বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» মুক্তমত »গ্রীন গ্রাস অব হোম
গ্রীন গ্রাস অব হোম

Thursday, 29 March, 2018 03:11pm  
A-
A+
গ্রীন গ্রাস অব হোম
ছবিটা প্রতীকি
-মাসুদ আহমদ সনজু : -পাকিস্তানি? উর্দু জানতা হ্যায়?
প্রশ্নটা এবার আমাকে করল। ভাষা সকলে না বুঝলেও তার অঙ্গভঙ্গিতে আবার হাসির রোল ওঠে ‘সিম্পল’ নামের রেষ্টুরেন্টে। ড্যাব ড্যাবে চোখের মুখে বড় ক্ষত দাগের প্রশ্নকারী নিগ্রো যুবককে দেখে গ্রাম বাঙ্গলার বেগুন ক্ষেতের চুন দিয়ে আঁকা কাক তাড়ুয়ার কথা মনে পড়ল।
-না আমি বাংলাদেশি। কিন্তু তুমি এ ভাষা শিখলে কোত্থেকে?- ইংরেজিতেই বলি সিম্পলে জমিয়ে তুলা এই আফ্রিকানকে। “পাকিস্তানি ক্রুর সাথে এক জাহাজে ছিলাম কিছুদিন। ওখান থেকেই কিছুটা শিখেছি।” উত্তর দিয়েই এক অপরিচিত মেয়ের পিঠে রেষ্টুরেন্টের সংগীতের সাথে কয়েক দফা তাল ঠুকে দিল আকর্ণবিস্তৃত মুখে হাসতে থাকা যুবকটা।
বিগত ৮০’ দশকের প্রথম দিকের কথা। আমার বোহেমিয়ান জীবনের প্রায় ডজন দুই দেশ পার করে পশ্চিম জার্মানীর রাজধানী বন শহরে বছর পাঁচেক আস্তানা গেড়েছি। শহরের কেন্দ্রীয় রেল ও মেট্রো ষ্টেশন থেকে পূবমুখী হয়ে ওয়েবার ষ্ট্রাসে বরাবর কিলোমিটার খানেক হাটা পথ এই রেষ্টুরেন্ট। উত্তরে কিছু দুরেই বন বিশ্ববিদ্যালয় ও রাইন নদী। ‘পাব’ ঘরানার রেষ্টুরেন্টের কোলাহল মুক্ত ঘরোয়া পরিবেশে স্নাকস ও পানীয়র সাথে আড্ডা দেয়া তরুন সমাজের কাছে বেশ জনপ্রিয়। তবে সিম্পল ইউনিভারসিটির কাছাকাছি হওয়ায় আড্ডার মধ্যেও চলে আসে রাজনীতির কথা। আমেরিকা বৃটেনের সাম্রাজ্যবাদী নীতির ষ্টেরিওটাইপড ইউরোপিয়ান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ৬৮’ সালে বামপন্থি ছাত্র নেতা কোহেন বেন্ডিট ও রুডি ডাচস্কির নেতৃত্বে তরুন সম্প্রদায়ের উত্তাল বিক্ষোভে কেঁপে উঠেছিল ফ্রান্স জার্মানী ছাড়িয়ে গোটা পশ্চিমা ইউরোপ। যার রেশ ধরে জার্মানীর এই নর্থ রাইনল্যান্ড-ওয়েষ্টফালিয়া অঞ্চলে গড়ে উঠেছে গভীর জীবনবোধের মানবতাবাদী প্রগতিশীল তরুন সম্প্রদায়। যারা বিশ্বময় নির্যাতিত মুক্তিকামী মানুষের পক্ষে রাস্তায় মিছিলে নামে। পরমানু অস্ত্রের বিরুদ্ধে বিশাল সমাবেশ হয়। তুরস্কের বিপ্লবী কবি নাজিম হিকমতের কবিতার আসর বসায়।
শীত মৌশুমের মাঝামাঝি না আসতেই চলছে এবার প্রচন্ড শৈত্য প্রবাহ। অনেকের মতে সাম্প্রতিক কালে এখানে এমন বরফ পড়েনি। প্রচন্ড ঠান্ডায় অনেক বাড়ির পানির পাইপ বরফ জমে ফেটে গেছে। মাঝ ডিসেম্বরের উইক এন্ডের এদিন সন্ধা থেকে প্রবল তুষারপাতের পাশাপাশি রেডিও টিভিতে বিশেষ করে পথচারী ও গাড়ী চালকের প্রতি চলছে সতর্কবানী । এরমধ্যেও আমাদের এদিনকার আড্ডা মহলের মার্কিন ছাত্র রিচার্ড, স্কুল শিক্ষিকা মারিয়া, ভবঘুরে গিটারবাদক হানস, ভেড়ার লোম সাদৃশ্য কোঁকড়া সোনালী চুলের হোটেল বাটলার ববি ও ডিস্কো ড্যান্সার তুর্কী সুন্দরী নিরগুটের সাথে আজকের প্রধান বিষয় আবহাওয়া। আসরে বিশাল শরীরের উডো জিজ্ঞেস করে আমাকে, “দেখেছো এত শীত আছে তোমার দেশে?” হেসে বোকা বানিয়ে দিই। বলি, লেলিনগ্রাদে সাইবেরিয়ান শীত সহ্য করা আছে আমার।
মাঝে মধ্যেই সাধারন জার্মানদের কাছে বর্ণবাদী আচরনের শিকার হতে হয় কমবেশি সকল বাঙ্গালির। কিন্তু রাস্তায় বুক চিতিয়ে চলা দীর্ঘদেহী পেশিবহুল আফ্রিকানদের দেখলেই বর্ণবাদী অনেক জার্মানেরই পিলেই চমকিয়ে যায় আর আমি এক ধরনের ব্লাক সলিডারিটির শক্তি খুঁজে পাই। পথে দেখা হলে পরস্পরে দুই আঙ্গুল তুলে ‘হাই’ বলে শান্তনা খুঁজে পাই। ব্যক্তিজীবনে আফ্রিকানদের প্রতি দুর্বলতার পিছনে অবদান ছিল গ্রীক শিপিং কর্পোরেশনের রেডিও অফিসার লিভারপুলবাসী আমার কিছুদিনের
দীক্ষাগুরু,আইনিষ্টাইনের আপেক্ষিকতা, প্রাচ্য ভাববাদ, আফ্রিকান সাংস্কৃতি ও সংগীত আনুরাগী নিরামিষ ভোজী জন উইলিয়ামের সাহচার্য।
সিম্পলে আমার পাশের বারটুলে নিগ্রো যুবকটা এক জার্মানের সাথে গভীর আলোচনায় মগ্ন। রাত ঘনিয়ে আসলে পরিচিত জনেরা বাড়ীর পথ ধরেছে তুষারপাতের কারনে। মানুষজন প্রায় ফাঁকা তখন। আমারও উঠার সময় হয়ে ওঠে। রেস্টুরেন্টের রেকর্ডে এক মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামীর কারাগারে স্বপ্নের মধ্যে মুক্তির পাওয়া পোর্টার ওয়াগনারের ‘গ্রীন গ্রীন গ্রাস অব হোম’ গানের মাঝেই শুনি নিগ্রো যুবকটার মুখে নিজ দেশে বিদেশী শাষকদের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধের বীরত্বের কাহিনী। স্বদেশভূমি মোজাম্বিকের এক ছোট শহরে কলেজে পড়ার সময়ে পর্তুগীজদের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া স্বশস্ত্র যুদ্ধে যোগ দেয়। ব্যপক রক্তক্ষয়ের মধ্যে সে যুদ্ধে দেশ স্বাধীন হলেও শুরু হয় নিজেদের মধ্যে ভাতৃঘাতী ভয়ংকর সংঘর্ষ। জীবন সংশয়ের আশংকায় একদিন পালিয়ে এক বানিজ্যিক জাহাজে পাড়ি জমায়। নিজের হাতে তিন জন পর্তুগীজকে হত্যা করার ফটো স্বগর্বে দেখাচ্ছে পাশের জনকে তখন সে। পাবের আঁধা আলোয় যুবকের চোখের ঠিকরেপড়া দিপ্তী তখন অনেকদুর চলেগেছে। হয়ত মাতৃভূমির পানে। একটা ঝিমুনির মধ্যে মনের ক্যানভাসে সেখান থেকে আরেক প্রান্তের গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বিধৌত উর্বর বদ্বীপটার ছবি ভেসে উঠে আমার । ৭১’ এর মুক্তিযুদ্ধে বাঙ্গালিরা বীরের মত পাকিস্তানি সেনাকে পরাজিত করেছে। কিন্তু এরপর নিগ্রো যুবকের মত একই কাহিনী। নতুন করে দেশ গড়ার স্বপ্ন ভাঙ্গতে সময় লাগেনি তেমন। নানা ষড়যন্ত্রের আত্মঘাতী হানাহানিতে জাতির নেতা ও বীর যোদ্ধাদের হত্যা করা হয়েছে। স্বাধীনতা বিরোধীদের তখন বুক ফুলিয়ে রাস্তায় উল্লাস করতে দেখা গেল। দেশে ভয়াবহ আরাজকতা ও অর্থনৈতিক সংকটে বহু তরুন দেশ ছেড়ে ইউরোপ আমেরিকায় পাড়ি জমায়।মন চাইলেও আর ফিরতে পারেনা বৈধ কাগজের অভাবে।
তারপরেও হঠাৎ করে দেশে চলে এলাম সারসের ডানায় উড়াল দিয়ে মেঘের ভেলায় মিতালী হয়ে। পৌছিয়ে যাই নীল আকাশের বুক চিরে কৃষ্ণসাগর, ককেশাস, হিন্দুকুশ পর্বতমালার পর হিমালয়ের কোলের সোঁদা মাটির প্লাবনস্নাত সবুজ বনানীর ভূমিতে। যার দক্ষিন পশ্চিমাঞ্চলের ভাটফুল আষটেল গাছে দু’পাশ ছড়ানো পিচের রাস্তা দিয়ে ছুটে গেলেই ছোট্ট নির্জন সেই শহরটা।
-হেই ইয়ংম্যান ঘরে যাবেনা? রেষ্টুরেন্টের মালিক ববমানের ডাকে তন্দ্রাটা কেটে যায়। মাঝরাত হয়ে আসা রেষ্টুরেন্ট প্রায় ফাকা তখন। নিগ্রো যুবকটাও নেই। রেষ্টুরেন্টের ওয়েট্রেস কাজ শেষের গোছগাছে ব্যস্ত। এখানে নিয়মিত যাতায়াতে মালিকের সাথে একধরনের সখ্যতা গড়ে উঠেছে আমার।
-সারা শহর বরফের নিচে চাপা পড়ে গেছে। ভাল হয় এই দুর্যোগে কাছাকাছি তোমার কোন বন্ধুর বাসায় আশ্রয় নেয়া।- গলায় তার কিছুটা উৎকন্ঠা।

রেষ্টুরেন্টের দরজা ঠেলে বেরিয়ে আসি। একরাতের ঘুর্নিঝড়ে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু আর ৭১’ এ শিয়াল কুকুরে টানা হাচড়া করা অগনিত লাশের দেশে ববমানের ‘দুর্যোগ’ একটু হাসিরই সৃষ্টি করল। বাইরে তখন শুনসান নিরবতা। শুভ্র ধবল তুষারে নিয়ন আলোয় প্রতিফলিত এক মায়াবী জগতের তীব্র হাতছানি। গোড়ালি ডুবে যাওয়া বরফ ডিঙ্গিয়ে অবলীলাক্রমে এগিয়ে চলেছি আমার আড়াই কিলোমিটার দুরের ছাত্রাবাসের দিকে।

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP