বাংলাদেশ টাইম

প্রচ্ছদ» স্পটলাইট »কী হয়েছিলো সেই রাতে সুফিয়া কামাল হলে?
কী হয়েছিলো সেই রাতে সুফিয়া কামাল হলে?

Friday, 13 April, 2018 01:18am  
A-
A+
কী হয়েছিলো সেই রাতে সুফিয়া কামাল হলে?
বাংলাদেশ টাইম : কী হয়েছিলো সেই রাতে সুফিয়া কামাল হলে? কেন একজন মেয়েকে চরম অপদস্থ হতে হলো? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই কীভাবে রোষের শিকার একটি মেয়েকে জনপ্রকাশ্যে নিয়ে এসেছিল? কেনই বা তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত না করে বহিষ্কার করে ইফফাত জাহান এশাকে? ছাত্রলীগই বা কেন এত তড়িৎ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এশাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে? তাকে অপদস্থ করার একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পাশাপাশি পুন:তদন্তের সিদ্ধান্তের পর এসব প্রশ্ন এখন সবার মনে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, সেসময় এশার জীবন রক্ষায় এমন সিদ্ধান্ত নেন তারা। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে, ওই অবস্থায় উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতেই তারা এশাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেন।

বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের পক্ষ থেকে গঠিত চার সদস্যের কমিটিকে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে।

তদন্তে এশা নির্দোষ প্রমাণ হলে ফিরে পাবেন ছাত্রলীগের পদ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে তদন্ত কমিটি গঠিত হবে, তাদের তদন্তে এশার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ না হলে ফিরে পাবেন ছাত্রত্ব। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবশ্য বলছে, পুরো ঘটনায় যে বা যারা দোষী প্রমাণিত হবেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কবি সুফিয়া কামাল হলের নেত্রীরা বলছেন, বিভিন্ন সময়ে হলের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে এবং দলের জুনিয়রদের সাথে একটু কঠোর হতে হয়, আর সেখান থেকেই এশার বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরী হয়েছিল। সেদিন সেই ক্ষোভ চূড়ান্ত রুপ ধারণ করে।

দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকেই মোর্শেদা আক্তার নামের মেয়েটি এশার রুমের জানালার কাচে নিজের পা কেটেছেন বলে মনে করছেন তারা

সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি, নেত্রীদের দ্বারা বিভিন্ন সময়ে তারা নির্যাতনের বিষয়টি মুখ বুঁজে সহ্য করলেও সে রাতে যখন গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে এক ছাত্রীর রগ কেটে দেয়া হয়েছে, তখন তারা ক্ষোভে ফেটে পড়েন।

যে ছাত্রীর রগ কাটা হয়েছে বলে গুজব ছড়ায় তিনিও ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তবে, মেডিকেল রিপোর্টে সুফিয়া কামাল হল শাখা-৪ এর ওই সহসভাপতি মোর্শেদার পায়ের রগ কাটা হয়েছে এমন কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।

হল সূত্রে জানা গেছে, সুফিয়া কামাল হলের পক্ষ থেকে কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন মোর্শেদা।

সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনায় ওবায়দুল কাদের আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠকে কোটা সংস্কারের সিদ্ধান্তের কথা জানানোর পর ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে সব হলে আন্দোলনকারী ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের আন্দোলন স্থগিত করার নির্দেশ দেয়া হয়। মোর্শেদাকে সেটা জানাতে নিজের রুমে ডেকে নিয়ে যান হল শাখার সভাপতি এশা।


সেসময় মোর্শেদা নিজের মুঠোফোনের রেকর্ডার অন করে এশার রুমে প্রবেশ করেন। এ নিয়ে তর্ক-বিতর্কের এক পর্যায়ে মোর্শেদাকে চড় মারেন এশা। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে এশার রুমের জানালার কাচ ভেঙ্গে ফেলেন মোর্শেদা, নিজের পা-ও কেটে ফেলেন। এরপর দ্রুতই গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে এশা মোর্শেদার পায়ের রগ কেটে দিয়েছেন।

মোর্শদাকে প্রথমে হল সংলগ্ন সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল এবং পরে ঢাকা বিশ্বিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। চিকিৎসা শেষে তাকে তার এক আত্মীয়ের বাড়িতে নেওয়া হয়।

সেসময় মোর্শেদার রক্তাক্ত পা দেখে তাৎক্ষণিকভাবে বিক্ষোভে নামেন ওই হলের কয়েক শ’ ছাত্রী।


মোর্শেদার রক্তমাখা পায়ের সেই ছবি মুহূর্তেই ফেসবুকে ভাইরাল হলে বিভিন্ন হল থেকে কয়েক হাজার ছাত্র বের হয়ে সুফিয়া কামাল হলের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। বঙ্গবাজার থেকে শুরু করে কার্জন হল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভকারী হাজারো শিক্ষার্থী। হলের ভেতরে স্লোগান দিতে থাকেন ছাত্রীরা, বাইরেও চলতে থাকে ছাত্রদের স্লোগান।

রাত দেড়টার দিকে প্রক্টর একেএম গোলাম রাব্বানীফ ওই হলে গিয়ে এশাকে হল থেকে বহিষ্কারের কথা জানান।


এর কিছুক্ষণের মধ্যেই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ এবং সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এশাকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়।

কিন্তু, এশাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের দাবিতে ছাত্রীরা আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকলে পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এশাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কারের কথা জানায়।

কিন্তু, তদন্ত না করে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কেন এশাকে বহিষ্কার করা হলো?

এ প্রশ্নের উত্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন: প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে আমরা ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সেসময় অামরা তথ্য পেয়েছিলাম যে এশা ওই ছাত্রীর পায়ের রগ কেটে দিয়েছে। ছাত্রীরা তাৎক্ষণিকভাবে এশাকে বহিষ্কারের দাবি তুলেছিল। সেসময় এশার জীবন ছিলো বিপন্ন। এশার জীবন রক্ষার্থে এবং সামগ্রিকভাবে সেসময় যারা এশার বিচার দাবি করেছিল, তাদের দাবির প্রতি সম্মান রেখেই আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে এশাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেই।

‘তবে, পরে জানতে পেরেছি বিষয়টি গুজব,’ উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন: এখন আমরা হলকে তদন্ত কমিটি গঠন করতে বলেছি। সেই তদন্ত কমিটি যে প্রতিবেদন দেবে তার ভিত্তিতে আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবো। সেখানে এশা নির্দোষ প্রমাণিত হলে তাকে ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দেয়া হবে। তবে যারা তাকে নির্যাতন করেছে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেবো।

ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন বলেন: পরিস্থিতি তখন পুরোপুরি আমাদের নিয়ণ্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। সেসময় এশার জীবন বাঁচানোই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব মনে হয়েছে। তার জীবন রক্ষার্থে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে কথা বলে এবং নিজেদের মধ্যে তাৎক্ষণিক আলোচনার ভিত্তিতে আমরা এশাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেই।

‘তবে এখন তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবো। সেটা ব্যক্তিগত কোন রোষ ছিল কিনা, কিংবা এর অন্তরালের বিষয়টা কী সেটা তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতেই জানা যাবে,’ বলে চ্যানেল আই অনলাইনের কাছে মন্তব্য করেন তিনি।

কিন্তু সেদিন হলে এশা সাধারণ শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়লে কেন তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেননি ছাত্রলীগের ওই হলের দায়িত্বশীল নেত্রীরা?

এ প্রশ্নে অসহায়ত্ব প্রকাশ করে সুফিয়া কামাল হলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তিলোত্তমা শিকদার চ্যানেল অাই অনলাইনকে বলেন: ‘সেদিন এই পরিমাণ ছাত্রী এশার বিপক্ষে ছিল যে আমরা ওর পাশে গেলে আমাদেরকেও এশার মতো অবস্থা করে ছাড়তো। ১০ তলা হলের প্রতিটি ফ্লোরে আমাদের ৬ থেকে ৭ জন করে মেয়ে থাকে। তাদের একত্র করা সেসময় ছিল অনেক কঠিন। ফ্লোরে ফ্লোরে অবরুদ্ধ হয়েছিল সবাই। সেসময় আমাদের অনেক খারাপ লাগছিল, কষ্ট পাচ্ছিলাম সবাই; কিন্তু ওর পাশে গিয়ে দাাঁড়ানোর মতো অবস্থা ছিল না।

‘তবে ওর জীবন বাঁচাতেই তাৎক্ষণিকভাবে সেসময় আমরা ওকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেই। তাছাড়া ওকে বাঁচানো যেতো না।’

হল শাখার বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সাজিয়া শারমিন সম্পা বলেন: সে রাতে আমরা দায়িত্বশীল অবস্থানে থেকেও কেউ এশার পাশে দাঁড়াতে পারিনি। একমাত্র কারণ আমরা সেসময় সাধারণ ছাত্রীদের দ্বারা অবরুদ্ধ ছিলাম। আমরা এতোটাই তোপের মুখে পড়েছিলাম যে এশার কাছে যাওয়ার কোন অবস্থা আমাদের ছিল না।

‘আর সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নেই তাকে বহিষ্কারের। তা না হলে সেদিন ওর জীবন বিপন্ন হওয়ার অাশঙ্কা ছিল।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুফিয়া কামাল হলের চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, সেদিন রাতে আমরা শুনতে পাই আমাদের হলের সহ-সভাপতি মোর্শেদার পায়ের রগ কেটে দিয়েছে এশা। তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মেডিকেলে। সঙ্গে সঙ্গে আমরা স্লোগান দিতে থাকি এশার বিরুদ্ধে। তবে পরে জানতে পারি, এশার সাথে বাক-বিতণ্ডার এক পর্যায়ে এশা ওই ছাত্রীকে চড় মারলে সে এশার রুমে জানালার গ্লাসে বাড়ি দিয়ে নিজেই নিজের পা কেটেছিল। বিষয়টা কতটা সত্য তা এখনো জানা যায়নি।

বিষয়টি নিয়ে এশা ও মোর্শেদা দু’জনের সঙ্গেই যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তাদেরকে ফোনে পাওয়া যায়নি। 

এই ধরনের আরও পোস্ট -
   

আরও খবর

TOP