বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» মুক্তমত »মোটা দেহ মানে যদি সুস্বাস্থ্য না হয় তবে উন্নয়ন মানে কি?
মোটা দেহ মানে যদি সুস্বাস্থ্য না হয় তবে উন্নয়ন মানে কি?

Thursday, 12 April, 2018 04:22pm  
A-
A+
মোটা দেহ মানে যদি সুস্বাস্থ্য না হয় তবে উন্নয়ন মানে কি?

আমি লেখক নই সমাজকর্মী হিসেবে সামনে যা কিছু দেখি তার মধ্যে যেগুলি মনে দাগ কাটে লিখুনীর মাধ্যমে তা প্রকাশ করার চেষ্টা করি। শুনেছি লেখাগুলি আমার সহায়তাকারীদের মুখস্ত হয়ে যায়, তবুও তা নাকি তাদের কাছে গোলক ধাঁধাঁর মতো; তাহলে অন্যদের অবস্থা কি হতে পারে? এ সব সাত পাঁচ ভেবে লিখতে ইচ্ছে হয় না অবশ্য ব্যস্ততা ও পরিবেশও একটি অন্যতম কারণ।

ধোপাঘাটা ব্রীজ নিয়ে নানা রহস্য ও কল্পকাহিনী শুনে আসছি ছেলেবেলা হতে। বৃটিশ আমলে প্রথম ব্রীজ করার চেষ্টা হয়েছিল কিন্তু তা সম্ভব হয়নি তার কাঠামো ভেঙ্গে প্রবল স্রোতে অনেক দূরে চলে গিয়েছিল। কালের সাক্ষী হিসেবে তার ভগ্নাংশ এখনো শুকনো মৌসুমে নদী গর্ভে দেখা মেলে।

ধোপাঘাটা ব্রীজ নিয়ে নানা জনশ্রুতি রয়েছে তার মধ্যে ব্রীজটি নির্মাণ করতে গিয়ে মানুষের মাথা নাকি দিতে হয়েছিল। অনেকে বলেন ঠিকাদার স্বপ্নে দেখেছিলেন এখানে ব্রীজ করলে তার ক্ষতি হবে। তিনি তা হতে মুক্তি ও পরবর্তী জায়গাতে ব্রীজটি টিকলে মদন মোহন মন্দির পাঁকা করার মানতপূর্ণ করেছিলেন। একসময় শহরের বিনোদন কেন্দ্র ছিল ব্রীজটি।

কানকথা শুনলাম ওখানে নতুন করে সেতু নির্মাণের সময় কয়দিন আগে কয়েক ঘড়া সোনার মোহর পাওয়া গেছে। আমার আলোচ্য বিষয় সেটা নয়, পরিত্যক্ত সড়কটির তত্ত্বাবধায়ক ছিল জেলা পরিষদ। এইড ফাউন্ডেশন দীর্ঘ মেয়াদী বন্দোবস্ত নিয়ে বিরল প্রজাতির বৃক্ষ রোপন করেছিলো, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে নির্বিচারে সেগুলি কাটা হচ্ছে। বৃক্ষগুলির করুণ পরিণতি দেখে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, উন্নয়নের কান্না শুনতে পাচ্ছি। তার মাঝে স্বপ্ন দেখছি নবনির্মিত সেতু সংলগ্ন সড়কের দুইধার দিয়ে কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, গৌরিচৌরী, সোনালু, কাঞ্চন, অশোক, শিমুল, পলাশ ফাগুনে আগুন ছড়াচ্ছে ফলজ, বনজ ও ঔষুধী গাছে সবুজের সমারোহে রাস্তার দুইপাড়ের সারি-সারি তাল গাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে স্বাগত জানাচ্ছে ঝিনেদা শহরে প্রবেশ তোরণ হিসেবে। বর্ষার অপরূপ সাজে সজ্জিত কদম, হিজল ও তমাল, জলে ফুটে রয়েছে শাপলা-শালুক, পদ্ম। পানকৌড়ি ডুব সাঁতার দেবে আপন খেয়ালে। এক সময়ে আমাদের মতো ডানপিঠে বালকেরা সেতু হতে ঝাঁপ দিচ্ছে প্রাকৃতিক সুইমিংপুল নদীর জলে।

বিকট শব্দে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেল চিন্তার জাল ছিন্ন হয়ে দেখলাম সেতু নির্মাণের জন্য দুইপাড় মাটি দিয়ে নির্বিচারে ভরাট করা হচ্ছে। নবগঙ্গায় কিছু দোয়াতে (দহ) বারো মাস পানি থাকে, তার মধ্যে ধোপাঘাটা অন্যতম। সেতু হবে কিন্তু জলের অস্তিত্ব থাকবে তো? যেখানে শুকনো মৌসুমে পানি টলমল করতো সেখানে বাঁধ দিয়ে মাটি ভরাট করে পাইলিংয়ের কাজ চলছে। পাইলিং হতে উঠে আসা বালিতে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আমি জানি হয়তো সমালোচকরা বলবে উন্নয়ন দেখে চোখ টাটাচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে লাভ হবে সংস্থার জমির পাশ দিয়ে মহাসড়ক গেলে। কমপ্লেক্সের কাছাকাছি চলে আসবে যোগাযোগ ব্যবস্থা কিন্তু জানিনা মানুষ প্রাণি ও পরিবেশের কতটুকু লাভ বা ক্ষতি হবে।

কাজের প্রয়োজনে ও অঙ্গনের পরীক্ষার কারণে বেশ কিছুদিন ঢাকাতে থাকতে হয়েছিল। পরীক্ষা কেন্দ্রের ফটকে দাড়িয়ে দেখলাম জীবনমুখী শিক্ষার বদলে চলছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, সব বিষয়ে জিপিএ ৫ তো পেতেই হবে কিছু বিষয়ে ৯০’র উপরে নম্বর না পেলে লক্ষ্য হতে ছিটকে পড়ার শঙ্কা দেখলাম সদ্য পরীক্ষা দিয়ে আসা সবার চোখে মুখে.......। অপরদিকে চাকুরীতে কোটা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে রাজপথে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ অবরোধে তুলকালাম কান্ড।

ঢাকা যেতে সাভার পার হতে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। মোহাম্মদপুরের বাসা ও অফিসের এলাকাটি অনেকটা ঝিনেদা শহরের মতো ছিলো। অধিকাংশ এক ও দোতলা পুরাতন আমলের বসতবাড়ি মানুষজন ও প্রাণিদের জীবন আচরণও ছিল মফস্বল শহরের ন্যায় কিন্তু এবার দেখি আলাদীনের চেরাগের ছোঁয়ায় অনেক কিছু গায়েব। বাসার সামনে দু’টি প্লটের বাড়ি একটিতে উঠে গেছে বিশাল অট্টালিকা অন্যটিতে চলছে পাইলিংয়ের কাজ, শব্দ, ধুলা-বালিতে বসত করা দায়, যার কারণে ঘুম হয়নি ঠিকমতো। প্রতিদিন সকালে নাস্তার সময় পাশের বাসায় একটি ছোট্ট মেয়ের আকুতি শুনি। কৌতূহলবশত একদিন জানালা দিয়ে ওর সাথে কথা বলি আধো আধোভাবে যা বললো তার মা-বাবা বাইরে থেকে তালা মেরে অফিসে চলে যায়। ও যখন একা একা ভয় পায় তখন চিৎকার চেঁচা-মেচি করে। হে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব উন্নয়নের কান্না শুনতে কি তুমি পাও?

মাঝে দুইদিন ইডকলের একটি সভা হলো হবিগঞ্জ দি প্যালেস রিসোর্টে, চারিদিকে চা ও রাবার বাগানের সবুজ সমারোহের মাঝে সব ধরনের অত্যাধুনিক ব্যবস্থা সম্মিলিত পাঁচতারকা হোটেলের ন্যায় কাঁচ ঘেরা সেন্টাল এসির মাঝে রকমারি খাবার, কাটা চামচ আর সাহেবী হাল চালে হাফিয়ে উঠি। অনেকদিন আগে চা বাগানের বাংলোতে সাত দিন থাকার মধুর স্মৃতি বারবার মনে পড়ছিল তাই রিসোর্টের বিশাল এলাকায় ভোরে আর্স বাংলাদেশ এর শামসুল আলম ভাইয়ের সাথে পায়ে হেঁটে টিলা আর বন জঙ্গল মাড়িয়ে তা কিছুটা পুষিয়ে নেবার ব্যর্থ চেষ্টাও করেছি। প্রীতি ফুটবল ম্যাচ যেমন উপভোগ করেছি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল তেমনি হতাশাজনক।

ঢাকাতে আরো কিছুদিন থাকার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু দম বন্ধ হয়ে আসছিল ঝিনেদাতে এসে নিবিড় প্রশান্তির বিশ্রাম নেয়ার ইচ্ছে ছিল কিন্তু উন্নয়নের ছোঁয়ার ঢেউ লেগেছে ঝিনেদায় আমার আবাসনের কাছেও। সব সময় কানের কাছে বিরক্তিকর স্যালো ইঞ্জিনের শব্দের মাঝে হঠাৎ অপরিচিত তীব্র শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল। জানালার পর্দা সরিয়ে দেখি ব্রীজের কাজ চলছে গভীর রাতেও সমান তালে। ঘুম আসছে না নানা বিষয় জট লেগে যাচ্ছে। দূর হতে আবছা আলোয় দেখলাম পুরাতন ব্রীজের নিচে চর পড়ে গেছে ভাবনা হলো নতুন সেতুর নিচে একই অবস্থা হবে, কিছুদিন পর হয়তো এখানে আর জলাশয়টির দেখা মিলবে না। হাস্যকর মনে হবে সেতুটি, তার উপর দিয়ে সাঁই সাঁই করে দ্রুত গতিতে চলবে গাড়ি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, গবেষক, জলাশয় ও নদী রক্ষাকারী পরিবেশবিদদের কি কিছুই করার নেই! প্রত্যাশা করি সেতু নির্মাণের পর অপ্রয়োজনীয় মাটি অপসারণ করে রক্ষা করা হবে নদী ও পরিবেশ।


এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP