই ভাঙ্গছে দাঁতের গোড়া। এ দৈত্য সরানো খুবই কাঠন কাজ। পৃথিবীর সব দেশেই এরা শক্তিমান। এমন কি সোভিয়েত ইউনিয়নের সোসালিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থায়ও এর অস্তিত্ব বিলুপ্ত করা যায়নি। সরকারের উঁচ্চ মহল থেকে প্রায়ই আমলাদের উদ্দেশ্যে বলা হয় জনগণকে সম্মান করতে এবং স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় তারা জনগণের সেবক, কিন্তু কে শোনে কার কথা? সরকার যদি তাদের উপর নির্ভরশীল হয় তাহলে কি তারা সরকারের উপদেশ কানে নেবে? নেয়নি, বরং উল্টো তারা জনগণের প্রভু সেজে বসে আছে। আচরণে তারা বৃটিশ আমলের জমিদারের মতো, মনোভাবে হালাকু খানের মতো।

স্বাধনতা পরবর্তী সময়ের স্বল্পকালীন সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান অনেক সংকটের মধ্যেও বুঝেছিলেন যে আমলাতন্ত্রও জাতির অগ্রগতির জন্য অন্যতম প্রধান অন্তরায়। তাই ২৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৫ সালে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার মানসে এবং দ্রুত অগ্রগতি তরান্বিত করতে বাকশাল গঠনের ঘোষণা দেন। এই বাকশাল কাঠামোতে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছিলো। যেখানে সকল মহকুমাকে জেলায় রূপান্তর করে একজন নির্বাচিত জেলা গভর্নরের অধীন প্রশাসনকে আনা হয়েছিলো। আর এ কাঠামো বাস্তবায়ন হলে যথার্থই আমলারা জনগণের সেবক হয়ে উঠতো। কিন্তু দেশী-বিদেশী চক্রান্তকারীরা দেশের উন্নয়নকে তরান্বিত হতে দেয়নি। তারা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনককে স্বপরিবারে হত্যা করে সে পথ রুদ্ধ করে দেয়। তাই আমলারাও রয়ে যায় বহাল তবিয়তে। বাকশাল কাঠামোতে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের জাতির জনকের ইচ্ছার প্রতিফলন দেখা যায় তাঁরই এক সাক্ষাতকারে, যার কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত করা হলো:

প্রশাসনিক কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রনালয়, কর্পোরেশন ও বিভাগগুলোর পূনর্বিন্যাস ও পূণর্গঠন তথা মাথাভারী প্রশাসনের উচ্ছেদ সাধন। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে জেলা গভর্ণর ও থানা প্রশাসনিক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে দেশের সকল মহকুমাকে জেলায় উন্নিত করা হয়েছে। প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘসূতিতার কারনে ইউনিয়ন পরিষদ, মহকুমা ও বিভাগীয় পরিষদকে তুলে দেওয়া হচ্ছে। জেলা ও থানাগুলো নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হবে। গ্রাম সমবায় পরিষদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে থানা পরিষদ গঠন করা হবে। তবে থানা পরিষদের প্রশাসক/ চেয়ারম্যান ও জেলা গভর্নর জনগনের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবে। থানা প্রশাসক / চেয়ারম্যানরা ও জেলা গভর্ণররা জনগন, স্ব স্ব পরিষদ ও প্রেসিডেন্টের কাছে দায়ি থাকবেন। গ্রাম সমবায় পরিষদ, থানা পরিষদ, জেলা পরিষদ- এর পরেই থাকবে জাতীয় সরকার। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে গনতান্ত্রিক প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে জাতীয় সরকারের প্রশাসনিক ক্ষমতাকে বিপুলভাবে বিকেন্দ্রিকরন করে প্রশাসনকে জনগনের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দেওয়ার ব্যাবস্থা নিয়েছি। প্রশাসনিক আমলাতান্ত্র, স্টিলফ্রেম গতানুগতিক বা টাইপড চরিত্রকে ভেঙ্গে গুড়ো গুড়ো করে দেওয়ার ব্যাবস্থা নিয়েছি। সরকারি কর্মচারিরা এখন জনগনের সেবক ।

পরিশেষে বলা যায় বঙ্গবন্ধুর মতো সাহসী ও জনদরদী নেতা যদি আবার কখনো এই দেশে জন্মায় তাহলেই কেবল আমলাতন্ত্রের বিলোপ সাধন সম্ভব হবে। আর তা যতদিন না হবে, ততদিন সিন্দাবাদের দৈত্য ঘাড় থেকে নামানো যাবে না কিছুতেই।


এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP