বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» মুক্তমত »একজন বিদগ্ধ জনের কথা
একজন বিদগ্ধ জনের কথা

Thursday, 25 January, 2018 05:37pm  
A-
A+
একজন বিদগ্ধ জনের কথা

একজন বিদগ্ধ জনের কথাঃ
আবু বকর সিদ্দিক

মানুষ বিখ্যাত হতে চায় তার কাজ দিয়ে, চেষ্টা দিয়ে অধ্যবসায় দিয়ে। এটা শতসিদ্ধ, এর মাঝে কোনো বিতর্ক নেই। কিছু বিখ্যাত মানুষের আবার ভাগ্যও সহায়তা করে থাকে যাদের মাঝে আবার বিদগ্ধ জনও থাকে। কারণ তাদের অভিজ্ঞতার ভান্ডারে ভরপুর থাকে জীবনের আনন্দ-বেদনা, পাওয়া-নাপাওয়ার বাস্তব রসবোধ। তাই বিখ্যাতজনের কথা, পরামর্শ, উপদেশ আমরা শুনি এবং তাদের মতো হতে চেষ্টা করি। তাদেরকে মনে রাখি। কিন্তু বিখ্যাত জনের বাইরেও বিদগ্ধ জন থাকতে পারে। সাধারণের মাঝে অতি সাধারণ। আমার মা তেমনি একজন ছিলেন। যদিও তিনি অক্ষরজ্ঞান সম্পন্না ছিলেন না। আজ পরিনত বয়সে পরলোকবাসিনী মায়ের কথা মনে পড়লে তার বাস্তব জীবনবোধের চিত্রগুলি আমার মানসপটে ভেসে ওঠে। এ লেখার অবতারণা মাকে নিয়ে নয়। এ লেখার উদ্দেশ্য ঝিনাইদহের এমন একজন বিদগ্ধ মানুষ নিয়ে, যাকে সকলেই ভুলে গেছে। অবশ্য ভুলে যাওয়ারই কথা, কারণ তিনিতো বিখ্যাত কেউ ছিলেন না, বিখ্যাত হতেও চাননি, সে সুযোগও তার ছিলো না। আমি বলছি বান্ঠার কথা, সে মেথর সম্প্রায়ভূক্ত ছিলো।

ঝিনাইদহ শহরে চল্লিশ/পঞ্চাশ বছর আগে যাদের জন্ম তারা হয়তো তাকে দেখে থাকবেন। এখন হয়তো আর তাকে কারো মনেও নেই। মনে রাখার মতো সখ্যতাও হয়তো তার সাথে ছিলো না কারো। কিন্তু আমার সাথে কেন জানিনা তার সেই ছোট্ট বয়সেই একট সখ্যতা গড়ে উঠেছিলো। হয়তো তার কারণ আমাদের বাড়ীর পেছনে জেলখানার প্রচীরের নিকটে প্রায় সময়ই তিনি অবস্থান করতেন। জেলখানার খোলা শৌচালয়টি পরিস্কার-পরিচ্ছন্নের দায়িত্ব তারই ছিলোযে। সে কারণে তার সাথে আমার না চাইলেও প্রায়ই দেখা হতো। সে আমাকে ভালোবাসতো আবার সমীহও করতো, এর পেছনের কারণ হয়তো স্বাধীন পাকিস্তানের মুসলিম (উঁচ্চ বর্ণ ?) সম্প্রদায়ের শিশু বলে। যাহোক ৬১-৬২ সালের দিকে ওয়াজির আলী স্কুলের প্রাইমারি সেকশনে প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়তাম। তখন থেকে রাস্তায় মাঝে মাঝে তার সাথে প্রায়ই দেখা হতো এবং মাতাল অবস্থায় পথ চলতে চলতে হঠাৎ করে আমার পথরোধ করে দাঁড়াতো কিস্তু পরক্ষণেই পথছেড়ে দিতো; প্রথম দিকে আমি ভয় পেয়ে যেতাম, যদিও তখন থেকেই সে আমার চোখে একজন বিশেষ মানুষ হয়ে ওঠে। সে সারাক্ষণ মাতলামির মধ্যে থাকলেও মাঝে মধ্যে যে সংলাপ বলতো তার মর্মার্থ তখন বুঝতাম না এখন বুঝি।

পথের মাখানে দাঁড়িয়ে একদিন বললো, “আরে বাবু-আইয়ূব খানতো লেফট্ রাইট করতে করতে প্রেসিডেন্ট হয়ে গেলো, হামি বান্ঠা বান্ঠাই রয়ে গেলাম” (তার বাংলা বলনে উর্দু বা হিন্দি টান থাকতো)। সেদিন এর অর্থ বুঝিনি অনেক পরে বুঝেছি। সে বলতে চেয়েছে একজন সেপাই ক্ষমতার অপব্যবহার করে শীর্ষে যেতে পারে কিন্তু বান্ঠাদের সারা জীবন মল পরিস্কার করেই কাটাতে হবে।

আর একদিনের কথা, পথের মাঝে দাঁড়িয়ে আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো, “বাবু- বান্ঠা অত লুজ ম্যান নয়”। বলে চলে গেলো সোজা পথে। এই কথার অর্থ : সে দূর্নিতীবাজ, ঘুষখোর বা নীতিহীন নয়। তাকে আমি কখনো কারো কাছে হাত পেতে টাকা চাইতে দেখিনি এবং অন্যায় কোনো কাজের সাথে সে যুক্ত থাকতো না, যা তার সতীর্থ (স্বজাতি) অন্যান্যরা করতো হরহামেশায়।

অন্য একদিনের ঘটনা, সম্ভবত কলাবাগানে আমার বন্ধু আলমদের বাসা থেকে রাস্তা আসতেই বান্ঠার মুখোমুখি পড়ে গেলাম; সে লম্বা একটা স্যালুট আমাকে ঠুকে দিয়ে বললো- “একদিন ছকালে এক মেম সাহেবের সাথে দিখা হয়ে গেলো, মেমসাহেব হামাকে ইংরেজিতে বললেন, গুড মর্নিং, হামি বললাম, ঠ্যাঙ্ক ইউ”। বান্ঠা যে ভালো ইংরেজি জানতো এটা তার প্রমাণ। কিন্তু কিভাবে ইংরেজি শিখেছিলো তা জানা নেই। প্রকৃতপক্ষে সেতো নিরক্ষরই ছিলো।

সর্বশেষ মনে পড়ে একটি ঘটনা, হতে পারে স্বাধীনতার পরে, তখন তার সাথে আর আগের মতো দেখা হয় না। জেলখানার পেছনের শৌচালয়ের দায়িত্বেও তাকে দেখা যেতো না। নকুল সরকারের দেশী মদের দোকান বাজার পট্টি থেকে পুরাতন হাটখোলা বর্তমান স্থানে স্থানান্তর হয়েছে। একদিন কোনো কারণে ঐ দোকানের সামনে দিয়ে যাচ্ছি হঠাৎ সেখানে মদ কিনতে আসা বান্ঠা আমকে দেখে এগিয়ে এলো এবং শুনিয়ে শুনিয়ে বললো-“বাবু, কতো সরকার এলো গেলো নকুল সরকার রয়েই গেলো।” অর্থাৎ সরকার পবির্তন হলেও নকুল সরকারের মদের দোকান একই রকম থাকে ওদের মদ সাপ্লাইয়ের জন্য।

এ রকম আরো কতযে কথা সে বলেছে তা আর মনে নেই। কিন্তু তার চলা ও বলার মাঝে এক ধরণের আক্ষেপবোধ কাজ করতো বলে আমার মনে হয়েছে। তার মধ্যে দুঃখবোধ যেমন ছিলো তেমনি তা আবার রসবোধ দিয়ে ডেকে রাখারও আশ্চার্য ক্ষমতা ছিলো। সে জানতো সবচেয়ে নীচু জাতের মানুষ সে আর সে অবস্থানকে মেনে নিয়ে জীবন কাটালেও মানুষ হিসেবে নিজেকে অন্যের থেকে ছোট ভাবেনি কখনো। যদিও সেকথা ঢাকঢোল পিটিয়ে বলেনি সে, কিন্তু আমার নিবিড় পর্যবেক্ষণে একথাই সত্য বলে মনে হয়েছে। তার অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আমাকে মুগ্ধ করতো। তার বাস্তব জীবন ও রসবোধ তার স্বগোত্রীয়দের থেকে উপরে নিয়ে গেলেও তাদের সাথেই রয়ে গেছে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। হয়তো এটাই তার নিয়তি ছিলো, তাই হয়তো সে মাতলামির মাঝে নিজের দুঃখবোধকে লুকিয়ে রাখতো সারাক্ষণ আর স্থুলভাবে মনের তীর্যক কথাগুলো প্রকাশ করে অন্তরের জ্বালা জুড়াতো।


এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP