বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» মুক্তমত »সমাজটা যাচ্ছে কোথায়?
সমাজটা যাচ্ছে কোথায়?

Wednesday, 17 January, 2018 06:25pm  
A-
A+
সমাজটা যাচ্ছে কোথায়?
তারিকুল ইসলাম পলাশ

খুব প্রয়োজন না হলে বাইরে যেতে ইচ্ছা হয় না। একজন প্রিয় মানুষের শেষ বিদায়ের জন্য ‘জানাজা’ ও গোরস্থানে যেতে হবে তাই সাথে কিছু কাজ জুটিয়ে নিলাম। বন্ধের দিন একটু আগেই বেরিয়ে পড়েছি সময়টা কাজে লাগাতে হবে তাই রাস্তার পাশে লাগানো বৃক্ষগুলো দেখভাল করার জন্য পায়ে চাপা একটি রিক্সা খুঁজছি। মডার্ণ মোড়ে এসে একপাশে চকচকে একটি রিক্সা ও বয়োজ্যেষ্ঠ একজন ছিমছাম চালকের চোখে চোখ পড়লো। এর মাঝে একজন তরুণ চিৎকার করে বললো, ‘এই রিক্সা যাবে?’ তিনি উত্তর দিলেন না। ওনার রিক্সায় চেপে (জনাব মোয়াজ্জেম ভাই, সাবেক রিক্সা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি) গাছগুলি পর্যবেক্ষণ করছি। খাঁচা ভেঙ্গে তৃণভোজী প্রাণিরা নষ্ট করেছে অনেক গুলি বিরল প্রজাতির অমূল্য বৃক্ষ। কথার ছলে একে অপরের ভালো-মন্দের খোঁজ-খবর নেওয়া হলো। তার কাছ থেকে জানতে পারলাম ইঞ্জিন চালিত রিক্সা চালকের শারীরিক ক্ষতি ও ঝুঁকির কারণসমূহ। এর মাঝে পৌঁছে গেলাম আলিয়া মাদ্রাসার ময়দানে। অন্য মসজিদের মুসল্লীদের আগমণের জন্য সবাই অপেক্ষা করছে। মূর্দার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা যারা একদিন আগেও তার কষ্টের কথা শুনে কেঁদে বুক ভাসাতো তারাই হাসি ঠাট্টা করছে। জানাজায় দাঁড়ালাম পাশ হতে সেই বন্ধুরা জুতা খুলে প্যান্ট উঁচু করে দাঁড়াতে বললো। প্যান্টের কোমর ধরে টেনেটুনে উঁচু করলাম, জুতায় নাপাক কিছু লেগে নেই তাই খুললাম না, ভর্ৎসনা শুনলাম।

জুতার সোলটা একটু খুলে গেছে, রং করা হয়না অনেক দিন। মোড়ের উপর বটতলাতে গেলাম, আমাদের ষাটবাড়িয়া গ্রামের অনেকে বসে কাজ করছে পৌরসভা কর্তৃক নির্মিত সুন্দর সেডের নিচে। তাদের কাছে রক্ষিত অতিরিক্ত একটি স্যান্ডেল পায়ে গলিয়ে মোড়ের আশপাশ হতে কিছু কেনাকাটার কাজ শেষ করে এসে দেখি পরম মমতায় নিপুণ শিল্পীর ন্যায় তিনি আমার জুতা জোড়া নিয়ে খেলছেন, মুহূর্তে করে ফেলেছেন নতুনের মতো চকচকে। মুখে হাসি নিয়ে কথা হচ্ছে উভয়ের মাঝে, একজন তরুণ এসে তার পায়ের স্যান্ডেল জোড়া অনেকটা ছুড়ে দিয়ে বললো ‘কালি করে দে’, ধম করে তার মুখটি কালো হয়ে গেল। শ্রমিকের ঘাম ঝরানো সৎ আয় দিয়ে যারা কোনো রকমে দিন অতিবাহিত ক’রে সেবা দিয়ে যাচ্ছে নীরবে নিভৃতে, পরবর্তী প্রজন্ম তাদেরকে অর্থের মানদন্ডে নীচু ভাবছে।

হাতে সময় আছে কিন্তু পথে আড্ডা দেওয়ার মতো কাউকে পেলাম না, আদর্শপাড়ার বাড়িতে যেতে ইচ্ছা হলো। ঢুকতেই দেখি আামাদের বাড়ির সামনে প্রশস্ত রাস্তার মুখে রাতের আধাঁরে অবৈধ প্রাচীর নির্মিত হয়েছে তার উপর বসে কিছু কচি মুখের ছেলেরা কাঁধে স্কুলের ব্যাগ ঝুলানো, সিগারেট ফুঁকছে আর একে অপরকে আদর করে ‘শুওরের বাচ্চা’ বলে সম্বোধন করছে। কারো কোনো দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই মজে আছে হাতের বিস্ময়কর যন্ত্রের মাঝে তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহার করে। কৌতুহল মেটাতে তাদের বাপ চাচার পরিচয় জানতে চাইলাম; তার উত্তর পেলাম ‘তা জেনে আপনার লাভ!’

কোনটা লাভ আর কোনটা ক্ষতি, কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল একাকার হয়ে সব গা সহা হয়ে গেছে। যে শহর ছাড়া অন্য কোথাও থাকার কথা কল্পনাও করিনি কোনোদিন, সেই অতি চেনা পরিচিত সমাজ আজ অচেনা হয়ে যাচ্ছে, মাঝে মধ্যে মন চায়না এখানে থাকতে, যেখানে জীবনের মূল আধার বৃক্ষ অবহেলিত, যেখানে বন্ধুত্ব মাকাল ফলের ন্যায়, পশু প্রাণীতে রূপান্তরিত হয়েছে আর মানুষ পশুতে, যে সমাজে সৎ উপার্জন মূল্যহীন, প্রকৃত শ্রমিকের মর্যাদা নেই, নতুন প্রজন্ম মারাত্মকভাবে বিপথগামী, যেখানে ‘বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে’, যেখানে ক্ষণে ক্ষণে ন্যায়-নীতি অন্যায়ের কাছে পরাভূত, সত্য বিলীন হয় মিথ্যার কাছে, ভালো-মন্দের এক রঙ, অবৈধ’র দাপটে বৈধতা কোনঠাসা, সত্য থেকে মিথ্যা কথন সমুজ্জল, কালো টাকার দাপটে সাদা টাকা ম্লান। রথ চলেছে উল্টো পথে, এসব দেখে সেখানে অপ্রয়োজনীয় মানুষ হিসেবে আগাছার মতো থেকে লাভ কি? আর দেশের বড় বড় শহর মানেই যেন যানজট, বাতাসে অক্সিজেনের পরিমান কম, বুক ভরে নিশ্বাস নেওয়া যায় না, পথে দেখা মেলে শুধু অপরিচিত মুখ। নির্মল পরিবেশ, সম্মান নিয়ে বাঁচতে এর থেকে গ্রাম অনেক ভালো। হয়তোবা একদিন চলে যাবো সেখানেই অথবা অন্য কোথাও অন্য কোনো খানে....
https://www.facebook.com/822080891254891/photos/a.876266752502971.1073741828.822080891254891/1402506516545656/?type=3&theater

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP