বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» মুক্তমত »মানুষ যদি এতই ধর্মপ্রবণ হয়ে থাকে তাহলে এত দুর্নীতি, ঘুষ, ধর্ষণ, লুটপাট কি হতে পারে!
মানুষ যদি এতই ধর্মপ্রবণ হয়ে থাকে তাহলে এত দুর্নীতি, ঘুষ, ধর্ষণ, লুটপাট কি হতে পারে!

Saturday, 24 February, 2018 01:53pm  
A-
A+
মানুষ যদি এতই ধর্মপ্রবণ হয়ে থাকে তাহলে এত দুর্নীতি, ঘুষ, ধর্ষণ, লুটপাট কি হতে পারে!
রাজু আলাউদ্দিন: নজরুল নিয়ে আপনি একাধিক লেখা লিখেছেন। এবং আপনার নতুন কিছু পর্যবেক্ষণ আছে যা অন্য কারো লেখায় পাওয়া যায় না। 
শামসুজ্জামান খান: তবে নজরুল সম্পর্কে আমার লেখালেখি কিন্তু কম। আমার ইচ্ছা আছে, ভালো করে নজরুলের বিষয়টাকে ধরে লেখালেখি করার। আমার নানা বিষয়ে আগ্রহ। নজরুল-চর্চাটা আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
রাজু আলাউদ্দিন: তো আপনি নজরুল কোন বিষয়ে লেখার কথা ভাবছেন? কোন বিষয়ে আসলে লেখা উচিত বলে মনে করছেন?
শামসুজ্জামান খান: নজরুলের বাঙালিত্ব নিয়ে কিছুটা লিখেছি। তিনি বাঙালির কবি, এটি আমি বলার চেষ্টা করেছি। আমরা যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, বাংলাদেশ প্রধানত বাঙালির বাংলাদেশ। কিন্তু সেই বাঙালি হবে আধুনিক, মানবিক, গণতান্ত্রিক এবং বিশ্বনাগরিকও বটে। এই সবটা মিলিয়ে বাঙালির বাঙালিত্ব। তার জন্য নজরুল সাহিত্য আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। যেমন একই সঙ্গে তিনি মুসলিম ঐতিহ্যের ব্যবহার করেছেন। সনাতন ধর্ম বা হিন্দুধর্মের ব্যবহার করেছেন। সেই সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব-ঐতিহ্যের ব্যবহার করেছেন। এবং বঙালিত্বের ব্যাপারেও তার যে অনুধাবন, সেগুলো এতটাই অসাধারণ, অন্য কোনো লেখকের মধ্যে সেটা প্রায় পাওয়া যায় না। এবং লৌকিক উৎসের নবায়নের ক্ষেত্রে নজরুল কিন্তু খুবই তাৎপর্যপূর্ণ কিছু কাজ করেছেন। সেইদিক নিয়ে আমার আরেকটু খোঁজখবর নেয়ার ইচ্ছা। যেমন গানের ক্ষেত্রেও তিনি আব্বাস উদ্দীনের সঙ্গে গিয়েছিলেন আব্বাস উদ্দীন সাহেবের সেই এলাকায়। সেখানে গিয়ে একটা লোকগীতি তিনি শোনেন। শুনে সেইটারই তিনি যে নবায়ন করলেন– নদীর নাম সুরঞ্জনা– কী অসাধারণ! লোকজ একটা বিষয়কে তিনি নিয়ে এলেন পরিশীলিত আঙ্গিকে, একটি চমৎকার বাংলা গান হিসেবে।
রাজু আলাউদ্দিন: আরেকটি বিষয় নজরুলের সাথে দুর্ভাগ্যজনকভাবে যেটা ঘটেছে, এক হলো, বাঙালি মুসলমান বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এনেছে। এমনকি নাস্তিকতা বা মুরতাদের অভিযোগ এনেছে। এবং উনি সাচ্চা মুসলমান না, ইসলামের সেবক না– এরকম নানা অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। এমনকি এটাও বলা হয়েছে, আমরা বাংলাদেশে তার সাহিত্যকর্ম যদি নিতেই চাই, তাহলে সেই নেয়াটা যেন মুসলমানিত্বের সাথে নেয়া যায়, সে জন্য এক সময়ে সম্পাদনারও প্রস্তাব এসেছে।
শামসুজ্জামান খান: খণ্ডিত নজরুল। খণ্ডিত নজরুলকে নিতে বলা হয়েছে। এবং তার কাব্যের কিছু অংশ বর্জন করে নজরুলকে গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। এরচে’ অসাহিত্যিক এবং কাণ্ডজ্ঞানহীন বক্তব্য আর হতে পারে না। একজন সাহিত্যিককে তার সমগ্র দিয়েই বুঝতে হবে। এবং নজরুল একজন অসাধারণ বড় মাপের কবি। তিনি দুটি ঐতিহ্যের ব্যাপারে যে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, তাতে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়, তিনি একজন উদ্ভাবনাময় বড় মাপের কবি। যে কারণে তৎকালীন হিন্দু সম্প্রদায়ের বাঙালি কবিরা কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথের কাছে অভিযোগ করেছিলেন, আপনি নজরুলকে নিয়ে এত কথাবার্তা বলেন কেন! আপনি তাকে কবি বলেইবা এত আনন্দ লাভ করেন কেন! নজরুল এমন কী কবি! তিনি বলেছিলেন, তোমরা ঠিক বোঝ না। আমি যদি নজরুলের মতো এই সময়ে জন্মগ্রহণ করতাম, এবং এই যুগের মুখোমুখি হতাম, আমার কবিতাও এরকমই হতো। এই কারণে নজরুলকে আমি প্রশংসা করি। নজরুল শুধুমাত্র কবি নয়, নজরুল এক মহাকবি। এটা হলো রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়ন।

ধর্মনিরপেক্ষতা আমাদের উপমহাদেশে মুসলিম শাসকরাই এনেছেন
রাজু আলাউদ্দিন: তবে রবীন্দ্রনাথের পরে বা তার সময়ে নজরুল সম্পর্কে অন্য কারো মূল্যায়ন খুব একটা পাওয়া যায় না। যেমন সুধীন দত্তর কোনো বক্তব্য নেই।
শামসুজ্জামান খান: বুদ্ধদেব বসু কিছু নিন্দা করেছেন আবার কিছু প্রশংসাও করেছেন। কিছু গানের প্রশংসা করেছেন। কোনো কোনো লেখারও প্রশংসা করেছেন। অন্যরা কিন্তু নজরুলকে নিয়ে গভীরতর পর্যালোচনা, পর্যবেক্ষণ বা বিশ্লেষণ করেননি, পশ্চিমবঙ্গে এর অভাব আছে। সেটি আমাদের জন্য একটি বেদনার বিষয়। তবে আমাদের এখানে আবদুল মান্নান সৈয়দ নজরুলকে নিয়ে কিন্তু ভালো কাজ করেছেন। ব্যাপক কাজ করেছেন। আমাদের দুর্ভাগ্য, আবদুল মান্নান সৈয়দ বেঁচে নেই। তিনি বেঁচে থাকলে নজরুলকে নিয়ে আরো গভীরতর মাত্রার এবং উন্নতমানের কাজ আমরা হয়ত পেতাম। নজরুলকে নিয়ে আরো অনেক কাজ বাকি আছে বলে আমি মনে করি।
রাজু আলাউদ্দিন: বাংলা একাডেমী থেকে যে নজরুল রচনাবলী বেরিয়েছে, আপনি কি মনে করেন এর বাইরেও আরো কিছু রচনা অপ্রকাশিত রয়ে গেছে?
শামসুজ্জামান খান: নজরুল কিন্তু সকল ক্ষেত্রেই বেহিসাবি ছিলেন। কখন কাকে কোন লেখা দিয়েছেন, সহজেই দিয়ে দিয়েছেন। আমার নিজের ধারণা, তার বহু লেখা, বহু গান এখনো নানাজনের সংগ্রহের মধ্যে আছে। সেগুলো খুঁজে পেলে নজরুলের আরো অনেক সাহিত্যকীর্তির সাথে আমরা পরিচিত হতে পারব। সেই সম্ভাবনা এখনো আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: এবার আমরা ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পর্কে আপনার অভিমত জানতে চাই। জানতে চাওয়ার কারণ, শহীদুল্লাহ সম্পর্কে আপনি শুধু একাধিক লেখাই লেখেননি, শহীদুল্লাহর যে স্মারকগ্রন্থটি বেরিয়েছিল বাংলা একাডেমি থেকে, সম্ভবত ১৯৮৫ সালে, সেটার সম্পাদনার সাথেও আপনি যুক্ত ছিলেন। এবং ওই গ্রন্থের দীর্ঘ সম্পাদকীয় আপনার নিজের লেখা। 
শামসুজ্জামান খান: উনার জন্মশতবার্ষিকীতে ওই সংলকলনটি তখন আমরা করেছিলাম।
রাজু আলাউদ্দিন: শহীদুল্লাহ সম্পর্কে আজকে আমরা সঙ্কটের মধ্যে আছি। যেমন আজকে ধর্ম বিষয়ে আমরা অনেক কিছুই বলতে পারি না। বলতে পারি না বলতে এটা বোঝাচ্ছি যে, ধর্ম সম্পর্কে আগে, পাকিস্তান আমলেও যেভাবে বলা যেত, এখন আর সেই স্বাধীনতা নিয়ে বলা যায় না। তবে আমি বলছি না যে স্বাধীনতা মানেই হচ্ছে ধর্মের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো। আপনি নিশ্চয় পার্থক্যটা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারেন।
শামসুজ্জামান খান: ধর্ম বা দেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সাহিত্যিকের কাজ নয়। সাহিত্যিকের মূল কাজ হলো শিল্পসম্মত রচনা সৃষ্টি করা। সেই সৃজনক্ষমতার জোরেই কিন্তু কবি বা সাহিত্যিক চিরকালের জন্য টিকে থাকে। যে কারণে শহীদুল্লাহকে আমি বড় করে দেখতে চাই, সেটি হলো, বাঙালি মুসলমান ধর্ম এবং সংস্কৃতি নিয়ে যে সঙ্কটের মধ্যে পড়ে, সেই সঙ্কট উত্তোরণের ক্ষেত্রে তারা যদি শহীদুল্লাহর রচনা গভীরভাবে পাঠ করে, তাহলে কিন্তু খুব সহজেই মুক্তির পথটা পেয়ে যাবে। শহীদুল্লাহ যেভাবে বলেছেন, বাঙালিত্বের ব্যাপারে যে কথাগুলি বলেছেন, বা ধর্মের কথা বলেছেন, ধর্ম নিয়ে অত বাড়াবাড়ি করার দরকার নেই, পৃথিবীতে যে হাবিয়া দোজখ চলছে, সেই হাবিয়া দোজখ যাতে বিলুপ্ত হয় সেই চেষ্টা না করে শুধুমাত্র ধর্মীয় জিকির তুললেই বা ধর্মীয় গ্রন্থ তোতাপাখির মতো পাঠ করে গেলেই মানুষের কোনো কল্যাণ করা হয় না। মানবকল্যাণই ধর্মের প্রধান কথা। সেই বিষয়টি তিনি যেভাবে বলেছেন, সেটি কিন্তু আমাদের জন্য একটি দিকনির্দেশনা যে, ধর্মকে আমরা কিভাবে গ্রহণ করব আমাদের জীবনে।

বাংলাদেশ নামটাও তিনি শহীদুল্লাহ সাহেবের কাছ থেকে ঠিক করে নিয়েছিলেন
রাজু আলাউদ্দিন: আমরা এটাও জানি, বাংলাদেশ তখনো তৈরি হয়নি। তবে ধারণা আকারে কতগুলো জিনিস তৈরি হয়েছে, যেটাকে বলে নেবুলা; নেবুলাটা যখন ক্রিস্টালাইজড হয় তখন নক্ষত্রের রূপ ধারণ করে। তো তখনো নেবুলা আকারে এই জিনিসগুলো তৈরি হচ্ছে…
শামসুজ্জামান খান: সেই জায়গায় বাঙালিত্ব কিন্তু তিনিই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, যখন বিতর্ক চলছিল আর কি। মূলত ষোল শতাব্দি থেকেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। যেটি আমি বোধহয় কিছুক্ষণ আগে বলেছি এই সাক্ষাৎকারে। সৈয়দ সুলতানকে যখন মুনাফেক বলা হলো, তখন তিনি বলেছেন, যারে যেই ভাষে প্রভু করেছে সৃজন, সেই ভাষ হয় তার অমূল্য রতন বা অমূল্য ধন। এর আরো পরবর্তীকালে, একশ বছর পরে এটি যখন আরো তীব্রতা লাভ করে, তখন আব্দুল হাকীম– যে জন বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সে জন কাহার জন্ম নির্ণয় না জানি– এই কথাটি কিন্তু তিনি তখন বলেছিলেন। কিন্তু এই সমস্যা সমাধান করার ক্ষেত্রে দুজনের ভূমিকা আমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। একজন হলেন, আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ। তিনি ১৯১৮ সনে বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা কী এই প্রসঙ্গের সমাধান করলেন তার বক্তব্যের মাধ্যমে। বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা বাংলা। মাতৃভাষা এবং জাতীয় ভাষা বাংলা। এরপরে কিন্তু বিতর্ক আর টেকেনি। আর শহীদুল্লাহ সাহেব যেটি করলেন, সেটি হলো, তিনি বাঙালিত্বের কথাটা এমনভাবে আনলেন: আমরা হিন্দু এবং মুসলমান যেমন সত্য, তার চাইতে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এবং তারপর সেটির উদাহরণও তিনি দিয়েছেন। টুপি, দাড়ি, লুঙ্গি– এতে কোনো প্রভেদ করা যায় না। অতএব বাঙালিত্ব সম্পর্কে এবং বাঙালির মাতৃভাষা সম্পর্কে আমার নমস্য দুই ব্যক্তি, একজন আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ আরেকজন হলেন ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তারা এই বিষয়ে ফয়সালা দিয়ে গেছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আধুনিক বাঙালিত্ব, আমরা যে স্বাধীন ভূখণ্ড লাভ করব, আলাদা জাতিগোষ্ঠী হিসেবে তৈরি হব, আপনি কি মনে করেন না যে ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ভেতর সেই ভাবনার বীজগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল?
শামসুজ্জামান খান: বাঙালিত্বের যে বিষয়টি, সুলতানি আমলেই কিন্তু এটি শুরু হয়েছিল, সাক্ষাৎকারের আগের অংশেই সেটা বলেছি। সেটা যে বাধার মুখে পড়েছিল, সেটাও বলেছি। তার উত্তরে আমাদের মানবিক কবিরা কী সব বক্তব্য রেখেছেন, সেটাও আমি বলেছি। বিষয়টা বাঙালিত্বের। আমরা ভবিষ্যতের বাঙালিত্বকে খুবই গুরুত্ব দিই। আমাদের জাতিসত্তার নির্মাণের ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমান উনবিংশ শতাব্দির শেষ দিক থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দিতে এসে বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে সামনের দিকে এগিয়েছে। কিন্তু তারপর যখন পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন আবার বাঙালিদের উপর বিদেশি ভাষা, উর্দু ভাষাকে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হলো। এমনকি স্বৈরশাসক আইয়ুব খান এই কথাও বললেন: ছারা যবান মিলি ঝুলি কার এক যবান করনে হো গা। ওহ যবান উর্দু নেহি, বাংলা ভি নেহি, ওহ হ্যায় পাকিস্তানি যবান। সামরিক শাসকের নির্দেশে কখনো একটি ভাষা তৈরি হয় না। ভাষা তৈরি হয় শত শত বছরের মানুষের মুখের বুলিতে, তাদের আচার-আচরণ, তাদের বিশ্বদৃষ্টি সবটা মিলিয়ে ভাষা তৈরি হয়। অতএব বাঙালির যে ভাষা, সেই ভাষা ধীরে ধীরে যখন বিকশিত হয়ে একটি শক্তিশালী ভাষায় পরিণত হয়েছে, রবীন্দ্রনাথ নজরুলের মতো কবি সাহিত্যিকের সৃষ্টি হয়ে গেছে; তখন পূর্ববাংলার বাঙালিদের উপর উর্দু চাপিয়ে দেয়ার প্রয়াস ঐতিহাসিকভাবে যদি বুঝতেন তাহলে পাকিস্তানি শাসকরা তা করতেন না। কিন্তু ওই যে ভাষা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হলো, তখন থেকে বাঙালিত্বের, আধুনিক বাঙালিত্বের জাতিসত্তা গড়ে উঠতে শুরু করল। এবং আটচল্লিশে শুরু হয়ে বাহান্ন সনে ভাষা আন্দোলন, ছাত্রদের আত্মবলিদানের মাধ্যমে আমরা যে বাঙালিত্ব অর্জন করেছি তাকে রক্ষা করতে আমাদের সংগ্রাম করতে হয়েছে। এবং তারই ফলে একটি রাষ্ট্র গঠন করাও কিন্তু সম্ভব হয়েছে। সেই ক্ষেত্রে আমাদের ছাত্র সমাজ, আমাদের কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী সমাজ এবং রাজনৈতক ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদ এবং ভাষা আন্দোলনের অন্য যেসব নায়কেরা ছিলেন, তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এভাবেই কিন্তু শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ছেষট্টির ছয়দফা, তার পরবর্তীকালে তিনি ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে যে নিউক্লিয়াসের সৃষ্টি করে দিলেন, তাদের উপযোগী স্লোগানসমূহ– জাগো জাগো বাঙালি জাগো, ঢাকা না পিন্ডি, ঢাকা ঢাকা, তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা– এবং সর্বশেষে ঊনসত্তরের গণঅভ্যূথান, সত্তরের নির্বাচন, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত আমরা স্বাধীনতা অর্জন করে যে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করলাম, সেটা গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, জাতীয়তাবাদী। এই বাংলাদেশের গতি কিন্তু পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করার পর নানাভাবে বিঘ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। সেই জায়গায় সংগ্রাম আমাদের এখনো চলছে। আমাদের সংগ্রামে জিততে হবে। এবং আধুনিক বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশের ক্ষেত্রটিকে আরো বলবান করতে হবে। সেখানে মানবিকতা প্রধান হবে। আন্তর্জাতিকতা গুরুত্বপূর্ণ হবে। এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাঙালিত্বকে যুক্ত করতে হবে। তাহলেই আধুনিক, নতুন, যুক্তিবাদী, ইহজাগতিক সমাজ গড়ে উঠবে। এটিই আমি মনে করি। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এবং এটি করার জন্য বুদ্ধিজীবীসহ, শ্রমিক-সমাজসহ, প্রযুক্তিবিদসহ কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-বিজ্ঞানী এদের ভূমিকা পালন করতে হবে। যদি আমরা অঙ্গিকারদৃপ্তভাবে লোভলালসা পরিত্যাগ করে এটা করতে পারি তাহলে বাংলাদেশে এটা করা সম্ভব। কারণ, বাংলাদেশের মানুষ সবসময় ইতিবাচক। তারা গণতন্ত্রের অনুরক্ত। তাদের দিয়ে বহুকিছু করা সম্ভব। আমরা জানি মৌলবাদী শক্তির বিকাশ ঘটেছে। বিপুল সংখ্যক মাদরাসা গড়ে উঠেছে। তারা পশ্চাতপদ শিক্ষাদীক্ষার মধ্যে আছে। তাদেরও গণতান্ত্রিক শিক্ষার মধ্যে আনতে হবে। তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ভূগোল ইতিহাস, বাংলাদেশের ইতিহাস সংযুক্ত কতে হবে। তবেই হয়ত একটি আধুনিক, নতুন, সম্মুখমুখী বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

বঙ্গবন্ধু প্রায়ই ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর সংস্পর্শে আসার চেষ্টা করতেন
রাজু আলাউদ্দিন: শহীদুল্লাহ সাহেব নিজে একজন ধার্মিক হওয়া সত্ত্বেও ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে উনি যে সব কথা বলেছেন সেই সময়ে, সেগুলো কিন্তু খুব বিপ্লবাত্মক। বিপ্লবাত্মক এই অর্থে যে সাধারণত যারা মোল্লা এরা তো এরকমভাবে কথা বলেন না। উনি বলেছেন: এই সময়ের মতো করে আমাদের ধর্ম-সমাজ-সাহিত্য সব গড়ে তুলতে হবে। নইলে কিছুই টিকবে না। আজ দিন এসেছে যে, সমস্ত নফল নামাজ, রোজা ও তসবিহ পড়া ছেড়ে খলকুল্লাহর সেবায় লেগে যেতে হবে। তারমানে, উনার দৃষ্টিভঙ্গি হলো, ধর্মকে উনি ইহজাগতিকতা থেকে কখনোই বিচ্ছিন্ন করে দেখেননি। 
শামসুজ্জামান খান: ধর্মকে ব্যক্তিগত জীবনে রেখেও কিন্তু আধুনিক, গণতান্ত্রিক, মানবিক এবং ইহজাগতিক হওয়া যায়। এর উদাহরণও আছে মুসলিম ইতিহাসে। আমি আগেও বলেছি বোধহয়, ধর্মনিরপেক্ষতা আমাদের উপমহাদেশে মুসলিম শাসকরাই এনেছেন। সেই কথার সংক্ষিপ্ত সার এই: যিনি রাজা হবেন, বাদশা হবেন বা রাষ্ট্রপ্রধান হবেন, তিনি নিজে দীনদার হতে পারেন, ধার্মিক হতে পারেন কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু রাষ্ট্রনীতি যেহেতু অনেক জটিল, বহু বিষয় তার সঙ্গে সম্পৃক্ত, সেই কারণে সেখানে তাকে হতে হবে জাহানদারির অধিকারী। জাহানদারি মানে দুনিয়াদারি। ইহজাগতিকতা। অর্থাৎ, ইহজাগতিকতার ধারণা মাওলানা আজাদ কিংবা পণ্ডিত নেহেরু কিন্তু প্রবর্তন করেননি। বরং প্রবর্তন করেছেন যতদূর মনে হয় আলাউদ্দীন খিলজি, ইলতুৎমীশ এখান থেকে শুরু হয়ে আকবরে এসে সেটি পরিপূর্ণ মাত্রা লাভ করেছে। এবং তারই অনুসরণে যখন ভারত পাকিস্তান দুটি আলাদা রাষ্ট্র হলো, তখন ভারত ধর্মনিরপেক্ষতা বা ইহজাগতিকতাকে গ্রহণ করল। আমাদেরও বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই ইতিহাস তিনি জানতেন এবং বুঝতেন বলেই তিনিও ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এই চারটি মূলনীতি প্রতিষ্ঠা করলেন। এখানে একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, বঙ্গবন্ধু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি সমাজতন্ত্রের কথা বলেছেন। কিন্তু তার সমাজতন্ত্র একটু ভিন্ন ছিল। ভিন্নতা তিনি এইভাবে পরিষ্কার করেছিলেন, যে, পৃথিবী আজ দুইভাগে বিভক্ত। একদিকে শোষক আরেক দিকে শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে। এটাও কিন্তু একজন জাতীয়তাবাদী নেতার দৃষ্টিভঙ্গির বামপন্থার দিকে ঝোঁকেরই প্রমাণ। এইটা বুঝেই কিন্তু ফিদেল ক্যাস্ত্রো বলেছিলেন, আমি হিমালয় দেখিনি। আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি।
রাজু আলাউদ্দিন: যেহেতু ধর্মনিরপেক্ষতার প্রসঙ্গ আসল তাই বলছি, শহীদুল্লাহ সাহেব আরো এক জায়গায় বলেছিলেন যে, যুবক চায় সকল বাঁধন থেকে ছুটে যেতে। তাদের মনে করা স্বাভাবিক, ধর্ম একটা বাঁধন বৈ কি! তিনি আরো বলছেন, অর্থ বোঝা নয়, কেবল শব্দের আবৃত্তি। অনুষষ্ঠান আছে, নাই তার আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্যের প্রতি লক্ষ। বাহ্যিকতা আছে, নাই আন্তরিকতা। এসব ভণ্ডামি। এরচেয়ে সাফ নাস্তিক হওয়া ভালো। 
শামসুজ্জামান খান: খুব অসাধারণ কথা, তাই না! এরচে’ অসাধারণ কথা আর কোন বিপ্লবী বলতে পারবে? ইতিহাসকে গভীরভাবে বুঝে, আমাদের পটভূমিকে গভীরভাবে বুঝে, ধার্মিকতার মর্মবাণী যুক্ত করে, তিনি ইতিহাসের যে সত্যকে বলেছেন তার তুল্য জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাপূর্ণ বক্তব্য আর হয় না। মানুষ যদি এতই ধর্মপ্রবণ হয়ে থাকে তাহলে এত দুর্নীতি, ঘুষ, ধর্ষণ, এত লুটপাট কি হতে পারে! অতএব তারা মুখে তোতাপাখির মতো ধর্মের কথা বলছে, কিন্তু যে কাজগুলো করছে, সবই ধর্মবিরোধী।
রাজু আলাউদ্দিন: এরা আসলে ধর্মের কর্মমুখিতা থেকে বিচ্ছিন্ন। 
শামসুজ্জামান খান: কর্মমুখিতা এবং ধর্মের সাথে সাথে আত্মাকে কলুষতাহীন করা, সেই জিসিটা যদি না আসে তাহলে তো তিনি প্রকৃত ধার্মিক নন।
রাজু আলাউদ্দিন: সেই জন্যই তো উনি বলছেন যে, এসব স্রেফ ভণ্ডামি। এরচে’সাফ নাস্তিক হওয়া ভালো। আমার খুব মনে হয়, আজকের দিনে উনি এ রকম কথা বলতে পারতেন না। এটা বললে উনাকেই উল্টো নাস্তিক বলে প্রমাণ করে ছাড়ত।
শামসুজ্জামান খান: একটা জিনিস লক্ষ করলে দেখা যায় যে, আকরাম খাঁর ‘মোস্তফা চরিত’ আমাদের মহানবি সম্পর্কে লেখা একটি বই। যুক্তিভিত্তিক অসাধারণ বই। আমার মনে আছে, জহুর হোসেন চৌধুরী, সংবাদের বিখ্যাত সম্পাদক ছিলেন, তিনি বলেছিলেন, মাওলানা আকরাম খাঁ বেঁচে থাকলে এখন বোধহয় এই বইটিও তথাকথিত মোল্লাদের উৎপাতের বিরোধিতায় লিখতে পারতেন না।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা তো খুবই সত্য।
শামসুজ্জামান খান: খুবই সত্য কথা উনি বলেছেন। অতএব, আমাদের এখানকার তথাকথিত মোল্লারা গভীরভাবে ধর্মচর্চা করছেন না। ধর্মের মর্মবাণী বুঝছেন না। ধর্মের বহিরাঙ্গন নিয়ে তারা লাঠালাঠি করার প্রয়াস পাচ্ছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: খুবই সত্যি কথা।
শামসুজ্জামান খান: এমনকি ইকবাল বলেছেন, যে অনুসন্ধানে জ্বলিতে থাকে সেই প্রকৃত মুসলমান। অনুসন্ধানে জ্বলিতে থাকা মুসলমান কয়জন আছে! অনুসন্ধান মানে সৎকর্ম, ধর্ম মানা, মানুষের কল্যাণ হচ্ছে কি না দেখা, মানুষের দুঃখ দূর করা, জগত এবং জীবন সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবা। এসবের কিছুই তো তথাকথিত ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে যারা এখন সমাজের প্রভুত্ব করতে চাইছেন, তাদের মধ্যে দেখছি না।
রাজু আলাউদ্দিন: শহীদুল্লাহ সাহেব ধর্মপ্রাণ ছিলেন। আমাদের এই ভূখণ্ডের সাহিত্যের স্বাতন্ত্রের কথা যখন উনি বলছেন, এই স্বাতন্ত্রের পক্ষে গিয়ে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের সঙ্গে যে হিন্দু এবং মুসলমান দুই ধর্মের মানুষ জড়িত, সেটাকে উনি আর আলাদা করে দেখলেন না। উনি বললেন, হিন্দু সাহিত্য এবং মুসলিম সাহিত্য হিন্দুর মন্দির এবং মুসলমানের মসজিদের মতো এক সম্প্রদায়ের একচেটে জিনিস নয়। বাস্তবে বাংলা সাহিত্য হিন্দু এবং মুসলমানের অক্ষয় মিলন-মন্দির হবে। 
শামসুজ্জামান খান: এটাই তো প্রকৃত ধার্মিকের এবং প্রকৃত ইতিহাসবিদের বক্তব্য। সেই বক্তব্য তিনি দিয়ে গেছেন। এবং সেই সাথে, আমি যেহেতু বাংলা একাডেমীতে কাজ করি, বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার পেছনে তার যে ভূমিকা, সেটাও বলি। যতদূর মনে পড়ে, ১৯৩৫/৩৬ সালে পূর্ববঙ্গের ময়মনসিংহে সাহিত্য সম্মেল হলো, সেই সাহিত্য সম্মেলনে তিনি বেশ জোরালোভাবে বললেন, আমাদের একটি বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে। সেই চেষ্টা তিনি অনবরত করে গেছেন। পরবর্তীকালে সেটি কার্যকরী হলো, যখন ভাষা আন্দোলনে আমাদের তরুণ ছাত্র এবং জনগণের মধ্য হতে কয়েকজন আত্মহুতি দিলেন, তখন ছাত্র সমাজেরও দাবি হলো– বাংলাভাষার গবেষণার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। ‘বাংলাভাষার গবেষণাগার’ প্রথমে এই নামটি ছিল। এটি একুশ দফার ষোল নাম্বার দফা ছিল। পরবর্তীকালে নামটি পরিবর্তন করে বাংলা একাডেমী নামকরণ করে ১৯৫৫ সনের ৩ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠিত হলো। এই প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শহীদুল্লাহর ভূমিকা অসাধারণ। সে জন্য আমরা তাকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করি। বর্তমানে আমি মহাপরিচালক হওয়ার পর বাংলা একাডেমীতে শহীদুল্লাহ ভবন নামে একটি ভবন তৈরি করেছি। সেই ভবনে বাংলা একাডেমীর মূল কার্যক্রম এখন চলছে। আমাদের আরো দুইজন পণ্ডিত, যারা বাংলাভাষার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, একজন আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ। তার নামে আমাদের বড় হলটির নামকরণ করা হয়েছে। এবং ড. মোহাম্মদ এনামুল হকের নামেও আমরা আরেকটি ভবন নির্মাণ করেছি। আগে বাংলা একাডেমীতে মাত্র বর্ধমান হাউজ এবং ভাঙাচোরা একটি প্রেস ছিল। এখন সেখানে বিশাল ভবন তৈরি করে এনামুল হক ভবন, শহীদুল্লাহ ভবন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সেমিনার কক্ষ, নভেরা কক্ষ এইসব করা হয়েছে। এছাড়াও উত্তরায় দুটি চারুকলা ভবন তৈরি করা হয়েছে কর্মকর্তা কর্মচারীদের বাসস্থান হিসেবে।
রাজু আলাউদ্দিন: ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর আরো একটা কথা আছে: “ধর্মনিরপেক্ষ এক স্বাধীন বাঙালি রাষ্ট্রের আহবান ধ্বনিত হলো তার কণ্ঠে। এই অঞ্চলে যেমন বৌদ্ধ, হিন্দু ও মুসলমানের স্মারকলিপি হয়ে আছে, প্রার্থনা করি তেমনই যেন নতুন রাষ্ট্রে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল নাগরিকের মিলনভূমি হয়।”

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর অবদান খুবই তাৎপর্যপূর্ণ
শামসুজ্জামান খান: যথার্থই বলেছেন। সেই কারণে আমরা মনে করি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর অবদান খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
রাজু আলাউদ্দিন: মানে মননশীল জায়গা থেকে তার ভূমিকা প্রায় প্রধান।
শামসুজ্জামান খান: তার দার্শনিকতা এবং বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সূত্রসমূহ উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বঙ্গবন্ধু এই বিষয়ে সচেতন ছিলেন। বঙ্গবন্ধু প্রায়ই ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর সংস্পর্শে আসার চেষ্টা করতেন। কখনো কখনো তার পুত্র শফীয়ূল্লাহ সাহেব বা তকীয়ূল্লাহ সাহেবের সাথে নানা বিষয়ে কথা বলে তিনি নিজেকে সমৃদ্ধ করতেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার এই কথার প্রমাণ পাওয়া যায়। শফীয়ূল্লাহ সাহেব নিজেই এক জায়গায় জানিয়েছেন। সম্ভবত ১৯৫৩ সালের দিকে সাপ্তাহিক আমার দেশ বলে একটা পত্রিকা ছিল। কংগ্রেস নেতা ভবেশচন্দ্র নন্দী সম্পাদিত সাপ্তাহিক আমার দেশ পত্রিকায় তিনি (ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ) বাংলাদেশ শীর্ষক একটা প্রবন্ধ লেখেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নজরে পড়েছিল সেটি। তিনি ডক্টর শহীদুল্লাহর জ্যেষ্ঠপুত্র জনাব শফীয়ূল্লাহকে ডেকে বললেন, স্যারের সাথে আমি একমত। তাকে এই কথাটি বলবেন। শফীয়ল্লাহ বঙ্গবন্ধুকে নিজে গিয়ে কথাটা বলার জন্য অনুরোধ জানান। 
শামসুজ্জামান খান: সবই সত্য কথা। আমাদের জানা কথা। শহীদুল্লাহ সাহেবের সাথে বঙ্গবন্ধু দেখাও করতেন। কিন্তু বেশিরভাগ বক্তব্যই তিনি শফীয়ূল্লাহ সাহেবের মাধ্যমে তার পিতার কাছে পৌঁছে দিতেন। এবং যদ্দুর শুনেছি বাংলাদেশ নামটাও তিনি শহীদুল্লাহ সাহেবের কাছ থেকে ঠিক করে নিয়েছিলেন যে, স্যার এই নামটা ঠিক হবে কি না।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি যেটা বললেন এটাই সত্যি। এটা শফীয়ূল্লাহ সাহেবের বইয়ের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। তার বাবাকে নিয়ে যেটা উনি লিখেছেন। “শেখ মুজিবুর রহমান একদিন শফীয়ূল্লাহ সাহেবকে সাথে নিয়ে দেখা করলেন জ্ঞানতাপসের (শহীদুল্লাহ) সঙ্গে। তার পদধূলি নিয়ে বললেন, স্যার, পূর্ব পাকিস্তান নাম পাল্টিয়ে বাংলাদেশ করে আপনার আশা পূরণ করব। দোয়া নিতে এলাম।” 
শামসুজ্জামান খান: একদম সত্য কথা। পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু এই বিষয়টাকে আরো একটু সম্প্রসারিত করেছিলেন। ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে তিনি আবুল ফজলুল সাহেব, ড. এনামুল হক এবং আরো কয়েকজনকে একটা নাম দিতে বলেছিলেন যে, আমরা পূর্ব পাকিস্তানের কী নাম রাখতে পারি? নানা রকম নামের প্রস্তাব তারা করেছিলেন। সেখান থেকে বাংলাদেশ নামটা তিনি বেছে নিলেন এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘোষণা দিলেন: আজ থেকে এই দেশের নাম হবে বাংলাদেশ।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা কত সালের কথা বলতেছেন?
শামসুজ্জামান খান: যতদূর মনে পড়ে এটা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর তার প্রতি সম্মান জানাতে গিয়ে তখনই তিনি এই কথাটি উচ্চারণ করেছিলেন।
রাজু আলাউদ্দিন: বাংলাভাষাকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। এবার আমরা তার লেখার দিকে একটু নজর দিতে চাই, জামান ভাই। সেটা হলো, উনার থিসিস, যেটা ফরাসি ভাষায় লিখিত, প্যারিসে গিয়ে তিনি থিসিসটি সম্পন্ন করেন। চর্যাপদের দুই কবি কাহ্নপাদ এবং সরহপাদের উপর গবেষণা করেছেন। 
শামসুজ্জামান খান: এই গবেষণা করে তিনি চর্যাপদকে প্রথম বাংলাভাষার আদি নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেন।
রাজু আলাউদ্দিন: তিনিই বোধহয় প্রথম বাংলাভাষার বাইরে, মানে বিদেশি ভাষায় প্রথম পরিচিত করালেন। এটা কি সত্যি?
শামসুজ্জামান খান: হ্যাঁ, উনি এটাকে বাংলাভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন বলার চেষ্টা করলেন। অবশ্য রাহুল সাংকৃত্যায়ন তিনি দাবি করছেন যে এটা হিন্দি ভাষার প্রাথমিক নিদর্শন। কিন্তু শহীদুল্লাহ সাহেব এই বিষয়টা নিয়ে প্রায় চল্লিশ বছর যাবত গবেষণা করেছেন। লেখালেখি করেছেন। সেই গবেষণার ফলে এখন মোটমুটিভাবে সকলেই স্বীকার করেন যে বাংলাভাষারই আদি নিদর্শন হলো চর্যাপদ। এটি সম্ভবত তখনকার মোগল অঞ্চল, যেটি বর্তমানে বিহারের কাছাকাছি একটা জায়গা, সেই জায়গায় বসবাসকারী যে সমস্ত বাঙালি আদিম অধিবাসীরা ছিল তাদের ভাষায় এই চর্যাপদ রচিত হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: ডক্টর আনিসুজ্জামান, উনার সঙ্গে একবার আমার এই বিষয়ে আলাপ হয়েছিল। উনি রাহুল সাংকৃত্যায়নের দাবিটিকে আবার পুরোপুরি নাকচও করে দিচ্ছেন না এই যুক্তিতে যে, ওই সময় অনেকগুলো ভাষা তৈরি হচ্ছিল এবং এরা পরস্পরের এত কাছাকাছি ছিল যে একটা ভাষার সাথে আরেকটা ভাষার অনেক সাযুজ্য আছে। একই গোত্রের ভাষা। তো শহীদুল্লাহ সাহেব তো প্রমাণ করেছে, চর্যাপদ বাংলাভাষার আদি নিদর্শন। আমার প্রশ্ন হলো এটা কি আসলেই বাংলাভাষার আদি নিদর্শন? নাকি একই সঙ্গে অন্য ভাষারও আদি নিদর্শন?
শামসুজ্জামান খান: এখন পর্যন্ত এই প্রশ্নটা এখনো জোরালোভাবে আসেনি। বা নিষ্পত্তি করার খুব চেষ্টা করা হয়নি। আমরা জানি যে, ১৯০৭ সনে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবার থেকে এটি উদ্ধার করেন। সেন রাজাদের আমলে বৌদ্ধদের উপর যে অত্যাচার হয়েছিল, সেই অত্যাচারের ফলে বৌদ্ধরা পালিয়ে গিয়েছিল। আদিম বাঙালিরা ছিল বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। সম্ভবত তারাই এই চর্যাপদগুলো লিখেছিলেন। এবং তারাই এগুলো নেপালের রাজ দরবারে রেখে গেছিলেন। অন্য ভাষার দাবি এখনো জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আমরা এটা জানি না। তবে এটা খুবই সম্ভব যে, প্রাকৃত ভাষা থেকে বা মধ্যভারতীয় আর্য ভাষা থেকে, ওই একটা পর্যায় থেকে যদি এটাকে বিবেচনা করা হয় তাহলে প্রাথমিকভাবে অন্য ভাষারও আদি নিদর্শন এটা হতে যে পারে না, এমন নয়।
রাজু আলাউদ্দিন: চর্যাপদ নিয়ে ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর গবেষণাটি বেরিয়েছে। এই গবেষণাটি কি বাংলায় অনুদিত হতে পারত না? আমাদের এখানে তো ইংরেজি থেকে অনেক অনুবাদ করা হয়। পরিচিতদের মধ্যে ফরাসি জানা এমন কেউ কি নেই? যেমন হতে পারতেন বাংলা একাডেমীর সাবেক ডিজি মাহমুদ শাহ কোরাইশী। উনিই যে হতে হবে এমন না। কিন্তু এটা কি করানো যেত না? 
শামসুজ্জামান খান: এটা আমি খোঁজ নিয়ে দেখব অন্য কোনোভাবে করানো যায় কি না। কারণ ফরাসি দেশেও এখন বাংলাভাষা অনেকেই খুব ভালো জানেন। তাদের দিয়ে করালে আরো ভালো হবে। আমরা একজন ফরাসিকে এখানে আনব। তারপর বিষয়টি নিয়ে তার সাথে কথা বলে দেখব।
রাজু আলাউদ্দিন: সম্প্রতি চর্যাপদ নিয়ে একটা লেখা লিখতে যাওয়ার আগে কিছু রসদ খুঁজতে গিয়ে দেখলাম, ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর এই বইটি পাঠ করেছিলেন একজন জগত বিখ্যাত লেখক, অক্তাবিও পাস। এবং তার লেখায় এই রেফারেন্সটি আছে। এই বইটির কথা আছে।
শামসুজ্জামান খান: এটা তো খুবই ইন্টারেস্টিং। এটা আমার জানা ছিল না।
রাজু আলাউদ্দিন: আমি আপনাকে লেখাটার কপি দেব।
শামসুজ্জামান খান: অক্তাবিও পাসের এই বক্তব্য আমরা যদি পাই তাহলে ভালো হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: নিশ্চয় নিশ্চয়। যেটা বলতে চাচ্ছিলাম সেটা হলো, আমাদের দুঃখটা হলো, জগত বিখ্যাত একজন লেখক, উনি এটা পড়েছেন শুধুমাত্র রেফারেন্সের কারণেই আমরা জানি। নিশ্চয় আরো অনেক বড় বড় লেখক পড়েছেন ফরাসি ভাষায়–আমরা জানি না সেসব খবর। আমাদের দুর্ভাগ্য হলো, আমাদেরই একজন বাঙালি লেখকের লেখা সম্পর্কে আমাদের নিজেদের কোনো ধারণা নেই, রচনাটি অনূদিত হয়নি বলে। 
শামসুজ্জামান খান: তাছাড়া বিষয়টি অনেকেই মনে করেছে খুব খটোমটো একটা বিষয়, তাই ওখানে ঢুকতে চায়নি।
রাজু আলাউদ্দিন: সেটাও হতে পারে। সেটাও হতে পারে। আমার মনে হয় এটা অনুবাদ হওয়া উচিত।
শামসুজ্জামান খান: ফরাসি জানা বাঙালি আমাদের এখানে বলতে গেলে নেই-ই। ইদানীংকালে হয়ত কেউ কেউ হয়েছে। যখন ওই বই বেরিয়েছে তখন কেউ ছিল না। আরেকটা বিষয় হতে পারে, যেহেতু শহীদুল্লাহ সাহেব নিজেই চর্যাপদ নিয়ে এত লেখালেখি করেছেন, প্রায় চল্লিশ বছর ধরে লেখালেখি করেছেন, সে জন্য অনেকে মনে করেছে, ফরাসি ভাষায় কিভাবে লেখা হয়েছে সেটা আমাদের বাংলাভাষীদের জানার প্রয়োজন নেই। এটা হয়ত ভেবে থাকতে পারে।
রাজু আলাউদ্দিন: এটাও হতে পারে। কিন্তু এটা তো ঠিক যে ফরাসি ভাষায় প্রথম চর্যাপদ অনূদিত হলো তার মাধ্যমে। এটা যত অল্পসংখ্যকই হোক না কেন। এটা একটা বড় কৃতিত্ব। দ্বিতীয় হলো, ওইটা শুধু অনুবাদই ছিল না, ওইটার ভেতর টিকা-টিপ্পনী, চর্যাপদের দর্শন আরো নানান দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। এই অর্থেও এটা গুরুত্বপূর্ণ। এখন যে বিষয়টি জানতে চাই, শহীদুল্লাহ সাহেবের সাহিত্যকর্মের কোন কোন দিক অনালোকিত রয়ে গেছে, যেগুলো আলোচিত হওয়া উচিত বা যেগুলো নিয়ে আমাদের চর্চা করা দরকার বলে আপনি মনে করেন? 
শামসুজ্জামান খান: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে আমাদের বিশেষ আলোকপাত করা দরকার। কারণ, তার মতামতের সঙ্গে অনেক ঐতিহাসিকের মতামতের পার্থক্য আছে। কিন্তু দেখা গেছে, শহীদুল্লাহ সাহেবের অনুমানশক্তি, কোনো একটা ঘটনা কখন ঘটেছে, সেটা অনুমান করার ক্ষেত্রে তিনি যেটা অনুমান করেছেন, পরবর্তীকালে সেটাই সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: যাকে আমরা বলতে পারি কবিসুলভ ইন্টুইশন।
শামসুজ্জামান খান: ইন্টুইশনের এক অসাধারণ ক্ষমতা তার মধ্যে ছিল। এটা পারিপার্শ্বিকতার উপর নির্ভর করে। যেখানে তথ্য পাওয়া যায় না, পারিপার্শ্বিক অনেক অবস্থা বুঝেই কিন্তু তার একটা সময়কাল বা নাম ইত্যাদি নির্ধারণ করা সম্ভব হয়। শহীদুল্লাহ সাহেবের সেই ব্যাপারে একটা অসাধারণ ক্ষমতা ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: শহীদুল্লাহ সাহেবের তো অনেকগুলো অনুবাদও ছিল। যেমন হাফিজের কবিতা উনি অনুবাদ করেছেন। ইকবালের কবিতা অনুবাদ করেছেন।
শামসুজ্জামান খান: এইসব বিষয় নিয়ে আমি খুব বেশি বলতে পারব না। কারণ আমি এইসব বিষয় জানি না। এবং তার এই অনুবাদ পঠিত হয়েছে বটে কিন্তু কতটা গৃহীত হয়েছে সে সম্পর্কে আমার পরিষ্কার ধারণা নেই।
রাজু আলাউদ্দিন: আর হযরত মুহাম্মদ সা. এর একটা জীবনী উনি লিখেছিলেন।
শামসুজ্জামান খান: সেটার সঙ্গে আমার কোনো পরিচয় ঘটেনি। এটা নিয়েও আমি কিছু বলতে পারব না।

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP