বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» মুক্তমত »সঞ্চয়পত্র এবং ইএফটি সার্ভিস
সঞ্চয়পত্র এবং ইএফটি সার্ভিস

Friday, 23 March, 2018 09:38pm  
A-
A+
সঞ্চয়পত্র এবং ইএফটি সার্ভিস
রিয়াজুল হক : আমাদের দেশে স্বাবলম্বী খুব কম সংখ্যাক মানুষ রয়েছেন, যাদের সঞ্চয়পত্র কেনা নেই। তবে অনেকেরই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ আছে। নিশ্চিত মুনাফা এবং পরিমাণ– দুটোই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের মূল কারণ। বর্তমানে চার ধরনের সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করে থাকেন– পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র,বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র (তিন বছর মেয়াদি)। প্রতিবছরই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সঞ্চয়প্রবণ সাধারণ মানুষ ব্যাংকিং খাতে ডিপোজিট কিছুটা কমিয়ে সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। কিছুটা অধিক মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যেই সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝোঁকেন গ্রাহকরা। সবাই জানেন শতভাগ নিরাপদ একটি প্রকল্প হচ্ছে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ। সঞ্চয়পত্রে সাধারণ মানুষের বিনিয়োগ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা। তাদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা প্রদানের জন্যই নেওয়া হয়ে থাকে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ। বিনিয়োগকারীরা যেন তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থের মুনাফা এবং মূল টাকা ঘরে বসেই তাদের নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে পেতে পারেন, সে জন্যই বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ইএফটি ব্যবস্থা চালু করেছে।

ইলেকট্রনিক ফান্ডস ট্রান্সফার (ইএফটি) সেবার মাধ্যমে অনলাইনে দ্রুত এক হিসাব থেকে অন্য হিসাবে অর্থ স্থানান্তর করা যায়। গ্রাহক সঞ্চয়পত্র কেনার পর অনলাইন সুবিধা চালু আছে এমন একটি ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবের বিবরণ (সঞ্চয়ী/চলতি) ইএফটি ফরমে উল্লেখ করবেন। এরপর পরিবার সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে প্রতিমাসে, তিনমাস/পেনশনার সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে তিন মাস অন্তর মুনাফার টাকা গ্রাহক প্রদত্ত ব্যাংক হিসাবে জমা হয়ে যাবে। গ্রাহককে কষ্ট করে এখন আর লাইনে দাঁড়াতে হবে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভ্রমণ করে সব কাজ ফেলে রেখে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঞ্চয়পত্র বিভাগেও আসতে হবে না।

সঞ্চয়পত্র আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্ন মধ্যবিত্ত অনেকের কাছেই একটি আকর্ষণীয় বিনিয়োগ মাধ্যম। কারণ, অনেকেই জানে না তাদের ক্ষুদ্র সঞ্চয় কোথায় খাটাবেন? যে কারণে নির্দিষ্ট পরিমাণ এবং নির্ধারিত সময়ে প্রাপ্য মুনাফার আশায় তারা সঞ্চয়পত্র কিনে থাকেন। অনেকেই আছেন লেখাপড়া জানেন না। আঙুলের ছাপ দিয়েই সঞ্চয়পত্র কিনে থাকেন, মুনাফার টাকা তুলে থাকেন। অনেক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা/কর্মচারী তাদের অবসরোত্তর প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে পেনশনার সঞ্চয়পত্র কিনে থাকেন। এর ফলে তিন মাস পর পর তারা নির্দিষ্ট অংকের মুনাফা পেয়ে থাকেন। এই মুনাফার টাকা দিয়ে শেষ বয়সে অন্যের গলগ্রহ থেকে রক্ষা পেতে চান। একজন মানুষের যখন চাকরি কিংবা ব্যবসা করার শক্তি, সামর্থ্য থাকে না, তখন মাসে দশ হাজার টাকা যদি নিয়মিত আয় হয় সেটাও কম নয়। আর বৃদ্ধ বয়সে সেটি হয় আরও বেশি কার্যকর। অনেক মহিলা ক্ষুদ্র সঞ্চয় জমা করে সঞ্চয়পত্র কিনে থাকেন। প্রতি মাসে প্রাপ্ত মুনাফার টাকা তারা তাদের পরিবারে প্রয়োজন মতো ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া বিনিয়োগকারীরা তিন মাস মেয়াদি সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমেও তিন মাস অন্তর মুনাফা পেয়ে থাকেন। বর্তমান সময়ে সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ের প্রবণতা যেমন বাড়ছে,তেমনি বাড়ছে তাদের সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ।

গত বছর ২২ মে,২০১৭ তারিখ আন্তঃব্যাংক লেনদেনের ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক পেমেন্ট সিস্টেমের ব্যবহার ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক সকল তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক/প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বেশ কিছু পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। দেশের আন্তঃব্যাংক লেনদেনের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিককালে প্রবর্তিত এই ব্যবস্থা সম্পর্কে ব্যাংকের গ্রাহক তথা ব্যবসায়ী, ব্যবসায়িক সংগঠন, আর্থিক লেনদেনকারী সাধারণ জনগণ এবং ক্ষেত্রবিশেষে অনেক ব্যাংকারেরও সম্যক ধারণা নেই। পাশাপাশি অনেক ব্যাংক শাখারই এই পদ্ধতিতে লেনদেন সম্পাদনের সক্ষমতা নেই, ফলে এসব ইলেকট্রনিক পরিশোধ ব্যবস্থাগুলোর ব্যবহার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না। এ কারণে গ্রাহক পর্যায়ে এ ব্যবস্থাসমূহের সুফল পুরোপুরি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই দেশের পেমেন্ট ব্যবস্থাগুলো বিশেষ করে ইএফটি (ইলেক্ট্রনিক ফান্ডস ট্রান্সফার) এবং আরটিজিএস (রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট)-এর ব্যবহার সর্বোচ্চ নিশ্চিত করতে প্রতিটি ব্যাংক শাখার এ সেবা প্রদানের সক্ষমতা অর্জন এবং এ সম্পর্কে ব্যাংকার, ব্যবসায়িক সংগঠন,বিভিন্ন সরকারি সংস্থা,সর্বোপরি জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বেশ কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ৩১-১২-২০১৭ তারিখের মধ্যে তফসিলি ব্যাংকসমূহ তাদের সকল শাখা হতে ইএফটি এবং আরটিজিএস লেনদেন অরিজিনেশন সেবা প্রদানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। অরিজিনেশন সেবা প্রদানে সক্ষম শাখাসমূহের সম্মুখে সহজে দৃষ্টিগোচর হয় এমন কোনও স্থানে ইলেকট্রনিক পেমেন্ট সিস্টেমস সম্পর্কে সচেতনতামূলক ব্যানার প্রদর্শনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ইএফটি এবং আরটিজিএস সেবা প্রদানকারী সকল শাখার ব্যবস্থাপকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের এ ব্যবস্থা সম্পর্কে সম্যক ধারণা প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং কর্মশালার আয়োজন করবে। গ্রাহকদের মাঝে ইএফটি এবং আরটিজিএস ব্যবস্থা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ব্যাংকসমূহ এককভাবে বা যৌথভাবে এলাকাভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি (যথা: সেমিনার,ওয়ার্কশপ,লিফলেট, প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রচারণা ইত্যাদি ব্যবস্থা) গ্রহণ করবে এবং ইলেকট্রনিক লেনদেন ব্যবস্থায় গ্রাহকের অংশগ্রহণ সহজ করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সাপেক্ষে প্রতিটি ব্যাংক গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা চালু করার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

ছিনতাই আমাদের দেশের আরেক আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাদকসেবী থেকে শুরু করে বিভিন্ন দুষ্কৃতিকারী অর্থের জন্য ছিনতাই করে আসছে। ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে অনেকেই তাদের জীবন পর্যন্ত হারাচ্ছে। ষাটোর্ধ্ব জনাব রায়হানের (ছদ্মনাম) ২০ লক্ষ টাকার তিন মাস মেয়াদি সঞ্চয়পত্র ছিল। প্রায় নয় মাস তিনি মুনাফার টাকা তুলতে ব্যাংকে আসেননি। মুনাফা বাবদ প্রায় লক্ষাধিক টাকা নিয়ে যখন তিনি ব্যাংকের বাইরে এলেন, তখনই ছিনতাইকারীদের খপ্পরে পড়লেন। জীবন বাঁচাতে মুনাফা বাবদ প্রাপ্ত দেড় লক্ষাধিক টাকা ছিনতাইকারীদের দিয়ে দিলেন। ইএফটি ব্যবস্থায় এই সমস্যা অনেকাংশে লাঘব হবে। কারণ, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার টাকা এখন গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে জমা হবে। গ্রাহক ইচ্ছা করলে প্রয়োজন মতো এটিএম কার্ডের মাধ্যমেও টাকা তুলতে পারবেন। আবার প্রয়োজন মতো চেক বইয়ের মাধ্যমেও টাকা তুলতে পারবেন। বড় অংকের টাকা একসাথে বহন না করলেও চলবে।

ইএফটি সেবা চালু হওয়ার কারণে সঞ্চয়পত্রের মূল টাকা ও মুনাফা সংগ্রহ করা এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। গ্রাহক ইএফটি সেবার সুযোগ পাওয়ার ফলে সঞ্চয়পত্রের টাকার জন্য বই জমা দিয়ে টোকেন নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে না। মাস শেষে মুনাফার টাকা ও মেয়াদ শেষে আসল টাকা সরাসরি গ্রাহকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়ে যাচ্ছে। আর টাকা জমা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকের মোবাইলে এসএমএস ও ই-মেইল করে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এখন তফসিলি ব্যাংকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, যারা সঞ্চয়পত্র বিক্রির সাথে জড়িত, তাদের ইএফটি ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ব্যাংকগুলোতে অনলাইন ব্যাংকিং চালু করতে হবে। কারণ, ব্যাংকের শাখাসমূহে অনলাইন ব্যবস্থা চালু না থাকলে, পেমেন্ট সিস্টেম কার্যকর হবে না। আমাদের দেশে অনেক গরিব পরিবার আছে, যাদের সংসারের নির্দিষ্ট কিছু দিন চলে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার টাকার ওপর। এখন এই মুনাফার টাকা তুলতে যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট হয় কিংবা টাকা নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ছিনতাইকারীদের খপ্পরে পড়তে হয়, তবে তা সত্যিই দুঃখজনক। আমাদের সকলের হাতে এখন মোবাইল ফোন। কখন ব্যাংকে টাকা জমা হচ্ছে,কত টাকা জমা হচ্ছে, কত টাকা উত্তোলন হচ্ছে, সব তথ্য অনেক গ্রাহকের মোবাইলে চলে যাচ্ছে। ই-মেইলে বার্তা চলে যাচ্ছে। আর এসব কিছু সম্ভব হচ্ছে অনলাইন ব্যবস্থার জন্য। ইএফটি সেবা পাওয়ার অন্যতম মূল শর্ত হচ্ছে অনলাইন ব্যবস্থার প্রাপ্যতা। মোবাইল ফোনের কল্যাণে অনলাইনের সহজলভ্যতা ইতোমধ্যেই বিস্তার লাভ করেছে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে। সঞ্চয়পত্র বিক্রির সঙ্গে সম্পৃক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহে ইএফটি সেবা চালু হওয়া এখন সময়ের দাবি।

লেখক:  উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP