বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» মুক্তমত »অদিতিরাই এই দেশে থাকবে, নিপীড়করা থাকবে না
অদিতিরাই এই দেশে থাকবে, নিপীড়করা থাকবে না

Friday, 9 March, 2018 11:27pm  
A-
A+
অদিতিরাই এই দেশে থাকবে, নিপীড়করা থাকবে না
রাশেদা রওনক খান : ‘এই দেশে থাকবো না’ বলা মানে হলো এসব কাপুরুষের জন্য তোমার মতো লাখো-কোটি নারীকে একইরকমভাবে নির্যাতিত হওয়ার জন্য জায়গা ছেড়ে যাওয়া! তুমি হয়তো দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা বলেছো, বাংলাদেশে প্রতিদিন কোনও না কোনও নারী ধর্ষণ, নিপীড়ন, এমনকি পারিবারিক নির্যাতন সইতে না পেরে পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়, যাচ্ছে, যেতে চায়।  তোমাদের সবার জন্য আমার আহবান, এই দেশে, এই পৃথিবীতে তুমিই থাকবে, বরং নিপীড়করা থাকবে না। তাদেরকে এই দেশ, এই সমাজ, প্রয়োজনে এই পৃথিবী ছেড়ে যেতে হবে। কেবল নিজেকে জিজ্ঞাসা করবে, আমরা কেন যাবো? আমরা কি কোনও অপরাধ করেছি? এই রাস্তা কি আমাদের নয়? এই দেশ কি আমাদের নয়? এই জীবন কি আমাদের নয়? তবে কেন পরাজিতের মতো হারিয়ে যাবো?
অদিতি এবং আরও যারা একইরকমভাবে হেনস্তার শিকার হয়েছো তাদের বলছি, তুমি তো একজন বিতার্কিক কিংবা শিক্ষার্থী, তুমি দেশের সবচেয়ে নামকরা কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তোমার পরিবার তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে, তোমার ক্লাসে রয়েছে তোমার মতোই সম্ভাবনাময় অনেক কিশোরী বা তরুণী, যাদের সঙ্গে তুমি প্রতিদিন ক্লাস করো, পথ চলো, স্বপ্নের পথে হেঁটে চলো, তোমার জীবনে কিছু বন্ধু আছে, যাদের সঙ্গে তুমি হাসো মন খুলে, কথা বল প্রাণ খুলে, তোমার একটি সুন্দর পরিবার আছে, যেখানে তুমি দিন শেষে ভালোবাসা আদায় করে নাও কিংবা সবচেয়ে আস্থার জায়গা সেখানেই তোমার। কিন্তু একবার ভেবে দেখে তো তোমার সমান বয়সী একটি মেয়ে গ্রামে কিংবা অজপাড়াগাঁয়ে কতটা নিপীড়ন আর অসহায় অবস্থায় বেড়ে উঠছে। পরিবার, সমাজ-সংস্কৃতিতে, যার হয়তো নেই তোমাদের মতো একটি ভালোবাসাময় পারিবারিক পরিসর, নেই বন্ধু-বান্ধব, নেই মন খুলে কথা বলার কেউ, নেই ফেসবুকে নিজের নিপীড়নের কথা বলার পরিসর।

ফেসবুক দূরে থাকুক, এমনকি বাবা-মায়ের কাছেও বলার সাহস নেই। সেই মেয়েটিকে/মেয়েদের তো আমাদের বাঁচাতে হবে, সেই মেয়েটিকে নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে, অদিতি ও অদিতিরা। তুমি বা তোমরা যদি এতটা এগিয়ে থাকা মানুষেরা ভেঙে পড়ো, দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বলো, পৃথিবী ছাড়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নাও, তাহলে এই দেশের পরিবর্তন কারা আনবে, বলো তো? 

মনে রাখবে, হার মানা যাবে না, তৈরি হও এসব কাপুরুষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য, নিজেকে শক্ত করো সামনের কঠিন পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য, নিজের স্বপ্নকে নিয়ে এগিয়ে যাও আরও দুরন্ত গতিতে। আরও একটা বিষয় মনে ধারণ করতে হবে, আমাদের একটি পরিবার আছে, যারা সকল কিছুর ঊর্ধ্বে কেবল আমাদের ভালোবাসে! আমাদের মা আছে যিনি তার নিজের জীবনের চেয়েও তোমায়-আমায় বেশি ভালোবাসে, একজন বাবা আছে যিনি হয়তো আমার-তোমার নিরাপত্তার কথা ভেবে শাসন করেন, কিন্তু বিশ্বাস করো, তাদের চেয়ে আপন পৃথিবীতে আর কেউ নেই তোমাদের-আমাদের! তাই এসব কাপুরুষের নিপীড়িত প্ররোচনায় নিজেকে হারিয়ে ফেলো না।

জীবন মানেই যুদ্ধক্ষেত্র, নারীর জন্য এই যুদ্ধক্ষেত্র অনেক বেশি কঠিন করে রেখেছে এই পৃথিবী। কিন্তু এই যুদ্ধক্ষেত্রে জয় লাভ করাটাই নারীজীবনের সার্থকতা! 

মনে রাখতে হবে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীর ‘পরাজয়’ই চায়, তাই এসব করে। কিন্তু তুমি/তোমরা কেন একবিংশ শতাব্দীর মেয়ে হয়ে এসব পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির কাছে হেরে যাবে? তুমি বা তোমরা তো হেরে যাওয়ার জন্য জন্ম নাওনি। তবে কেন এভাবে পরিজিতদের মতো বলবে, ‘এই দেশে থাকবো না?’ এই দেশ তোমার, এই দেশ এমনি এমনি কেউ তোমাকে বা আমাকে দিয়ে যায়নি। এই দেশ পেতে আমাদের ৩০ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়েছে, জীবনের বিনিময়ে বহু নারী-পুরুষ মুক্তিযুদ্ধ করেছে। ‘ত্রিশ লক্ষ মানুষের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এই দেশ’ এই লাইনটি শুনতে শুনতে আমাদের এখন আর গায়ে লাগে না, কিন্তু ভেবে দেখো ত্রিশ লক্ষ মানে কতগুলো মানুষ, কতগুলো পরিবার, কতগুলো রক্ত? এই রক্তের ঋণ পরিশোধ করার দায়িত্ব তোমার, আমার, তোমাদের, আমাদের। অতএব, আমাদের হেরে গেলে হবে না। তাহলে হেরে যাবে দেশ। দেশকে হেরে যেতে দেওয়া যাবে না। মনে রাখবে, এই দেশে তোমরাই থাকবে, বরং এই কাপুরুষ পাষণ্ড নরপিশাচেরা থাকবে না। তাদের জন্য এই দেশ কেন, পৃথিবীর কোথাও কোনও জায়গা নেই! তারা কেবল মানুষের ঘৃণার পাত্র হতে পারে, বেঁচে থাকার কোনও অধিকার তাদের নেই! 

আবার পরিবারের কথা যদি ভাবি? একজন মা কত কষ্ট করে কতটা প্রতিবন্ধকতা পাড়ি দিয়ে তোমায়-আমায় জন্ম দিয়েছেন? মেয়ে জন্ম দেওয়ার অপরাধে কত রাত কেঁদে পার করেছেন কে জানে। কতটা কষ্ট করে দিনে দিনে তিলে তিলে একটু একটু করে আজ আমাদের এতদূর এতটা পথ হাঁটিয়েছেন! মায়ের এই ঋণও তো আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। এই মাকে জিতিয়ে দেওয়ার জন্য হলেও আমাদের যুদ্ধটা করে যেতে হবে। আমরা এসব নিপীড়নে হেরে গেলে মা হেরে যাবেন, দেশ হেরে যাবে,হেরে যাবো আমরা।   

আমি জানি, তুমি/তোমরা নিপীড়নের কথা এভাবে পাবলিকলি জানান দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল, নারীর প্রতি কাপুরুষের সহিংসতার চিত্র তুলে ধরা কিংবা একান্তই নিজের কষ্ট একভাবে সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা। কিন্তু বিষয়টি পুরোপুরি রাজনৈতিক মোড় নিয়ে নিলো সেকেন্ডের মধ্যেই। যদি প্রতিদিন সংবাদপত্রে আসা নারী নিপীড়নের খবরগুলো আমাদের এভাবে ভাবতো, কাঁদতো, ব্যথিত করতো! ঐতিহাসিক ৭ মার্চের দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনা কেন করলো? কারণ আবার সেই পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির জয়জয়কার! আমরা শিক্ষিত সচেতন সমাজ ঘটনাগুলোতে যতটা না নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ে ভাবছি, নিপীড়িত নারীর প্রতি যতটা না সমব্যথী, তারচেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক কালিমা লেপনে ব্যস্ত হয়ে উঠলাম। বিভক্ত হয়ে গেলাম দুই দলে- তোমার বিতর্কের দলের মতোই দুটি দল। অথচ এটা নিয়ে কোনও দলাদলি বা পক্ষ-বিপক্ষ হওয়ার কথা ছিল না, একটাই দল হবে ‘নারীর প্রতি সহিংসতা নয়’। কিন্তু বাস্তবে কী হলো?  

সেই পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক চেতনার জয় হলো। কথা চলছে, যুদ্ধ হচ্ছে, বাকবিতণ্ডা চলছে, কাদা ছুড়োছুড়ি হচ্ছে, কার আমলে কত বেশি নারী নিপীড়নের শিকার হয়েছে, কার আমলে কত নারী ধর্ষিত হয়েছে! নারীর নিপীড়ন এখানে আর মুখ্য রইলো না, বরং আলোচনার প্রান্তিকেও যেন স্থান পাচ্ছিলো কেবল সংখ্যার প্রয়োজনে! এই হলো রাজনীতিতে যুক্ত মানুষের আলাপ-আলোচনার পরিসর আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজের রাজনীতি! এটাও সত্য, যেকোনও রাজনৈতিক দলের ভূমিকা নিয়ে কথা বলতে পারলে আজকাল আমাদের সামাজিক- রাজনৈতিক সচেতন মানুষ হিসেবে পরিচিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। আমরা রুপা, আফসানা, রিসা, পূজা, সালমা, পূর্ণিমা, তনুসহ নাম না জানা লাখ লক্ষ নারীর সঙ্গে প্রতিদিন ঘটে যাওয়া নিপীড়নের ঘটনা, ধর্ষণ কিংবা হত্যার কথা বলার চেয়ে অনেক বেশি আবেগ দিয়ে কথা বলি, যখন এসব ঘটনায় আওয়ামী লীগ বা বিএনপি বা কোনও রাজনৈতিক দল জড়িত থাকে। খাদিজাকে কুপিয়ে যখন মারছিলো বদরুল, তখন আমাদের মূল আলোচনা হয়ে উঠলো বদরুল কোন দলের- ছাত্রলীগের না ছাত্রদলের? অথচ বদরুল যে কতটা পাষণ্ড, কী পাশবিক কাজ করলো, কীভাবে করলো, কেন করলো, এসবের ঊর্ধ্বে তখন তার রাজনৈতিক পরিচয়ই প্রধান হয়ে উঠলো আমাদের মেধায় ও মগজে। 

প্রসঙ্গটি আনলাম এই জন্য যে আজকে ৮ মার্চ নারী দিবস। যখন দেখলাম ৭ মার্চের দিনে অদিতিকে হেনস্তাসহ আরও দু-একটি ঘটনা আমাদের আলোচনায়, ফেসবুকে ঝড় তুলছে নারী দিবসকে সামনে রেখে, যা খুবই প্রয়োজনীয় এবং আশাজাগানিয়া বিষয়। কিন্তু খুব সচেতনভাবে খেয়াল করে দেখার চেষ্টা করলাম, আসলে মূল উদ্দেশ্য কি এই ধরনের বক্তব্যগুলোর? বুঝতে চাইলাম, আমরা সভ্য সমাজের সচেতন শিক্ষিত মানুষজন হিসেবে কতটা মেয়েটির বা মেয়েদের সঙ্গে গতকালের ঘটে যাওয়া ঘটনার জন্য বিলাপ করছি, নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলছি দায়িত্ববোধ কিংবা নিজের উপলব্ধি হতে, আর কতটা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ হতে কথা বলে কাদা ছোড়াছড়ি করছি! অবাক লাগছে কেউ কেউ পক্ষে বিপক্ষে বিবৃতিও দিয়ে বেড়াচ্ছেন! কিন্তু এখানে তো পক্ষ বিপক্ষের কিছু ছিল না! ঘটনা ঘটেছে, যে বা যারা ঘটিয়েছে, যেখানেই যেভাবে যে পরিচয়েই ঘটিয়েছে, তার বা তাদের শাস্তি হতে হবে– এই থাকার কথা ছিল আমাদের অঙ্গীকার, কিন্তু কি দেখছি আমরা ফেসবুকজুড়ে? বখাটে কাপুরুষগুলো আওয়ামী লীগের কিনা, আওয়ামী লীগের ভাড়াটিয়া কর্মীদের কাজের সমালোচনা, ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে কটূক্তি, ভাষণকে ঘিরে এত উন্মাদনার কী হলো, ইত্যাদি প্রশ্নই বড় হয়ে উঠছে কারো কারো দেয়ালে, আলোচনায় আবার আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল মানুষজন এই ধরনের নিপীড়নের পক্ষে মেয়েটিকে খাটো করে, নিজ দলের সাফাই গাইছেন অবলীলায়, দলকানা পদ্ধতিতে। কিন্তু কেন? 

রাজনৈতিকভাবে সচেতন নাগরিক কি তবে এই? এই আমাদের দায়িত্ব? নারীর নিরাপত্তা, নারীর অধিকার আদায়ের লক্ষে, নারীর পথ চলায় কীভাবে আমরা সবাই একসঙ্গে  লড়াই করবো, এসব কথা তাদের আলোচনায় কোথাও উচ্চারিত হচ্ছে না, পুরুষ তো বটেই, নারীরাও নিপীড়কের  রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েই আজ নারী দিবসে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া নিয়ে ব্যস্ত! হায়রে নারী, কবে বুঝবো আমরা, বেশিরভাগ সময়ই নারী প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির বলিই কেবল হচ্ছি না, মুখপাত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছি! এই আলোচনায় কেবল নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ, পরিবার ও সমাজে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন, নারীর অধিকার আদায়ের লক্ষ্যই হোক আমাদের আজকের দিনের প্রত্যয়!  

লেখক: শিক্ষক, নৃ-বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP