বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» মুক্তমত »ঘুরে এলাম দক্ষিণ ভারতঃ দ্বিতীয় পর্ব (কন্যাকুমারী)
ঘুরে এলাম দক্ষিণ ভারতঃ দ্বিতীয় পর্ব (কন্যাকুমারী)

Sunday, 15 July, 2018 08:19pm  
A-
A+
ঘুরে এলাম দক্ষিণ ভারতঃ দ্বিতীয় পর্ব (কন্যাকুমারী)
তারিকুল ইসলাম পলাশ
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী, 
এইড ফাউন্ডেশন।


উটি শহরটা পাহাড়ের উপর অবস্থিত বিধায় আভ্যন্তরীণ ট্রেন যোগাযোগ ছাড়া দূর পাল্লার নিয়মিত কোনো ট্রেন নেই। সব ধরনের গাড়ীও চলাচলের উপযোগী নয়। সরকারি বাসগুলোর উপরই মূলত নির্ভরতা। ভারতের ম্যাপের দক্ষিণতম একেবারে শেষবিন্দুতে তিন সাগরের মিলনক্ষেত্র কন্যাকুমারী ভ্রমণের টানে একটু সকালে উঠে বাড়ির মত লাল আটার রুটি ও সবজি দিয়ে নাস্তা সেরে পায়ে হেঁটে বাস স্ট্যান্ড খুঁজছি, পাহাড়ের রাস্তা ধরে নীচের দিকে যাচ্ছি। বেশ কিছুক্ষণ পরে বোঝা গেল দিক ভুল করে ফেলেছি। নামার সময় অনেক মজা পেয়েছিলাম কিন্তু উঠার সময় যায় যায় অবস্থা এ কারণে এখানে হয়তো পায়ে হেঁটে চলার প্রচলন কম। বিকাল ৫ টার কিছু পূর্বে শহরের বাইরের এলাকা দেখে হোটেল হতে ব্যাগ-ব্যাগেজ নিয়ে বাস টার্মিনালের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হলো।

বিকাল সাড়ে ৫ টায় কন্যাকুমারী যাওয়ার বাস মিললো। পৌঁছে দেবে সকাল সাড়ে ৮ টায়। ১৫ মিনিট আগেই বাসটি টার্মিনালে ঢুকলো। ব্যাগ-ব্যাগেজ গুছিয়ে বাসে উঠে বসে আছি আরো ৭ মিনিট সময় আছে। দীর্ঘ ভ্রমণের প্রস্তুতির জন্য কিছু কেনা কাটার প্রয়োজন ছিলো। বাসে তেমন যাত্রী নেই। নন এসি বাস, তবে বসার আসন অত্যাধুনিক, কাঠামো খুবই মজবুত। ড্রাইভার ও কন্ট্রাক্টরের খাকি ড্রেস। কন্ট্রাক্টরের ঘাড়ে শোভা পাচ্ছে ছেলে বেলায় দেখার ন্যায় চামড়ার ব্যাগ। সব ঢিলেঢালা ভাব দেখে পূর্ব অভিজ্ঞতায় মনে হলো বাসটি বিলম্বে ছাড়বে। মুক্ত গেলো কেনাকাটা সারতে। বিকাল ৫:৩০ ঝটপট ড্রাইভার ও কন্ট্রাক্টর গাড়ীতে উঠে পড়লো। সাথে সাথেই চলতে থাকলো বাসটি। কন্ট্রাক্টর বোঝে না ইংরেজি বা হিন্দি। ইতোমধ্যে বাসটি টার্মিনাল ছেড়ে মূল সড়কে উঠে পড়েছে। আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ড্রাইভারকে বিষয়টা বলতেই তিনি নির্বিকার, বাসের গতি কমিয়ে দিলেন তবে বাসটি থামালেন না, ভ্রমণের স্বাদ পরিপূর্ণ আহরণের জন্য করছি না ফোনের ব্যবহার, বকুলের ফোনে নেই চার্জ, ফলে মুক্তর সাথে যোগাযোগ বা একগাদা মালপত্র নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়বো তারও উপায় নেই। যখন উত্তেজনা চরমে, তখন বাসটি আস্তে আস্তে অন্য গেট দিয়ে আবার টার্মিনালে ঢুকে পড়লো। সম্ভবত এরা ট্রাফিক আইনের প্রতি অত্যন্ত সজাগ। বাসটি আবার সেই জায়গায় এসে পৌঁছাতেই হতভম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মুক্তর দেখা মিললো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় বাস কর্তৃপক্ষ বা যাত্রী কেউই এটা নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করলো না, যা অবিশ্বাস্য!

বাস আবার চলতে শুরু করলো। পাহাড় থেকে অনবরত নীচের দিকে নামছে তো নামছেই। হঠাৎ পাশের সিট থেকে একটি সুদর্শন যুবক আঞ্চলিক ভাষায় চেঁচামেচি শুরু করে দিলো। কন্ট্রাক্টর দৌঁড়ে এলেন, সেও তার কথা বুঝতে পারছে না। কাকে যেনো ফোনটা ধরিয়ে দিলো যুবকটি, কিছু সময় ঠান্ডা হয়ে বসলো। একটু পরে অস্থির হয়ে আমাদের কাছে ইশারায় কি যেনো বারবার চাচ্ছে, বুঝলাম সে হেরোইনে আসক্ত। সুপারভাইজারকে বলতেই তাকে ডেকে পথিমধ্যে নামিয়ে দিয়ে বাসটি চলতে শুরু করলো। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, পাহাড়ের খাজে খাজে আলো আঁধারীর খেলা। সে এক অপরূপ দৃশ্য। পাহাড় থেকে যতো নামছি তত শীতের তীব্রতা কমলেও বাসের জানালা খুলে রাখার মতো অবস্থা তখনো তৈরী হয়নি। কোথাও কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে তখন শীতের তীব্রতা আবার বেড়ে যাচ্ছে। এখানে প্রকৃতি ঘনঘন তার রূপ বদলায়।

বাসটি শহর থেকে বেরিয়ে একঘেয়েমি রাস্তায় প্রবেশ করতেই কখন যে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেছি তা খেয়াল করিনি। পথিমধ্যে একটি বড় শহরে খাবার বিরতির জন্য বাসটি দাঁড়ালো। দেখলাম স্ট্যান্ডের পাশে ড্রেনের উপর খাবারের একটি ভ্যানকে ঘিরে লোক সমাগম। তারা রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খাচ্ছে। আমরাও সেখান থেকে ওদের স্থানীয় খাবার গরম গরম দোষা ও ইডলি খেয়ে নিলাম। একটা বিষয় আমি বুঝতে পারছি না, দেশে এতো হিসাব-নিকাশ করে খাওয়া-দাওয়া চলাচল করি তবু গ্যাসের সমস্যা পিছু ছাড়ে না। কিন্তু এখানে তার উল্টো ঘটনা ঘটছে। কারণটি বোধগম্য নয়। বিরামহীন চলন্ত বাসে ঝিমুনির সাথে আধো ঘুম আধো জাগরণ চক্র পার করে ভোরে পৌঁছে গেলাম একটি মাঝারি গোছের শহরে। সেখান থেকে বাসটি হয়ে গেলো লোকাল। নানা ধরনের লোক উঠছে আর নামছে। স্কুল ড্রেস পরা শতশত শিক্ষার্থী স্কুলে যাচ্ছে তার মধ্যে মেয়েদের হার বেশি তবে কেনো এ অঞ্চলে বাল্য বিবাহের প্রচলন মাত্রাতিরিক্ত ( ছোট ছোট বাচ্চা মেয়েদের সিঁথিতে সিঁদুর দেখে অনুমেয়) তা বিস্ময়কর। এমন কি অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর বয়সের ব্যবধান চোখে পড়ার মতো। যথাসময়ে পৌঁছে গেলাম একটি ছিমছাম ছোট শহরে। সাগরের হালকা গর্জন কানে এলো। যাত্রী সবাই নেমে যাচ্ছে শুধু বসে আছি আমরা ৩ জন। পেছন থেকে নামার সময় একজন যাত্রী আমাদের উদ্দেশ্যে বললো এটাই লাস্ট স্টপেজ। আমরা প্রশস্ত ফুটপাতে নেমে পড়লাম, পা রাখলাম কন্যাকুমারীতে। শহরটি স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতিময় মনে হলো।

এক দালালের সহায়তায় মাঝারি দরের একটি হোটেল খুঁজে নিলাম। হোটেলের ব্যালকোনিতে বসে সূর্যোদয় ও সাগর দেখা যায়। এখানে বসেই অনুভব করা যায় এখানকার সাগরের বিশালতা, কানে আসে তার গর্জন। গোসল সেরে ছুটলাম নাস্তার উদ্দেশ্যে, পেয়ে গেলাম কোলকাতার এক বাঙালি রেস্টুরেন্ট। ভ্রমণের ঝক্কি ঝামেলা আর ভালো লাগছে না। হয়ে গেলো অনেক দিন, দ্রুত দেশে ফেরা দরকার। একটি ট্রাভেল অফিসে ঢুকে আক্কেলগুড়ুম। এখান থেকে কোলকাতায় যাবার ২/১ দিনের মধ্যে নেই কোনো সুব্যবস্থা। সপ্তাহে প্রতি শনিবারে একটি মাত্র ট্রেন। তাও যেতে সময় লাগবে ৪০ ঘন্টার উপরে। আশপাশে নেই কোনো বিমান বন্দর। ৪ ঘন্টা বাস জার্নির পর তিরুবল্লুব (রাজ্যের রাজধানী) শহর হতে সন্ধ্যায় মিলবে উড়োজাহাজ। তা আবার চেন্নাই বিমান বন্দরে ৫ ঘন্টা ট্রানজিট হয়ে ভোর বেলায় পৌঁছে দেবে কোলকাতায়। তবে ভাড়া সহনীয় মাত্রায়। এসেই আর ছুটতে ইচ্ছে হলো না, একরাত পরিপূর্ণ বিশ্রাম প্রয়োজন সকলের সুস্থতার জন্য।

শহরের সব কেন্দ্র হতে দেখা যায় সাগরের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা দেবী কুমারীর মন্দির (কুমারী আম্মান), বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়াল, গান্ধী মন্ডপম্ (মহাত্মা গান্ধীর চিতাভস্ম বিসর্জনের পূর্বে এখানে রাখা হয়েছিল) ও খ্রিস্টপূর্বের প্রাচীন তামিল কবি তিরুবল্লুব এর ১৩৩ ফুট উচু মূর্তি, যা আমাদেরকে চুম্বকের মতো টানছে। কোলকাতায় যাবার ব্যবস্থা পরে হবে ভেবে হাঁটা ধরলাম স্থাপনা দুটির কাউন্টারের পানে। সমুদ্রের তীরে ছোট ছোট জাহাজ ও ডিঙ্গি নৌকা নোঙ্গর করা। অল্প একটু দূরে মন্দির। সবাইকে লাইফ জ্যাকেট পরতে হচ্ছে। কেনো এতো নিরাপত্তা বোধগম্য নয়। জায়গাটা যদি এতোই ঝুঁকিপূর্ণ হয় তাহলে এতোগুলো স্থাপনাই বা সাগরের মাঝে তৈরী হলো কি করে? এতো আগে স্বামী বিবেকানন্দই বা ধ্যানের উদ্দেশ্যে এখানে পৌঁছালেন কি করে? স্থাপনাগুলি অপরূপ সুন্দর। একটি বিষয়ে আশ্চর্য হয়ে গেলাম, আমার ধারণা ছিলো সাগর পারের হাওয়া গরম হয় কিন্তু এই ভর দুপুরে তিন সাগরের সঙ্গমস্থলে হীমশীতল বাতাস। একটি জায়গা মন্দিরের মতো, সেখানে দেবীর পায়ের ছাপে পূঁজা দেয়া হচ্ছে পরম ভক্তিতে। অবগত হলাম আজও এ মন্দিরে পার্বতী কুমারীরূপে শিবের জন্য প্রতীক্ষা করছেন। এটা জেনেই মূলত স্বামী বিবেকানন্দ এখানে ধ্যানে বসেন। তারপর আমেরিকার শিকাগো ও জাপানে তার সেই বিখ্যাত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। মজার বিষয় হচ্ছে এর খুব নিকটেই শ্রীলঙ্কার অবস্থান, আর বেহেস্ত হতে আদম (আঃ) প্রথম এসে পড়েছিলেন এই শ্রীলঙ্কাতেই। এমনি একটি পাহাড়ের উপর তার পদচিহ্ন বিরাজমান। আসলে বিধাতা বা প্রকৃতির লীলাখেলা বোঝা ভার।

মন্দিরের থেকেও উঁচু নির্মিত একটি স্থাপনার মাঝে স্বামী বিবেকানন্দের ব্রোঞ্জের অবয়বে দাঁড়ানো বিশাল মূর্তি। তার মূর্তিতে পরম শ্রদ্ধায় অনেকে পূঁজা দিচ্ছে। স্থাপনার নানা জায়গায় স্বামীজীর উদ্ধৃতি, বক্তব্য ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়েছে; যা দেখে আমি অভিভূত হয়ে আরো বেশি আগ্রহী হয়ে উঠলাম তার প্রতি এবং অবগত হলাম সন্নিকটেই আছে তার নামে নির্মিত বিশাল আশ্রম। সেটা অনাথদের আশ্রয়স্থল। এখানে শিক্ষণীয় অনেক কিছু আছে। বিশাল কর্মযজ্ঞের পুরোটাই চলে সাধারণ মানুষের দানে।

এটি ঘুরে চলে গেলাম সাথে লাগোয়া কবির স্থাপনাটি দেখতে জাহাজে চড়ে। এখানে তেমন একটা ভীড় নেই। তবে কবির লেখা পড়ে বিস্মিত হলাম। খ্রিস্টপূর্বে জন্ম নেওয়া স্থানীয় একজন কবির লেখা এতো সমৃদ্ধ, তাহলে তখনকার শিল্প সাহিত্য কতো সমৃদ্ধ ছিলো তা সহজেই অনুমেয়। তবে স্থাপনাটি নির্মাণে সম্ভবত কোনো কারিগরি ত্রুটি ছিলো। কারণ দেয়াল মেঝে সবই কেমন যেনো ঘেমে আছে। কিছু জায়গা ঘন অন্ধকারে ঢাকা। ওখান থেকে বেরিয়ে সাগর পাড়ে নির্মিত অসংখ পুরাতন মন্দির ও স্থাপনা দর্শন করে আমরা চলছি একটা সুউঁচ্চ টাওয়ারের দিকে, সেখান থেকে তিন সাগরের মিলনমেলা পরিপূর্ণ ভাবে দেখা যায়; দেখা মেলে এক এক সাগরের পানির রং এক এক রকম, কিন্তু একই সাথে বহমান হলেও সক্রিয়তা হারায়নি কেউ, যা অবিশ্বাস্য। আসলেই অপরূপ! এ অঞ্চলে প্রচুর মন্দিরের সাথে গীর্জার উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। সংখ্যার দিক থেকে মুসলিমের অবস্থান দ্বিতীয় হলেও সে তুলনায় মসজিদ চোখে পড়েনি, তবে প্রায় জায়গায় সময় হলে কান পাতলে আযানের ধ্বনি শোনা যায়।

বকুলের পেটের পীড়ার কারণে কিছু সময়ের জন্য হোটেলে ফিরতে হলো, সমস্যাটা মনে হয় জটিল আকার ধারণ করছে। এদিকে নগদ টাকা প্রায় ফুরিয়ে আসছে। এ অঞ্চলে মাস্টার কার্ডের তেমন প্রচলন নেই। সব মিলিয়ে এক অস্বস্থিকর অবস্থা। বিকেলে আবার ঘুরতে বেরোনো হলো। ট্রাভেল এজেন্ট অফিসে গিয়ে সকালের সে টিকিট আর মিললো না। কোথাও এক দিনের মধ্যে ফেরার কোনো বন্দোবস্ত নেই। এদিকে সূর্যাস্ত দেখার সময় চলে যাচ্ছে। একটি ট্যাক্সিক্যাব নিয়ে ছোটা হলো সেদিকে। প্রচুর লোক সমাগম, টিলার মতো বিশাল বিশাল পাথরে সাগরের ঢেউ এসে বাড়ি খেয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে দর্শনার্থীদের। ভারতের পশ্চিম উপকূল ধরে প্রসারিত পশ্চিমঘাট পর্বতমালা এলাচ পর্বতশ্রেণির অংশের দক্ষিণতম প্রান্তের অংশ এই অঞ্চলটি বিধায় এখানের সাগর তীরে বড় বড় পাথর। সেসব টিলা পাথরের উপর দাঁড়িয়েও সাগরের মধ্যে সূর্যাস্ত দেখা গেলো না, সূর্য সাগর পাড়ের গাছপালার মধ্যে হারিয়ে গেলো। তবে তার শেষ রশ্মি রক্তিম আভা ছড়িয়ে সাগর জলে ও নীল আকাশে এক অপরূপ দৃশ্যের সৃষ্টি করলো যা বর্ণনার ভাষা আমার জানা নেই। ফিরে এলাম শহরে। কোলকাতা যাবার তেমন কোনো সুব্যবস্থা হচ্ছে না। বকুল বিশ্বকাপ খেলা ও টয়লেটের টানে হোটেল পানে ছুটে চললো। আমি ও মুক্ত ট্যাক্সি নিয়ে শহর থেকে একটু দূরে ঘুরতে গেলাম।

ট্যাক্সি ড্রাইভারের সহায়তায় একটি ট্রাভেল এজেন্টের সন্ধান পাওয়া গেলো। সন্ধ্যার এসি স্লিপার বাস ধরে চেন্নাই পৌঁছে দেবে সকাল ৮ টায়। আর সকাল ১১ টার উড়োজাহাজ ধরলে আড়াই ঘন্টার আকাশ জার্নিতে পৌঁছানো যাবে কোলকাতায়। সব ঠিকঠাক করা হলো কিন্তু ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। আমাদের কাছে সব মিলিয়েও বিলের অর্ধেক নগদ টাকা নেই। অনেক বিকল্প রাস্তা দেখানো হলো ম্যানেজারকে। তিনি অনেকটা রাজীও হলেন কিন্তু মালিকের শরণাপন্ন হতেই তিনি সব সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিয়ে বললেন সব টাকা নগদে হাতে পেলেই আমরা বুকিং দিব, নাহলে নয়। বকুল তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বিরক্ত হয়ে হোটেলে চলে গেলো। আমি ও মুক্ত খুঁজতে থাকলাম বিকল্প উৎস। নিরাশ হয়ে হোটেলের পাশে এক বাঙালি রেস্টুরেন্টে খাবার খেয়ে রুমে গিয়ে মনের দুঃখে তিন সাগরের মিলন মেলায় সূর্যোদয় দেখার বাসনা নিয়ে একটু আগেভাগেই বিছানায় গেলাম, বারান্দায় ওদের ফেরার পরিকল্পনা শুনতে শুনতে আধোঘুম আধো জাগরণের মাঝে কখন যে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেছি খেয়াল নেই। শেষ রাতে এমনিতেই ঘুম ভেঙ্গে গেলো। ঝুল বারান্দায় এসে বসলাম। রাতের জমাট অন্ধকার অল্প অল্প করে ফিঁকে হচ্ছে। সাগরের জল খেলা করছে আপন মহিমায়। রুমের মধ্যে এসি চলছে, বাইরের বারান্দা তার থেকেও শীতল। ওরা দুজন বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। রুমের এসি বন্ধ করে ফ্যান চালিয়ে জানালা দরজা খুলে বারান্দায় বসলাম। সূর্যোদয় হতে এখনো এক ঘন্টা বাকী। সাগরের দিকে এক দৃষ্টিতে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে আছি, ক্ষণে ক্ষণে প্রকৃতির পরিবর্তন হচ্ছে। ধীরে ধীরে আড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে উঠছে সব। মন্দিরের চারদিকের সীমানা লাইট ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। একটু পরে সীমানা লাইট নীভে রং-বেরং এর অসংখ্য আলোতে জ্বলে উঠলো মন্দির ও পাশের মূর্তিটি। সাগর পারে ফিরে আসছে ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকা। আশপাশের বাড়ী ও রুমগুলোতে জ্বলে উঠছে আলো। শান্ত সাগর ও তার পাড় ধীরে ধীরে চঞ্চল হয়ে উঠছে। সূর্যোদয়ের সময় হলো প্রায়। সাগরের কূলে পানির ভেতরে বাঁধ দিয়ে বেশ খানিকটা রাস্তা তৈরী হয়েছে সূর্যোদয় দেখার জন্য, সেখানে অনেক লোকের ভীড় জমে আছে। ডেকে তুললাম ভ্রমণ সঙ্গীদের। কিন্তু কিছুটা মেঘের কারণে সূর্যোদয়ের সেই পরিচিত রূপ দেখা হলো না।

বকুল, মুক্ত রাতেই অনলাইনে বিমানের টিকিট বুকিং ও মাস্টার কার্ডে বিল দেবার প্রাথমিক ব্যবস্থা করেছে, আমার অনুমতির অপেক্ষায়। সন্ধ্যা ৭-৩০ মিনিটে চেন্নাই টু কোলকাতা। বকুল আর মুক্ত দেশ থেকে আনা চিড়ে ভিজিয়ে সকালের নাস্তা সারলো। বাসীমুখে আমার মিস্টি খেতে ইচ্ছা হয় না। পাশে এক বাঙালী হোটেলে একাই গেলাম। গরম গরম লুচি আর ঘন্ট দিয়ে তৃপ্তি সহকারে নাস্তা সারলাম। খুশি হয়ে বয়কে টিপস দিতে গেলাম, অবাক বিস্ময়ে সে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। মনে হলো ও অপমানিত হচ্ছে। আমি কথা ঘুরিয়ে নিয়ে বললাম আমি কোনো দোকানে টিস্যু পাচ্ছিনা তুমি কি ১০ টাকার বিনিময়ে আমার কিছু টিস্যু দেবে? সে খুশি মনে বললো, ‘নাগেরকইলে (২২ কিলোমিটার দূরে জেলা শহর) ছাড়া পাবে না’; প্রায় হাফ ব্যাগ টিস্যু ছেলেটি আমার হাতে ধরিয়ে দিলো।

সকালে হোটেল ছেড়ে ব্যাগ-ব্যাগেজ কাউন্টারে রেখে চেন্নাই যাওয়ার বাস খুঁজতে থাকি। যেহেতু নগদ টাকা সংকট সেহেতু ট্রাভেল এজেন্টকে কমিশন না দিয়ে নিজেরাই সরাসরি টিকিট কেনার জন্য ঘুরছি। একটি ট্যাক্সি ক্যাবের সহায়তায় পৌঁছে গেলাম বাস টার্মিনালে সেখানে নাই কোনো এসি বাস। উটি থেকে যেমন ধরনের বাসে এসেছি তেমন ধরনের বাস পাওয়া যাবে বললো। কেনো জানি আমার মন সায় দিচ্ছে না। তারপর নগদ অর্থ সংকটের ফাঁদে পড়ে বাধ্য হয়ে সুলভ মূল্যে কাটতে হলো সরকারি বাসের টিকিট, টিকিটতো নয় যেনো এক পৃষ্ঠা ভর্তি ফর্দ।

বকুলকে ডাক্তার দেখাতে হবে, স্বামী বিবেকানন্দের আশ্রমে নিশ্চয় মিলবে সে আশায় ছুটলাম সেদিকে, পেলাম চিকিৎসালয়; কিন্তু সেটা খোলা হয় ভোরে ও বিকালে। পাশের ছোট এক দোকানের এক বুড়িমার কাছ থেকে ঘোল খেয়ে বাইরে গেলাম হাসপাতালের সন্ধানে। ডাক্তার দেখিয়ে এক গাদা ঔষধ নিয়ে আবার ফিরে চললাম আশ্রমের উদ্দেশ্যে। এই অঞ্চলেও প্রচুর তাল, নারিকেল, নিম ও তেঁতুল গাছ চোখে পড়লো। ওদের সকল খাবারের মধ্যেই নারিকেল ও টকের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। একটি সুবিশাল বট গাছের নীচে অনেক ডাব নিয়ে একটি লোক বসে আছে। অনুভব করলাম বটের শীতল ছায়ার মতো প্রশান্তি আর কোনো ছায়াতেই নেই। চোখ বুজে আসছিলো। ওখানে কিছু সময় বসে ডাব খেয়ে ঢুকে পড়লাম আবার আশ্রমে। ইনফরমেশন সেন্টার থেকে তথ্য নিয়ে ভেতরে প্রয়োজনীয় কিছু দরকারী কাজ সারা হলো। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, অন লাইনে বিমানের টিকিট বুকিং এর প্রিন্ট কপি। দেখে আমি অভিভূত হলাম কি নেই এখানে? ব্যাংক, পোস্ট অফিস, রেস্টুরেন্ট, থাকার জায়গা, কম দামে খাবার ব্যবস্থা সবই বিদ্যমান। খাবার উদ্দেশ্যে ঢুকলাম বিশাল হলরুমের মতো ডাইনিং এ। দুই-তিন শত লোক এক সাথে অনায়াসে খেতে পারে এখানে। আমরা বসে গেলাম বেঞ্চ টাইপের মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরী একটি আসনে। ভাত খাবার কথা শুনে সামনে দিয়ে গেলো পরিস্কার চকচকে কলার পাতা। অল্প টাকায় তৃপ্তি সহকারে চমৎকার নিরামিষ সাথে পাপড় ও পায়েস খেয়ে বিশ্রামের একটি জায়গা খুঁজছি। অনেক জায়গা কিন্তু কোথাও সুবিধা হচ্ছে না। হাঁটতে থাকলাম সাগরের দিকে। একটি বিশাল তেঁতুল গাছের নীচে রাস্তার মাটি ঠেকাবার নীচু একটি গাইড ওয়াল চোখে পড়লো। ওখানে বসতেই ঘুমের ঝিম আসলো। একজন শ্রমিক শ্রেণির মানুষ আমাদের থেকে একটু দূরে শীতল ছায়ায় বসে দ্রুত বিড়ি ফুঁকে নিলো (এ অঞ্চলে ধুমপান তেমন চোখ পড়ে না)। ওখানে রাখা ছোট ছোট কাঠের টুকরার উপর একটি গামছা মাথার নীচে নিয়ে শুয়ে পড়লো। আমার ইচ্ছা হলো ওখানে ওভাবে শুতে। কিন্তু সাথী দু’জন রাজী হলো না। অগত্যা হাঁটতে হাঁটতে ফিরে এলাম স্বামী বিবেকানন্দের সংগ্রহশালায়। ততক্ষণে সংগ্রহশালা ও মন্দিরটি বন্ধ হয়ে গেছে। বিকাল ৪ টায় খুলবে। চারদিকে প্রশস্ত বারান্দা হু হু করে দক্ষিণা বাতাস আসছে, একটু দূরে পরিচ্ছন্ন বাথরুমের স্থান, আমরা বিশ্রামের জন্য ওখানেই আস্তানা গাড়লাম, মুক্ত ঘুমিয়ে পড়লো। ৪ টা বাজতেই গুছিয়ে উঠে পড়ি। সামনে স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু নার্সারীতে ঢুকে বেশ কিছু বিরল প্রজাতির গাছের বীজ সংগ্রহ করলাম। কিন্তু ম্যানেজার টাকা ভাঙ্গিয়ে আমাকে দেড়শ টাকা বেশী দেন। তিনি ইংরেজি ভালো বোঝেন না তাই অনেক সময় লাগলো বিষয়টি তাকে বোঝাতে। তারপর হোটেল থেকে ব্যাগ-ব্যাগেজ নিয়ে ছুটলাম বাস স্ট্যান্ডের দিকে। বাস ১৫ মিনিট লেটে। যথারীতি বাসে উঠলাম, কিন্তু এটি পূর্বের বাসটির মতো নয়; অনেকটা লক্কর ঝক্কর টাইপের। সারা পথ লোকালের মতো থেমে থেমে পথচলা শুরু করলো। গরম, ধুলাবালি এক অস্বস্থিকর অবস্থা। অবর্ণনীয় কষ্ট, দুরাবস্থা পার করে বিভিন্ন স্থানে লম্বা বিরতি দিয়ে সকাল সাড়ে ৮ টার স্থলে দুপুর ১২ টায় এসে পৌঁছালাম চেন্নাই কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে।

তীব্র গরম, দাঁড়িয়ে থাকা দায়। সবার মেজাজ খারাপ, কারো কথা কেউ সহ্য করতে পারছে না। এর মাঝে সিদ্ধান্ত হলো, চেন্নাই এর প্রাচীন মন্দির কাপালেশ্বর পরিদর্শন, ওখানে সময় কাটানো বিশ্রাম ও পরিচ্ছন্নতার কাজ এক সাথে সারার মানসে। ১৮ কিলোমিটার পথ টেম্পুতে পাড়ি দিয়ে রাস্তার দু’ধারের অনেক সুন্দর সুন্দর দৃশ্য দেখতে দেখতে পৌঁছে দেখি মন্দিরটি বন্ধ। খুলবে বিকাল ৪ টায়। মন্দিরের সেবকদের কাছে অবগত হলাম ১৮৯৪ সালে মন্দিরটি তৈরি হয় কৌজাবাদ জেলার সহকারি কমিশনার কনৌজলাল স্বপ্ন দেখেন তাঁর মামার বাড়ির কাছে জঙ্গলে শিব লিঙ্গ রয়েছে তাতে কোনো এক রাখাল খুরপি দিয়ে আঘাত করছে ফলে সেখান হতে রক্ত বেরোচ্ছে। পরের দিন হাজির হয়ে দেখেন একটি পাথর হতে রক্ত পড়ছে, সেখানে খোড়া হলে বেরিয়ে আসে শিব লিঙ্গ যার সঙ্গে মাজারও ছিল। তিনি এর শেষ দেখতে চেয়েছিলেন কিন্তু তার শেষ না পেয়ে ওখানেই মন্দির তৈরি করেন। সেই থেকে ওখানে একসঙ্গে শিবের পূজা ও মাজারে আরাধনা চলে আসছে। উভয় ধর্মের মানুষ পূজা ও পীরের আরাধনা যৌথভাবে পালন করে। পাশে সাগর চোখে পড়তেই মনটা আনন্দে লাফিয়ে উঠলো। কিন্তু সাগরের দিকে এগুতে যেয়ে আগুনের গোলার ন্যায় গনগনে বাতাস ধেয়ে আসলো। আশ্রয় নিলাম একটি বাড়ীর সামনের গাছের তলায়। আশপাশে নেই কোনো হোটেল, মোটেল বা বাথরুমের ব্যবস্থা। ক্ষুধায় আমার অবস্থা কাহিল। বকুলের জরুরী প্রয়োজন টয়লেট। প্রয়োজন মেটাতে একটি ছোট্ট হোটেলের সামনে ডেকের মধ্যে দেখি গরম খিঁচুড়ি। মাংশের মতো সয়াবিন দিয়ে তৈরী খিঁচুড়ি ২০ টাকার হাফ প্লেট গোগ্রাসে খেয়ে ফেললাম। বকুল তখনো খুঁজে বেড়াচ্ছে টয়লেট, খিঁচুড়ি খাবার ইচ্ছা নেই তার। ব্যাগ-ব্যাগেজ পাহারারত মুক্তর জন্য ফুল প্লেট খিঁচুড়ি ত্রিশ টাকায় পার্সেল নিয়ে দিতেই ওর ভাষাতে ‘মেরে দিলাম’ বলে দাড়িয়েই সাবাড় করে ফেললো তারপর সবাই মিলে একটুখানি স্বস্তির আশায় ছুটলাম চেন্নাই বিমান বন্দরের পানে। লাউঞ্চে অনেকক্ষণ বসে থাকার মাঝে দেখলাম অনেক কিছু। একজন হাবিলদার প্রশিক্ষিত একটা সারমেয় নিয়ে টহল দেয়া, নব দম্পতির মান-অভিমান ও মান ভাঙ্গানোর পালা, অবসর প্রাপ্ত পৌঢ়-পৌঢ়ার একে অপরের প্রতি মমত্ববোধ। ক্লান্ত রোগীর চোখে মুখে প্রশান্তির ঝিলিক, পথ ভুলে যাওয়া পথিকের পথের দিশা খুঁজে দেওয়া, ইত্যাদি ইত্যাদি... ইতোমধ্যে বকুল ফুলবাবু সেজে ফুরফুরে মেজাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

বোর্ডিং এরিয়া পার হতেই চারদিকে বাংলা কথা কানে প্রশান্তি এনে দিলো। তার মধ্যে পেয়ে গেলাম ঝিনাইদহের পরিচিত দুই জনকে। দমদম বিমান বন্দরে পৌঁছে সামনে দেখি সারি সারি ট্যাক্সি, ডাকতেই একজন দেখিয়ে দিলো একটি টিকিট কাউন্টার। এখানে ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ। একজন ড্রাইভারের সাথে কথা বললাম, তিনি সামনে এগোতে বললেন। ধরে নিলাম টিকিট কাউন্টার পার হয়ে যেতে বলছে। এগিয়ে গিয়ে দেখি আরো একটি কাউন্টার। একজন বৃদ্ধা পাঁচশ টাকার নোট নিয়ে টিকিট কাটার আকুতি করছে, কিন্তু ভাঙ্গিয়ে দিচ্ছে না। তার সন্তান অসুস্থ্য বলে বার বার অনুনয়-বিনয় করছে। আমি মানিব্যাগে হাত দিয়ে ভাঙ্গিয়ে দেবার চেষ্টা করি, কিন্তু খুচরা টাকা না থাকায় কাউন্টার মাস্টারকে অনুরোধের প্রেক্ষিতে তিনি ব্যবস্থা নেন। কিন্তু কাউন্টার মাস্টার সবাইকে ১০ টাকা করে কম দিচ্ছিলেন। সেই ভদ্র মহিলা ও তার স্বামী অতিরিক্ত ১০ টাকা করে নেয়ার ফলে ঝগড়া শুরু করে দেন। তার সন্তানের অসুস্থতার কথা বিবেচনা করে আর আমাদের বিলম্ব হচ্ছে বিধায় আমি বলি-‘ছাড়–নতো’। ভদ্র মহিলাটি আমার চোখে চোখ রেখে শান্তভাবে বললেন ‘তুমি কি ওদের দলের লোক?’ আমিতো কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

অনেকদিন পর বিহারীদের রেস্টুরেন্টে আমিষ খেয়ে খান সাহেবের হোটেলে নিশি যাপনের ব্যবস্থা হলো। সকাল ১১ টায় বাসের টিকিট কাটতে গিয়ে দেখি দুপুর সাড়ে ১২টার পরে কোনো গাড়ী নেই। কিন্তু ভ্রমণ সঙ্গীদের কিনতে হবে অনেক কিছু না হলে বাড়ী ওঠা দায়। ছুটলাম নিউ মার্কেটের দিকে। মুহূর্তেই দুজনের ঝোলা ভর্তি হয়ে গেলো। তারপর পড়িমরি করে বাস ধরে ফিরে এলাম দেশে।


এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP