বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» মুক্তমত »‘কাস্টমার’ ধরতে বিদেশি টেলিভিশন!
‘কাস্টমার’ ধরতে বিদেশি টেলিভিশন!

Sunday, 29 April, 2018 12:41pm  
A-
A+
‘কাস্টমার’ ধরতে বিদেশি টেলিভিশন!
রেজানুর রহমান : অনেকেই হয়তো প্রশ্ন তুলতে পারেন, আপনি হঠাৎ টেলিভিশন অনুষ্ঠান নিয়ে মেতে উঠলেন কেন? দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো যেভাবে চলছে, চলুক। কারও তো ক্ষতি হচ্ছে না। ধরা যাক, কোনও কারণে সারাদেশে সব টেলিভিশন চ্যানেল কয়েক মিনিটের জন্য বন্ধ হয়ে গেলো, তখন পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? রীতিমতো হৈ চৈ পড়ে যাবে দেশজুড়ে। তার মানে বাস্তবতা হচ্ছে টেলিভিশন ছাড়া আমাদের একমুহূর্ত চলে না। ঘুমানোর সময়টুকু ছাড়া আমরা বোধ করি সবাই টেলিভিশন অনুষ্ঠানের মধ্যে থাকি। দেখি বা না দেখি টেলিভিশন চালু থাকে। কাজ করি, খাই-দাই। পাশে টেলিভিশন চলতেই থাকে। অনেক ক্ষেত্রে একটি টেলিভিশন সেট হয়ে উঠেছে পরিবারেরই একটা অংশ। কিন্তু টেলিভিশনে আমরা সাধারণত কী দেখি? আমরা কি আমাদের বাংলাদেশকেই দেখি? নাকি অন্যকিছু দেখি? বাংলাদেশে এই মুহূর্তে ৩০টিরও বেশি টেলিভিশন চ্যানেল কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। শোনা যাচ্ছে আরও কিছু টেলিভিশন চ্যানেল নাকি ‘আসি আসি’ করছে। তার মানে আমাদের এত এত টেলিভিশন চ্যানেল থাকতে এ কেমন প্রশ্ন–বাংলাদেশকে দেখি নাকি অন্য কিছু দেখি?
প্রশ্নটা কেন করলাম, তার একটা ব্যাখ্যা দিতে চাই। কয়েকদিন আগে ঢাকার বাইরে গিয়েছিলাম। উত্তরবঙ্গের একটি থানা শহরে রাস্তার মোড়ে চায়ের দোকানের সামনে বসেছি। দোকানের সামনে ডানে-বামে দু’টি বেঞ্চে জনাদশেক মানুষ বসে আছে। কেউ চা খাচ্ছে কেউ স্রেফ বসে গল্প করছে। তবে সবার দৃষ্টি দোকানের ভেতর দেয়ালে ঝোলানো টেলিভিশনের দিকে। টেলিভিশনে পাশের দেশের একটি হিন্দি চ্যানেলে হিন্দি ভাষার সিরিয়াল চলছে। যারা বেঞ্চের ওপর বসে আছে তারা যেন টেলিভিশনের ওই অনুষ্ঠান গিলে খাচ্ছে। কৌতূহলী হয়ে দোকানিকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই দেশীয় টিভি চ্যানেল চালু রাখেন নাই কেন? দোকানি দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বললো, দেশি চ্যানেল চালু রাখলে দোকানে ‘কাস্টমার’ থাকে না। তবে খবরের সময় দেশি টিভি চালু রাখি। অন্য সময় বিদেশি টিভি চ্যানেলই চলে। পাশেই আরেকটি চায়ের দোকানেও একই অবস্থা। হিন্দি ছবি চলছে টিভিতে। বেঞ্চের ওপর বসার জায়গা নেই। আশেপাশে অনেকে দাঁড়িয়ে হিন্দি সিনেমা দেখছে। প্রশ্ন করতেই এই দোকানিও একই মন্তব্য করলো, দেশি টিভি চ্যানেল চালু থাকলে লোকজন দোকানে বসে না। কাস্টমার কমে যায়। তাই বাধ্য হয়ে বিদেশি টিভি চ্যানেল চালু রাখি।

সন্ধ্যায় গ্রামের একটি বাজারে গেলাম। ব্যস্ত সড়কের পাশে বিরাট বাজার। ছোটবড় প্রায় দেড়শ দোকান পসরা। প্রতিটি দোকানেই একটি করে টিভি আছে। বলা বাহুল্য অধিকাংশ টিভিতে বিদেশি চ্যানেলের অনুষ্ঠান চলছে। প্রশ্ন করতেই এখানেও সেই ব্যাখ্যা পাওয়া গেলো। ব্যস্ত হোটেলের ম্যানেজার বললেন, ভাই কাস্টমারের চাহিদার কারণে বিদেশি টিভি চালু রাখি। এমনও হয় বিদেশি অর্থাৎ পাশের দেশের হিন্দি সিরিয়াল দেখার জন্য অনেকে গভীর রাত পর্যন্ত দোকানে বসে থাকে। চা খায়, মিষ্টি খায়, সিগারেট খায়। কেউ কেউ রাতের খাবার খেতে খেতে টিভিতে হিন্দি সিরিয়াল দেখে। অনেক সময় দেশীয় টিভি চ্যানেল চালাতে গিয়ে বিপাকে পড়েছি। তখন দোকানে কাস্টমার থাকে না। যে দোকানে বিদেশি অনুষ্ঠান চলে সেদিকে ছোটে।

হোটেল ম্যানেজার শিক্ষিত তরুণ। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আমাদের এত টিভি চ্যানেল তবু অন্য দেশের টিভি চ্যানেলের প্রতি কেন এত ঝোঁক? উত্তরে হোটেল ম্যানেজার বললো, স্যার আমাদের টিভি চ্যানেলগুলার অনেক সমস্যা আছে। অনেকের অনুষ্ঠানের মান ভালো না। অনুষ্ঠান প্রচারের ক্ষেত্রেও সুষ্ঠু পরিকল্পনা নেই। যখন খবর প্রচার হয়, তখন দেখবেন সব চ্যানেলেই খবর। রাত গভীর হলে প্রায় সব চ্যানেলেই দেখবেন হয় টকশো, না হয় গানের অনুষ্ঠান চলে। ফলে দেশীয় টিভি চ্যানেলের প্রতি দর্শকের আস্থা কমে যাচ্ছে। তবে স্যার খবরের সময় সব দোকানেই বাংলাদেশের কোনও না কোনও টিভি চ্যানেল চালু থাকে। কাস্টমারই চাপ দিয়ে বলে, ভাই দেশের টিভি চালু করেন। প্রসঙ্গক্রমে এই হোটেল ম্যানেজার একটি উদাহরণ টানলেন। তার মতে, খবরের সময় হোটেলের কাস্টমার নিজেই দেশের টিভি চ্যানেল চালু রাখার তাড়া দেয়। কেন দেয়? কারণ টিভির খবরে দেশের ভালো-মন্দ তথ্য থাকে। সে কারণে সবাই খবর দেখতে চায়। খবরের বাইরে অন্য অনুষ্ঠান বিশেষ করে নাটক, সিমেনায় দেশকে খুঁজে পায় না বলে দেখার আগ্রহ পায় না।

পাশেই বসে ছিলেন একজন কলেজ ছাত্র। তিনি হোটেল ম্যানেজারের কথার প্রতিবাদ করে বললেন, ভাই আপনার কথা পুরোপুরি ঠিক নয়। আমাদের নাটক, সিনেমার মান খুব একটা খারাপ নয়। কিন্তু পাশের দেশের টিভি চ্যানেলগুলোর অবাস্তব কাহিনি আমাদের দেশের মানুষকে মাদকের মতো আকৃষ্ট করছে। খোলা শরীরে সুন্দরী মেয়েরা পরকীয়ায় মত্ত থাকে। যথেচ্ছ যৌনাচারের ঘটনা সম্পর্কিত নাটক পাশের দেশের টিভি চ্যানেলে অহরহ প্রচার হয়। ফলে আমাদের দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ সহজেই এই সব টিভি সিরিয়ালের প্রতি আকৃষ্ট হয়।

তাহলে করণীয় কী? প্রশ্ন রেখেছিলাম ওই কলেজ পড়ুয়া তরুণের কাছে। মৃদু হেসে সে বললো, আমি এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারবো না। তবে আমি মনে করি, আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোতে আরও ভালো অনুষ্ঠান দরকার। বেশি দরকার অনুষ্ঠানের জন্য বিজ্ঞাপন নাকি বিজ্ঞাপনের জন্য অনুষ্ঠান এটি নিশ্চিত করা। অনেক টিভি চ্যানেলে এমনও হয়, নাটক শুরু হয়েছে। টাইটেল দেখানোর পরই শুরু হলো বিজ্ঞাপন প্রচার। তখন অনেকেরই ধৈর্য থাকে না ওই নাটক দেখার। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকে চ্যানেল শিফট করে।

রাতে বাসে করে ঢাকায় ফিরছিলাম। বগুড়া পেরিয়ে একটা জায়গায় হঠাৎ বাস থামলো। বাসের যান্ত্রিক ত্রুটি সারাতে পনের/বিশ মিনিট সময় লাগবে। বাস থেকে নেমে দেখি রাত আড়াইটায়ও রাস্তার মোড়ে একটি চায়ের দোকানের সামনে মানুষ ভিড় করে টিভিতে অনুষ্ঠান দেখছে। কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে গেলাম। মনে মনে চাইছিলাম টিভিতে যেন বাংলাদেশের কোনও চ্যানেল থাকে। কিন্তু বাস্তবতা আমাকে আহত করলো। পাশের দেশের একটি টিভি চ্যানেলে মারদাঙ্গা হিন্দি সিনেমা চলছে। দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই আপনার দোকান কি এভাবে সারারাত খোলা থাকে? দোকানদারের সহজ সরল উত্তর, সিনেমা শেষ না হওয়া পর্যন্ত দোকান খোলা রাখতে হয়। দেশের টিভি চ্যানেল দেখেন না? প্রশ্ন করতেই আবারও সহজ সরল উত্তর, ‘দেখি তো। খবর দেখি। মাঝে মাঝে টকশো দেখি।’  

আমাদের বাস চালু হয়েছে। দৌড়ে বাসে উঠলাম। বাস ছেড়ে দিল। নানান কথা ভাবছি। আমাদের সিনেমাহলে কেন দর্শক যায় না, সেটা বাধকরি আমার কাছে পরিষ্কার হচ্ছে। কিন্তু করণীয় কী? আকাশ সংস্কৃতি রুখবো কী করে? হঠাৎ মনে হলো, একটা আন্তরিক আন্দোলন চাই। আমার টিভি চ্যানেল আমি দেখব। আমাদের টিভি নাটক আমরা দেখব। আমাদের সিনেমা আমরা দেখব। আমাদের গান আমরা শুনবো।

হঠাৎ বিস্ময়করভাবে একটা ঘটনা ঘটলো। বাসের শব্দযন্ত্রে একটা চটুল হিন্দি গান বেজে উঠলো। লজ্জা, অপমানে মাথা তুলে তাকাতে পারছিলাম না। বাসের ভেতর কিছুটা অন্ধকার ছিল বলে রক্ষা পেয়েছি। কেউ আমার লজ্জারাঙা মুখটা দেখেনি। আসলেই কি কেউ দেখেনি?

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো।

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP