বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» মুক্তমত »আওয়ামী লীগ নেতাদের ভারত সফর
আওয়ামী লীগ নেতাদের ভারত সফর

Wednesday, 2 May, 2018 08:56am  
A-
A+
আওয়ামী লীগ নেতাদের ভারত সফর
গৌতম লাহিড়ী : অধুনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম সর্বাধিক আলোচিত বিষয় আওয়ামী লীগ দলের এক উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক প্রতিনিধি দলের ভারত সফর। এ সফর নিয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে বহু মন্তব্য করা হচ্ছে। এ বিতর্কের মধ্যে সফরের মূল অন্তনির্হিত বার্তাটি গুরুত্ব পাচ্ছে না। কী সেই বার্তা? সাংবাদিকতার পেশাগত কারণে সফরকারী দলের প্রতিটি মুহূর্ত অনুসরণ করার চেষ্টা করেছি। মূল বিষয়টি হলো, দুই প্রতিবেশী দেশের শাসক দলের মধ্যে বার্তালাপ। নিঃসন্দেহে ভারত শাসক বিজেপি দলের সঙ্গে বাংলাদেশের শাসক আওয়ামী লীগের 'পার্টি-টু-পার্টি' বা দলগত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং সুদৃঢ় করে তোলা। তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরকারী প্রতিনিধিদের সঙ্গে আন্তরিক বৈঠক।

এই সফরের সময় অনেকটা কাকতালীয়ভাবেই এমন সময় নির্ধারিত হয়েছে, যখন বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন আসন্ন। স্বাভাবিকভাবেই এমন একটা ধারণা তৈরি করা হচ্ছে যে, এ সফরের সঙ্গে নির্বাচনের কোনো যোগসাজশ রয়েছে। আদতে এই সফরে নির্বাচন প্রসঙ্গে যে কোনো আলোচনাই হয়নি, তা বোঝানো দুস্কর হয়ে উঠেছে। ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ধারাবাহিক ইতিহাস দেখলেই বোঝা যায়, যখনই আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকার ক্ষমতায় এসেছে, তখনই এ সম্পর্ক উন্নত হয়েছে। বিগত নয় বছরে এই সম্পর্ক বহুমুখী বিস্তৃতি লাভ করেছে। যাতে উভয় দেশেরই লাভ হয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় সম্পর্কে ভাটা না পড়লেও এমন কিছু ঘটনা ঘটে গেছে, যাতে ভারতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিএনপি সরকার সম্পর্কে একটা অনাস্থা মনোভাব রয়ে গেছে। যদিও পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়া এই সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা করেছেন; কিন্তু সেই দক্ষিণপন্থিদের চাপে পড়ে তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাৎকার চেয়েও দেখা করতে যাননি। ভারতে কংগ্রেস বা বিজেপি যে দলেরই সরকার থাকুক, তারা কিন্তু দেশের প্রথম নাগরিকের প্রতি অপমান কোনোদিনই ভুলবে না। এটাও একটা বিএনপি সম্পর্কে অনাস্থার কারণ।

যদি কোনো দল মনে করে, আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলকে লাল কার্পেট দিয়ে স্বাগত জানানোর অর্থই নির্বাচনে সাহায্য করা, তাহলে অত্যন্ত জলবৎ তরলং সরলীকরণ করা হবে। সেই যুক্তিতে ধরে নিতেই হয়, যখন বিএনপি বাংলাদেশে ক্ষমতায় এসেছিল, তখন কি ভারতের কোনো হাত ছিল, নাকি বাংলাদেশের জনতা যাকে ক্ষমতায় দেখতে চেয়েছিল, তাকেই জয়ী করে? এই প্রতিবেদক সেই সময় নির্বাচন কভারেজ করতে গিয়ে দেখেছিলেন, খালেদা জিয়া জনপ্রিয় নেত্রী। সেই জনপ্রিয়তা এখন যদি না থাকে, তাহলে সেটা অন্য প্রতিবেশী দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কি সঠিক? বরং প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক নয় কি, বিগত নির্বাচন কোনো কোনো রাষ্ট্রের প্ররোচনায় বিএনপি ভোট বয়কট করেছিল কি? তাদের ধারণা ছিল, ওইসব দেশ নির্বাচনের পরে আওয়ামী লীগ সরকারকে স্বীকৃতি দেবে না। বরং দেখা গেল, শেখ হাসিনার শপথ গ্রহণের দিনেই তারা প্রথম সারির আসনে স্থান গ্রহণ করলেন। অনেক দেশ হয়তো নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা করেছে; কিন্তু কেউ কি মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে? না। আজ বাংলাদেশে আর্থিক বৃদ্ধির কারণে যে ক্রয়ক্ষমতা সৃষ্টি হয়েছে, তাতে বিশ্বের প্রায় সব দেশই ঝাঁপিয়ে পড়ছে লগ্নি-বিনিয়োগের জন্য। চিন্তা করুন, আজ থেকে দশ বছর আগে ভারত ও বাংলাদেশের টাকা-রুপির যে বিনিময় মূল্য ছিল, আজ তাই কি আছে! বরং ধীরে ধীরে সেই ব্যবধান কমছে নাকি?

আওয়ামী লীগ দলের সঙ্গে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের যে সম্পর্ক রয়েছে, তার ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কংগ্রেস দলের ইন্দিরা গান্ধী। কিন্তু কংগ্রেস দলকে পরাস্ত করে ভারতে যখন অটল বিহারি বাজপেয়ির নেতৃত্বে প্রথম বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন কি বিএনপির সঙ্গে ভারত সরকারের সুমধুর সম্পর্ক ছিল? না। কারণ ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একটা ধারাবাহিকতা রয়েছে। সরকারের রঙ বদল হয়, কিন্তু দেশের সার্বিক স্বার্থে পররাষ্ট্রনীতির বদল হয় না। সেই সময় বিএনপি বিজেপি দলের আস্থা অর্জন করতে পারেনি।

ভারতে ক্ষমতায় বিজেপি সরকার এবং একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে এনডিএ সরকার। সেই দলের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখাটা আওয়ামী লীগের রণনীতির ভুল বলেই প্রতিপন্ন হতো। সড়ক ও সেতুমন্ত্রী তথা দলের সেক্রেটারি জেনারেল ওবায়দুল কাদেরের এটা নিঃসন্দেহে কৃতিত্বের বিষয় হলো, তিনি বিজেপি দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে আওয়ামী লীগের বার্তা পৌঁছে দিতে পেরেছেন। তার সঙ্গে সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির, আবদুল হানিফসহ আরও ১৫ জন সিনিয়র নেতা। তারা এসেছিলেন বিজেপির সাধারণ সম্পাদক রাম মাধবের আমন্ত্রণে। প্রটোকল অনুযায়ী তার বৈঠক হওয়ার কথা সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে। সেখানে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহর সঙ্গে কেন দেখা হলো না, এই প্রশ্ন অবান্তর। দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্যস্ততার মধ্যেও কেবল বৈঠকের জন্য সময় দিয়েছেন। বৈঠকে কে ছিলেন? প্রধানমন্ত্রী মোদি চীনে গিয়ে যেসব পদস্থ অফিসারকে নিয়ে বৈঠক করলেন, তারাই ছিলেন ওবায়দুল কাদেরের বৈঠকে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল, পররাষ্ট্র সচিব বিজয় কেশব গোখলে, প্রধানমন্ত্রীর সচিব সাবেক মুখপাত্র গোপাল বাঘলে আর বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী। এই বৈঠকে সাধারণ রাজনীতির বাইরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নত করা নিয়েই আলোচনা হয়েছে। ভারতের সরকারি সূত্র জানিয়েছে, ওই বৈঠকে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া নিয়ে কোনো কথা হয়নি। এমনকি আওয়ামী লীগ দেশের মধ্যে প্রতিদিন বিএনপির সমালোচনা করলেও প্রধানমন্ত্রী মোদি বা অন্য বৈঠকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয় উত্থাপন হয়নি। 

ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকরব সফরকারী দলের জন্য লে মেরিডিয়ান হোটেলে আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে প্রকাশ্যেই আলোচনা করেছেন। তিনিও পরে জানিয়েছেন, এই আলোচনায় বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং আওয়ামী লীগ দলের সঙ্গে বিজেপির সম্পর্ক নিবিড় করা নিয়েই আলোচনা হয়েছে। জনতার সঙ্গে জনতার সম্পর্ক তৈরি করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে বিজেপির একটি প্রতিনিধি দল ফিরতি সফরে ঢাকা যাবে। এটাও ঠিক যে, আওয়ামী লীগের নেতারা বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষাগুলো বিজেপি নেতাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। একদিকে রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা সমাধানের জন্য ভারতের সক্রিয় হওয়ার আগ্রহ যেমন করেছেন, তেমনি অমীমাংসিত তিস্তা পানি চুক্তি দ্রুত সমাধানেরও আগ্রহ জানিয়েছেন। ওবায়দুল কাদের ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী সুরেশ প্রভুর বাসভবনে নৈশভোজের ব্যাংকোয়েট ভাষণে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে তিস্তা চুক্তি সম্পাদনের আগ্রহ জানিয়েছেন। বিজেপি নেতারা তাতে সম্মতিও দেন। 

প্রধানমন্ত্রী মোদি সফররত দলকে বলেছেন, তার সঙ্গে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সম্পর্ক অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ। অনেকবারই সাক্ষাৎ হচ্ছে। এবার শান্তিনিকেতনে দেখা হতে পারে। তবে বাংলাদেশ চায়, প্রধানমন্ত্রী শান্তিনিকেতনে আসুন; কিন্তু তিস্তা পানি চুক্তি না হলে সফরটা নেতিবাচক না হয়ে যায়! প্রধানমন্ত্রী এই বাস্তবতা উপলব্ধি করছেন, এটা বুঝতে পেরেছে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দল। তারা এই বিশ্বাস নিয়েই ফিরেছেন ঢাকায়। প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং ভারত সরকারের বাংলাদেশের প্রতি সদিচ্ছার কোনো অভাব নেই। রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা থাকেই। যেমনভাবে ৪০ বছরের পুরনো স্থল ও সমুদ্র সীমানার নিষ্পত্তি হয়েছে, তেমনিভাবেই বাকিগুলো হবে। সম্প্রতি ভারতের কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতা বাংলাদেশ সম্পর্কে যে বিরূপ মন্তব্য করেছেন, তার কোনো প্রভাব এই সফরে ছিল না। কেননা, ওই মন্তব্যগুলোর নেপথ্যে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক তাগিদ যতটা, ততটা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। বিজেপির কোনো নেতা বিতর্কিত বিষয় উত্থাপিত না করে সম্পর্ক মজবুত করার লক্ষ্যেই পদক্ষেপ নিয়েছেন।

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP