বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» মুক্তমত »‘মেড ইন চায়না, বেশিদিন যায় না’
‘মেড ইন চায়না, বেশিদিন যায় না’

Saturday, 15 October, 2016 10:27am  
A-
A+
‘মেড ইন চায়না, বেশিদিন যায় না’
প্রভাষ আমিন : ভেতরে ভেতরে হয়তো আরও আগে থেকেই প্রস্তুতি চলছিল। তবে চীনের দৃশ্যমান বদলটা ২৫ বছরের। আমাদের ছেলেবেলায় বিশ্ব চীনসর্বস্ব ছিল না। আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশে ‘চাইনিজ জিনিস’ বলতে পাওয়া যেত মোরগ মার্কা মশার কয়েল, সেভেন ও ক্লক ব্লেড, সুইয়ের মতো কিছু আইটেম। তখন জাপানি জিনিসের খুব চাহিদা ছিল। মান উন্নত, দামও বেশি। জাপানি জিনিসের মধ্যে সবচেয়ে সহজলভ্য ছিল ‘রেডলিফ’ বল পেন। তবে সেটাও আমাদের কাছে মহার্ঘ্য ছিল। বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, এখনকার মতো তখন বল পেন ওয়ানটাইম ছিল না। একটা বল পেনে বছর পেরিয়ে যেত। ‘রেডলিফ’-এর দাম ছিল সম্ভবত ১২ টাকা। আর এর রিফিল পাওয়া যেত ৫ টাকায়। এখন শুধু বল পেন নয়, জীবনের প্রায় সবকিছুই ওয়ানটাইম।
৯০ দশকের শুরু থেকেই শুরু হয় চীনের সর্বগ্রাসী ও সর্বব্যাপী বাণিজ্য। আপনার চাহিদামতো সবচেয়ে কম দামে, আপনি যা চান, তাই বানিয়ে দেবে চীন। ব্র্যান্ডের কোনও বালাই নেই। প্রয়োজনে আপনার নামে প্রোডাক্ট বানিয়ে দেবে। তাদের চাই শুধু অর্থ। ‘মেড ইন চায়না’ই সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ডিং। শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বই এখন চীন নির্ভর। সুই থেকে জাহাজ; সবই বানায় তারা। এখনও রাজনীতির মতো বিশ্ব অর্থনীতিও যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক। তবে চীন দ্রুতই মার্কিন অর্থনৈতিক আধিপত্যে ভাগ বসাতে এগিয়ে যাচ্ছে। বছর পাঁচেক আগে একবার যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে মনটানার মতো নিরিবিলি রাজ্যের গ্রামের বিরান ভূমিতে গিয়েও চীনা পণ্য দেখে চমকে গিয়েছিলাম। এই যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ট্রাম্প ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগান দিয়ে নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে চাইছেন; তার সেই স্লোগান লেখা ক্যাপ উল্টেপাল্টে খুঁজলে দেখবেন কোথাও না কোথাও ‘মেড ইন চায়না’ লেখা। ফেসবুকে এক বন্ধু বললেন, এমনকি সৌদি আরব থেকে আমরা যে টুপি, তসবি, জায়নামাজ কিনে আনি; তাও চীনের বানানো। খালি একটাই বদনাম, ‘মেড ইন চায়না, বেশিদিন যায় না’। কিন্তু দাম এত কম যে মান নিয়ে মাথা ঘামানোর টাইম নেই কারও। এ কথায়ও আপত্তি জানালেন এক বন্ধু।
চীনের মহাপ্রাচীর তো টিকে আছে হাজার বছর ধরে। আসলে চীন সব পারে। তারা দীর্ঘস্থায়ী মহাপ্রাচীরও বানাতে পারে, আবার আইফোনের ওয়ানটাইম কপিও বানাতে পারে।
একটা কৌতুক বলি, এক ছাত্র পরীক্ষার খাতায় ‘অরিজিনাল’ শব্দের বিপরীত শব্দ লিখেছে ‘চাইনিজ’। কৌতুক কৌতুকই। সিরিয়াস হওয়ার কিছু নেই। আসল ব্যাপারটা হলো আপনি কী চান, কত দামে চান? এই যে কাস্টমাইজ বাণিজ্য, এটাই তাদের এগিয়ে দিয়েছে অনেক। চীনের অর্থনীতি ফাটকাবাজির নয়; শিল্পের, উৎপাদনের। তাই পণ্যের মান যাই হোক; চীনের অগ্রগতি, উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই।
একাত্তরে চীন আমাদের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে। বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক মৃত্যুর পরই কেবল তারা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে এখন চীন আমাদের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সব মেগা প্রকল্পেই আছে চীনের ছোঁয়া। উন্নয়নের রাজপথে এগিয়ে যেতে চীনকে এখন বাংলাদেশের পাশেই চাই। স্বার্থটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তাই সময় সামনে তাকানোর, তবে অতীতটা মনে রাখতে হবে। তবে কেউ যেন একাত্তর প্রসঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার আর পাকিস্তান প্রসঙ্গ গুলিয়ে ফেলবেন না। তাদের অপরাধ আর চীনের ভূমিকা এক নয়।
শুধু বাণিজ্য নয়, চীন এখন রাজনীতিতেও আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে। বাংলাদেশের যেমন চীনকে দরকার, তেমনি চীনেরও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে বাংলাদেশকে দরকার। চীনের পাশাপাশি বাংলাদেশের দরকার ভারতকেও। তাই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে চীন-ভারত সম্পর্কটাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে। তাই চীনকে বেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে যেন ভারত গাল না ফোলায় সেটাও মাথায় রাখতে হবে। ভারতীয় মিডিয়া সূত্রে আমরা জানি, চীনা রাষ্ট্রপতির বাংলাদেশ সফরকে গভীর মনোযোগ দিয়ে ফলো করছে ভারত। চীন-ভারতের ক্ষেত্রে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্যটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করে পাকিস্তানকে একটা দারুণ শিক্ষা দিতে পারে বাংলাদেশ।
নব্বই দশকের শুরুতে ভেঙে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন, পতন ঘটে সমাজতন্ত্রের। কিন্তু তখন থেকেই নবযাত্রা চীনের। চীন খুব কৌশলে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের বদলে নিয়েছে। তাই এখনও সেখানে টিকে আছে সমাজতন্ত্র। চীনে সমাজতন্ত্র টিকে আছে, কিন্তু তা উত্তর কোরিয়ার মতো বন্ধ নয়। টিকে থাকার, এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্রটা এখানেই। যে খোলা হাওয়া ঝড় হয়ে উড়িয়ে নিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্র, উন্নয়নের পালে সেই খোলা হাওয়া লাগিয়ে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে চীন। সমাজতন্ত্রে থেকেও বাজার অর্থনীতির চতুর খেলোয়াড় চীন।
ছেলেবেলায় আমরা চীনকে চিনতাম দুটি কারণে- মহাপ্রাচীর আর সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশ। আরেকটা কৌতুক বলি- বিশ্বে দুর্ভিক্ষ শুরু হবে কবে? যেদিন থেকে চীনের লোকজন কাঠি ফেলে হাত দিয়ে খাওয়া শুরু করবে। এই কৌতুকও এখন বদলে গেছে। চীন এখন আর দুর্ভিক্ষের শঙ্কা নয়, সমৃদ্ধির উদাহরণ। চীনে এখন ১৩০ কোটি মানুষের ২৬০ কোটি কর্মীর হাত।
কোনও কোনও পণ্যের ক্ষেত্রে সত্যি হলেও সব ক্ষেত্রে শিরোনামটি সত্যি নয়। মহাপ্রাচীর তার মহাপ্রমাণ। আশা করি, বাংলাদেশের সাথে দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও শিরোনামটি মিথ্যা প্রমাণিত হবে। চীনের সঙ্গে আমাদের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক হাজার বছরের পুরনো। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং বাংলাদেশ সফরের প্রাক্কালে তার এক লেখায় এ সম্পর্কের ইতিহাস টেনেছেন। চীনের ফাহিয়েন ও হিউয়েন সাং বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের সন্ধানে এ অঞ্চলে এসেছিলেন। আবার বাংলাদেশের অতীশ দীপঙ্কর চীনে গিয়ে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করেছেন। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পথ ধরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এখন বাণিজ্যে বসত গড়ুক। চীনের প্রেসিডেন্ট তার লেখায় উল্লেখ করেছেন- বাংলাদেশ ও চীনের দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্য ২০০০ সালে ছিল ৯০ কোটি ডলার। ২০১৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৭০ কোটি ডলার। বার্ষিক বৃদ্ধির হার ২০ শতাংশ। তবে এ বাণিজ্যে ঘাটতি অনেক। ঘাটতি কমিয়ে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও ভারসাম্যপূর্ণ করতে চীনের সহায়তা প্রয়োজন। চীনের বিশাল বাজারে যদি প্রবেশাধিকার পায় বাংলাদেশ, তাহলেই কেবল ভারসাম্য আসবে। আশা করি বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক ভারসাম্য নিয়ে টিকে থাকবে যুগ যুগান্তরে। সমৃদ্ধির স্বার্থেই চীনের ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ নীতিতে সংযুক্ত হব সবাই। চীনের রাষ্ট্রপতির সফরের প্রাক্কালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এই সফরে সহযোগিতার নতুন যুগ শুরু হবে। আর চীনের রাষ্ট্রপতি তার লেখাটি শেষ করেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, চীন ও বাংলাদেশের যৌথ প্রচেষ্টায় দুই দেশের সহযোহিতা বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও সম্প্রসারিত হবে এবং এ সহযোগিতার সোনালি ফসল ঘরে তুলতে আমরা সক্ষম হব।’ এই আশাবাদ ব্যক্ত করে। আমাদেরও তাই বিশ্বাস।
তিন দশক পর চীনের কোনও প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীনের প্রেসিডেন্টের সফরে স্বাক্ষরিত হয়েছে ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক। উদ্বোধন হয়েছে ৬টি প্রকল্পের। টাকার অংকে যা ছাড়িয়ে গেছে ২ হাজার কোটি ডলার। এসব চুক্তি ও সমঝোতা ব্যবসা ও বিনিয়োগ, সাগর অর্থনীতি, ভৌত অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃষি বিষয়ে। উদ্বোধন করা ছয়টি প্রকল্প হলো- কর্ণফুলী নদীতে টানেল নির্মাণ, শাহজালাল সার কারখানা, ন্যাশনাল ডেটা সেন্টার, পায়রা ও চট্টগ্রামে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট স্থাপন। এর মধ্যে কর্ণফুলী নদীর নিচে টানেল নির্মাণের যে উদ্যোগ, তা বাংলাদেশের নতুন যুগে পদার্পণের স্মারক হয়ে থাকবে।
তবে অর্থ নয়, সাহায্য নয়; সবচেয়ে ভালো হয় আমরা যদি তাদের ২৫ বছরে বদলে যাওয়ার গল্পটা আমরা শিখে নেই। তাদেরও মানুষ বেশি, আমাদেরও। জনসংখ্যাকে বোঝা না বানিয়ে সম্পদ বানানোর জাদুটা শিখতে পারলে আর চীন কেন কারও সাহায্য লাগবে না আমাদের। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশও উন্নয়নের রাজপথে পা রেখেছে। বাংলাদেশের মানুষের আয় বেড়েছে। হতদরিদ্র মানুষ কমেছে। প্রায় সব সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের উন্নতি বিস্ময়কর। পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প আমরা নিজেদের টাকায় করতে পারছি। এখন প্রয়োজন জনসংখ্যাকে সম্পদ বানিয়ে উন্নয়নের ট্রেনকে আরও গতিশীল করা।


লেখক: অ্যাসোসিয়েট হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP